তেল গ্যাস বিদ্যুতে তিক্ততা
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমান সরকারকে গত ৬ মাসে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ নিয়ে। এই তিন অতি প্রয়োজনীয় সেবার সবকটির সংকট ছিল মারাত্মক। সর্বশেষ গ্যাস সংকটের কারণে ৫ দিন ধরে দেশের বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এক প্রকার অচল হয়ে আছে। স্তব্ধ হয়ে আছে দেশের অর্থনীতি। মূলত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি এবং এলএনজি কার্গো নিয়ে টানাপোড়নের কারণে এক সপ্তাহে বিদ্যুতের মারাত্মক লোডশেডিং এবং শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভও হয়েছে। পরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়। এতে লোডশেডিং কমে আসে। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গত সপ্তাহে যুগান্তরকে বলেছিলেন, ফ্যাসিস্ট আমলের ভুল পরিকল্পনার কারণে বর্তমান সরকারকে খেসারত দিতে হচ্ছে। এজন্য এই সরকার নতুন করে আরও দুটি এফএসআরইউ-ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে, আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি কৌশলপত্র সরকার ঘোষণা করেছে। তিনি বলেন, সরকার জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ খাতের সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে এই সমস্যা সমাধান সহজ নয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। এরপর শনির দশা নেমে আসে বাংলাদেশের ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে তেলের দাম। বাংলাদেশে সরবরাহকারীরা তেল দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির তিন বিতরণ কোম্পানি পদ্মা-মেঘনা এবং যমুনা ওই যুদ্ধ শুরুর পরপরই স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ পর্যন্ত তেল বিক্রি করে দেয়। এতে দেশের তেলের মজুত কমে আসে। একপর্যায়ে সরকার জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু করে। এই রেশনিং এবং আতঙ্কের কারণে এক থেকে দেড় মাস জনগণকে জ্বালানি তেল সংগ্রহে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। রেশনিং তুলে নেওয়ার পর তেল পাম্পে দীর্ঘ সারি কমে আসে। সরকার এই সময়ে আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে মিল রেখে ডিজেলে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পেট্রোল এবং অকটেনের দামও বাড়ানো হয়। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার তেলের মজুত ৬০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। গ্রীষ্মের গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে জুলাইয়ের শেষে এবং আগস্টের প্রথম দিকে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে হিমশিম খেয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি। এই সময়ে কোনো কোনো এলাকায় লোডশেডিং হয়েছে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। বিশেষ করে গাজীপুর, চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিল ভয়াবহ লোডশেডিং। এমনকি গত সপ্তাহে সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেকর্ড লোডশেডিংয়ের কারণে বিব্রত হয় সরকার। এ কারণে সরকার মঙ্গলবার থেকে শিল্পের গ্যাস বরাদ্দ দেয় বিদ্যুৎ খাতে। তখন আবার শিল্প খাতে গ্যাসের ভয়াবহ সংকটে পরে।
এদিকে, গত কয়েক বছর ধরে দেশে গ্যাসের সংকট চলছিল। এ কারণে আগে থেকে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঠিকমতো চলছিল না। এর মধ্যে ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে-এফএসআরইউতে আগুন ধরে যায়। এতে বন্ধ হয়ে যায় সেই টার্মিনাল। জাতীয় গ্রিডে কমে যায় গ্যাসের সরবরাহ। এতে সারা দেশের শিল্পকারখানা-বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশন এবং বিদ্যুৎ খাতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে থাকে। ৫ আগস্ট এক্সিলারেট এনার্জির একটি বয়েলার চালু হলে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু আবার সমস্যা দেখা দেয় এলএনজি কার্গো নিয়ে। সৌদি কোম্পানি আরামকো থেকে কেনা একটি কার্গো থেকে এলএনজি সরবরাহে অস্বীকৃতি জানায় সামিট গ্রুপ এবং তাদের অপারেট এক্সিলারেট। ফলে ওই কার্গো টানা ৩ দিন সাগরে ভাসতে থাকে। আর সারা দেশ পড়ে ভয়াবহ গ্যাস সংকটে। পরে আরামকোর সেই কার্গো গ্রহণ করেনি সামিট গ্রুপ। সরকার অন্য একটি কার্গো এনে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় শনিবার থেকে।
এভাবে গত ৬ মাসে তেল-বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সরবরাহে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় দেশের মানুষ এবং সরকারের। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। গ্যাসের জন্য ৫৫০টি কারখানা টাকা দিয়েও ৪ বছর ধরে গ্যাস পাচ্ছে না। তাই তৃতীয় একটি এলএনজি বসাতে চাইনিজ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে যাচ্ছে সরকার। এর ফলে এলএনজি আমদানি বাড়ানো হবে।
এছাড়া সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে সাড়া দেওয়ার শেষ সময় নভেম্বরে। সেখানে বিদেশি কোম্পানি সাড়া দিলে আগামী ৮-১০ বছরের জন্য গ্যাসের বড় মজুত পাওয়া যেতে পারে।
