Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

বিয়ে ‘কঠিন’ হওয়ায় বাড়ছে অনৈতিকতা

Advertisement

তোফায়েল গাজালি

তোফায়েল গাজালি

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিয়ে ‘কঠিন’ হওয়ায় বাড়ছে অনৈতিকতা

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

বর্তমান সমাজে একটি অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে-বৈধ বন্ধন ‘বিয়ে’ দিনদিন কঠিন হয়ে উঠছে, অথচ অবৈধ ও সাময়িক প্রেম বা লিভ-ইন রিলেশনশিপ বা ‘সম্পর্ক’ যেন ক্রমেই সহজলভ্য ও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যে বিয়ে সমাজকে স্থিতিশীল করে, পরিবার গঠন করে এবং চরিত্র রক্ষা করে, তা আজ নানা সামাজিক ও আর্থিক জটিলতায় জর্জরিত।

অন্যদিকে যে অনৈতিক সম্পর্কগুলো সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়ায় এবং মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে, তা ফ্যাশন ও আধুনিকতার চাদরে ঢাকা পড়ছে। তরুণ সমাজ আজ এ দ্বিমুখী সংকটের মধ্যদিয়ে অতিক্রম করছে। সংকটের বর্তমান চিত্র তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ আজ সঠিক সময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছে না। এর নেপথ্যে রয়েছে ক্যারিয়ার নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তথাকথিত মানদণ্ড, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং যৌতুক না হলেও ‘বিয়েতে বিরাট আয়োজন’ করার মানসিকতা।

একজন তরুণ পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ত্রিশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এরপর সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ তো রয়েছেই। কিন্তু জৈবিক ও মানসিক চাহিদা বয়সের নিয়মেই আসে। বিয়ে যখন কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়, তখন তরুণরা বিকল্প হিসাবে ‘সহজ সম্পর্ক’ বা অনৈতিক প্রেমের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের ফলে এসব অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো এখন হাতের মুঠোয়। ফলে বাড়ছে পারিবারিক অবক্ষয়, মানসিক বিষাদ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জটিলতা এবং দিনশেষে হতাশা। বিয়ে কেন কঠিন হলো? বিয়ে কঠিন হওয়ার পেছনে মূলত বেশ কয়েকটি সামাজিক উপাদান দায়ী-

অতিরিক্ত খরচ ও সামাজিক জাঁকজমক : গায়ে হলুদ, প্রি-ওয়েডিং শুট, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং বা বিশাল কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া-বর্তমানে বিয়ে মানেই কোটি টাকার খেলা। ফলে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত তরুণদের কাছে বিয়ে এখন ভীতিজনক এক স্বপ্ন।

মোহরানার ভুল ধারণা : মোহরানা নারীর অধিকার হলেও সমাজে এটিকে বরপক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা মাপার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। সামর্থ্যরে বাইরে বিশাল অঙ্কের মোহরানা নির্ধারণ বিয়েকে একটি ব্যবসায়িক চুক্তির মতো জটিল করে তুলেছে।

প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অবাস্তব মানদণ্ড : চাকরি, নিজস্ব ফ্ল্যাট বা গাড়ি না থাকলে বিয়ের প্রস্তাব দিতেই দ্বিধা করে তরুণরা। কিন্তু সংসার তো একসঙ্গে শূন্য থেকে শুরু করে গড়ে তোলার বিষয়, এ উপলব্ধিটি সমাজ হারাতে বসেছে।

সংস্কৃতির প্রভাব : অনৈতিক ও সাময়িক সম্পর্ককে সহজ হিসাবে ফুটিয়ে তোলার পেছনে পশ্চিমা জীবনধারা ও গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে। দায়িত্বহীন সম্পর্ককে যেখানে রঙিন করে দেখানো হয়, সেখানে বিয়েকে তুলে ধরা হয় এক ধরনের ‘শিকল’ বা চাপ হিসাবে।

ইসলামের নির্দেশনা : ইসলাম মানবপ্রকৃতিকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করে। এজন্যই ইসলাম বিয়েকে অত্যন্ত সহজ, বরকতময় এবং প্রশংসনীয় কাজ হিসাবে নির্ধারণ করেছে, আর অনৈতিক সব পথকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কুরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা বলেন-‘আর তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে সম্পন্ন করো... তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছলতা দান করবেন।’ (সূরা আন-নূর : ৩২)। এ আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, সম্পূর্ণ অর্থবিত্ত বা প্রাচুর্যের জন্য অপেক্ষা না করে ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জনের পর বিয়ের পদক্ষেপে বরকত থাকে। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বিয়ে সহজ করার বিষয়ে বারবার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন-‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে তা-ই, যাতে খরচ ও ঝুটঝামেলা সবচেয়ে কম।’ (মুসনাদে আহমাদ)।

ইসলামে বিয়ের মূল শর্তগুলো খুবই মৌলিক : পাত্র-পাত্রীর সম্মতি, অভিভাবকের সায়, দুজন সাক্ষী এবং পাত্রের সামর্থ্যানুযায়ী মোহরানা ধার্য করা। বিয়েতে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা নেই। সামান্য ওয়ালিমা বা আহার করানোর মাধ্যমে সুন্নাহ পালন করা যায়। মোহরানা প্রসঙ্গে প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, বর যেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী মোহর নির্ধারণ করে। সামান্য লোহার আংটি বা কুরআনের কিছু অংশ শেখানোর মাধ্যমেও বিয়ের দৃষ্টান্ত ইসলামে রয়েছে। মোহরানা দিয়ে নারীকে সম্মান জানানো ইসলামি বিধান, কিন্তু তাকে বিয়ের পথে বাধা বানানো ইসলামের শিক্ষা নয়। সংকট উত্তরণের উপায় তরুণ সমাজকে এ নৈতিক ও মানসিক সংকট থেকে বের করে আনতে হলে সামগ্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের বুঝতে হবে, সন্তানের চারিত্রিক পবিত্রতা ও মানসিক শান্তির জন্য বিয়ে সহজ করা জরুরি। উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাহাড় দাঁড় না করিয়ে সততা ও দায়িত্বশীলতাকে বিয়ের মূল মানদণ্ড বানানো উচিত। বিয়েতে অতিরিক্ত খরচ, অপ্রয়োজনীয় রীতিনীতি ও লোকদেখানো প্রদর্শনী বন্ধ করতে হবে। সাধারণ আয়োজনে বিয়ে সম্পন্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের শুধু ক্যারিয়ারের পেছনে না ছুটে মানসিকভাবে সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অনৈতিক সম্পর্কের সাময়িক ও মিথ্যা স্থায়িত্ব থেকে বেরিয়ে এসে পবিত্র বন্ধনের গুরুত্ব বুঝতে হবে। জুমার খুতবা, ওয়াজ মাহফিল ও গণমাধ্যমে বিয়ের সহজ ইসলামি রূপ এবং অনৈতিক সম্পর্কের ভয়াবহতা নিয়ে সামাজিক আলোচনা বাড়াতে হবে। বিয়ে কোনো জটিল সামাজিক পরীক্ষা নয়, বরং এটি জীবনকে শান্তিময় করার এক আসমানি নিয়ামত। বিয়েকে যখন সহজ করা হবে, তখন সমাজ থেকে পাপাচার ও মানসিক অস্থিরতা এমনিতেই কমে আসবে। তরুণ সমাজকে রক্ষায় এবং একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবারব্যবস্থা বজায় রাখতে আসুন আমরা ‘সহজ বিয়ে’র সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিই এবং অনৈতিকতার সহজ পথকে রুদ্ধ করি।

লেখক : সহসম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম