প্রিয় নবীর স্মৃতি মোড়ানো পবিত্র প্রাঙ্গণ
মসজিদে নববী
Advertisement
রেজা শরিফ
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মদিনা মুনাওয়ারার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য স্মৃতিবাহী স্থাপনা-মসজিদে নববী। এটি শুধু একটি মসজিদ নয়; মুসলিম উম্মাহর ইমান, ভালোবাসা, জ্ঞান, নেতৃত্ব ও সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক পবিত্র প্রতিষ্ঠান। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর হিজরতের পর যে মসজিদের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, কালক্রমে সেটিই পরিণত হয়েছে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের আকাক্সিক্ষত এক ঠিকানায়।
আজ মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, সারি সারি সাদা ছাতা, সুউচ্চ মিনার এবং সবুজ গম্বুজ। কিন্তু এ বিশাল স্থাপনার সূচনায় ছিল অত্যন্ত সরল এক নির্মাণ। খেজুরগাছের কাণ্ড ছিল স্তম্ভ, খেজুরপাতা ও ডালপালা ছিল ছাদের উপকরণ। মাটির সেই সরল মসজিদ থেকেই শুরু হয়েছিল এমন এক সমাজ ও সভ্যতার যাত্রা, যার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর বহু প্রান্তে।
মক্কায় দীর্ঘ তেরো বছর দাওয়াতি সংগ্রামের পর মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল একটি মসজিদ নির্মাণ। এটি ছিল শুধু নামাজের স্থান নয়; বরং নবগঠিত মুসলিম সমাজের কেন্দ্র। মসজিদের পাশেই গড়ে ওঠে রাসূল (সা.)-এর আবাস। এখানেই মুসলমানরা একত্র হতেন, ইবাদত করতেন, কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করতেন এবং নিজেদের পারস্পরিক সমস্যার সমাধান করতেন। রাষ্ট্র ও সমাজের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এ মসজিদ কেন্দ্র করেই পরিচালিত হতো। অর্থাৎ, মসজিদে নববী ছিল একইসঙ্গে ইবাদতের স্থান, শিক্ষাকেন্দ্র, পরামর্শকেন্দ্র, সমাজকল্যাণের কেন্দ্র এবং নবগঠিত ইসলামি সমাজের প্রাণকেন্দ্র।
মসজিদে নববী ছিল ইসলামের অন্যতম প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র। মহানবী (সা.) নিজেই এখানে সাহাবিদের কুরআন, দ্বীন, নৈতিকতা ও জীবনব্যবস্থার শিক্ষা দিতেন। প্রশ্ন করা, জ্ঞান অর্জন করা এবং জানা বিষয় অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সংস্কৃতি এখানে বিকশিত হয়েছিল। মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ছিল আহলে সুফফা-দরিদ্র ও জ্ঞানান্বেষী সাহাবিদের একটি বিশেষ দল। তারা মসজিদসংলগ্ন সুফফায় অবস্থান করে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করতেন। তাদের মধ্য থেকে অনেকেই পরবর্তীকালে ইসলামের জ্ঞান ও দাওয়াত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেন।
নবীজি (সা.)-এর যুগে মসজিদে নববী সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও মসজিদের ভূমিকা ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে আগত মানুষ এখানে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিরাও আসতেন। অনেকেই ইসলাম সম্পর্কে জানতেন এবং মুসলিম সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতেন। এখানে রাষ্ট্রচিন্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। নবীজি (সা.)-এর নেতৃত্বে মসজিদ শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল নৈতিকতা, জ্ঞান, সমাজসেবা ও মানুষের পারস্পরিক দায়িত্ববোধের কেন্দ্র।
মসজিদে নববীর সবচেয়ে আবেগঘন ও পবিত্র অংশগুলোর একটি হলো রওজা মোবারক। নবীজি (সা.) ইন্তেকালের পর তাঁকে তাঁর বাসকক্ষেই দাফন করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই স্থান মসজিদ সম্প্রসারণের আওতায় আসে। এখানেই নবীজি (সা.)-এর পাশাপাশি হজরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.) ও হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সমাহিত আছেন। প্রতিদিন বিশ্বের নানা দেশ থেকে আগত অসংখ্য মুসলমান মসজিদে নববীতে এসে নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করেন। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগে এ স্থান মুসলিম হৃদয়ে এক অনন্য মর্যাদা লাভ করেছে।
