তালায়াল বাদরু আলাইনা
নবীপ্রেমের অমরকাব্য
Advertisement
আদনান রাফি
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তালায়াল বাদরু আলাইনা/মিন সানিয়্যাতিল ওদাই/ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা/মা দায়া লিল্লাহি দাই।
তরজমা : আমাদের ওপর উদিত হয়েছে পূর্ণিমার চাঁদ, বিদায়ের গিরিপথ থেকে; যতদিন আল্লাহর পথে আহ্বানকারী আহ্বান জানাবে, ততদিন আমাদের ওপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অপরিহার্য।
মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর আর উৎকণ্ঠায় ভরা কিছু হৃদয়। মক্কা থেকে একজন মহামানব আসছেন-যাঁর আগমনের অপেক্ষায় ছিল ইয়াসরিবের মানুষ। শহরের নারী, পুরুষ ও শিশুদের কাছে সেই আগমন ছিল শুধু একজন ধর্মীয় নেতার আগমন নয়; ছিল অন্ধকার ভেদ করে নতুন ভোরের আগমনের প্রত্যাশা। ইতিহাসের ধারায় ইয়াসরিব অচিরেই পরিচিত হবে ‘মদিনাতুর রাসূল’ রাসূলের শহর হিসাবে। আর সেই আগমন ঘিরে ইসলামি ঐতিহ্যে যুগ যুগ ধরে উচ্চারিত হয়ে আসছে হৃদয়স্পর্শী স্বাগত গান- তালায়াল বাদরু আলাইনা।
৬২২ খ্রিষ্টাব্দ। মক্কার অত্যাচার-নির্যাতন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে ইসলামের অনুসারীদের ওপর অব্যাহত নির্যাতন, অন্যদিকে নতুন দ্বীনের আলো ছড়িয়ে পড়ার পথ রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্র। এমন পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে ইয়াসরিবের পথে হিজরত করেন। এ হিজরত ছিল শুধু একটি শহর থেকে আরেকটি শহরে চলে যাওয়া নয়; এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী বাঁক। মক্কার নির্যাতিত ও বিচ্ছিন্ন মুসলিম সম্প্রদায় হিজরতের মাধ্যমে পেল একটি নিরাপদ আশ্রয়, আর ইসলাম পেল রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের বাস্তব ক্ষেত্র।
ইয়াসরিবের মানুষের হৃদয় তখন অনেক আগেই ইসলামের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। আকাবার বাইআতের মধ্যদিয়ে তাদের একটি অংশ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল-রাসূল (সা.) তাদের শহরে এলে নিজেদের পরিবার ও সন্তানদের যেভাবে রক্ষা করে, তাঁকেও সেভাবেই রক্ষা করবে। ফলে হিজরতের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর ইয়াসরিববাসীর অপেক্ষা যেন আর শেষ হতে চাইছিল না। প্রতিদিন মানুষ শহরের বাইরে এসে পথের দিকে তাকিয়ে থাকত। কখন আসবেন সেই মহামানব, যাঁর হাতে বদলে যাবে আরবের ইতিহাস।
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ইসলামি ঐতিহ্যে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় পৌঁছালে শহরবাসীর মধ্যে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ তাঁকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসে। তাদের আনন্দ ও ভালোবাসার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে বিখ্যাত কয়েকটি আরবি পঙ্ত্তি-‘তালায়াল বাদরু আলাইনা’। পূর্ণিমার চাঁদকে আরবরা সৌন্দর্য, আলো ও আনন্দের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করত। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনকে ‘উদিত পূর্ণিমার চাঁদ’-এর সঙ্গে তুলনা করা তাই ছিল গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার প্রকাশ।
এই স্বাগত গানের মূল কথাগুলো অত্যন্ত সহজ, অথচ অর্থবহ। নবীজি (সা.)-এর আগমনে মদিনাবাসী যেন বলছে-আমাদের শহরে এমন এক আলো এসেছে, যার জন্য আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে স্বাগত জানানোর গান নয়; বরং হিদায়াতের আলোকে স্বাগত জানানোর এক কাব্যিক প্রকাশ। যে মানুষটি এসেছেন, তিনি নিয়ে এসেছেন তাওহিদের আহ্বান, মানবমুক্তির বার্তা, ন্যায়বিচারের শিক্ষা এবং ভ্রাতৃত্বের এক নতুন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন।
‘তালায়াল বাদরু আলাইনা’র ঐতিহাসিক বর্ণনা নিয়ে মতভেদ থাকলেও হিজরতের সময় মদিনাবাসীর আনন্দ, ভালোবাসা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা ছিল ইসলামের ইতিহাসের সুপ্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এমন এক শহরে প্রবেশ করেছিলেন, যে শহর তাঁকে শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, নিজেদের হৃদয়ও উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। মক্কার মুহাজিররা সেখানে পেয়েছিলেন আনসারদের অকৃত্রিম ভালোবাসা। ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছিল মুহাজির ও আনসারের সেই অতুলনীয় ভ্রাতৃত্ব, যা মানবসভ্যতার সামাজিক সংহতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।
মদিনায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম যে কাজগুলোতে মনোযোগ দেন, তার মধ্যে ছিল মসজিদ নির্মাণ, মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। অর্থাৎ তাঁর আগমন শুধু আবেগের উৎসব হয়ে থাকেনি; সেই আনন্দ পরিণত হয়েছিল সমাজ পরিবর্তনের কর্মসূচিতে। হিজরতের পর মদিনার মাটিতেই গড়ে ওঠে এমন এক সমাজ, যেখানে বংশের গৌরবের পরিবর্তে তাকওয়াকে মর্যাদার মানদণ্ড করা হয়, দুর্বল ও অসহায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষের মধ্যে দায়িত্ব ও ন্যায়বোধের শিক্ষা দেওয়া হয়।
সেই অর্থে ‘তালায়াল বাদরু আলাইনা’ শুধু একটি স্বাগত গান নয়; এটি মুসলিম স্মৃতির এক আবেগময় প্রতীক। এ পঙ্ক্তিগুলো উচ্চারিত হলেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক ঐতিহাসিক দৃশ্য-প্রতীক্ষারত একটি শহর, পথের দিকে তাকিয়ে থাকা কিছু মানুষ, শিশুদের উচ্ছ্বাস, নতুন দিনের আশা এবং আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর আগমনে আলোকিত এক জনপদ।
আজও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এ গানটি নবীপ্রেম, আনন্দ ও স্বাগত জানানোর প্রতীক হিসাবে গাওয়া হয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া এ কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনায় আগমন ছিল ইতিহাসের শুধু একটি ঘটনা নয়; ছিল মানবতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মক্কার নিপীড়িত মুসলিম সমাজ হিজরতের পর মদিনায় দাঁড়িয়ে আত্মমর্যাদা, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতার পথ নির্মাণ করেছিল।
হিজরতের সেই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, অন্ধকার যত গভীরই হোক, সত্য ও ন্যায়ের পথ কখনো রুদ্ধ হয় না। ত্যাগের পথ পেরিয়েই আসে নতুন সম্ভাবনা। আর মদিনাবাসীর ভালোবাসা আমাদের শেখায়-একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ও একটি মহৎ আদর্শকে বরণ করার জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন উদার হৃদয়, আন্তরিকতা ও পরিবর্তনের অঙ্গীকার।
তাই ‘তালায়াল বাদরু আলাইনা’ আমাদের কাছে শুধু অতীতের একটি সুর নয়। এটি এক প্রতীক্ষার স্মৃতি, এক নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক এবং হিজরতের মহান শিক্ষার কাব্যিক প্রতিধ্বনি। মদিনার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত আজও যেন মানবতার কানে কানে বলে-যেখানে আল্লাহর রাসূলের শিক্ষা পৌঁছে, সেখানেই অন্ধকার ভেদ করে আলোর নতুন ভোরের সূচনা হয়।
