কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ (সা.)
Advertisement
ইমাম সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। আরব মরুভূমির বুকে তখন সভ্যতার কোনো ছোঁয়া ছিল না। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল হিংসা-বিদ্বেষ, সংঘাত আর অমূলক কুসংস্কার। ইতিহাসের পাতায় এ অন্ধকার সময়কে বলা হয় ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা চরম অজ্ঞতার যুগ। সে যুগে মানসম্মান আর বংশের অহংকার মানুষের মনের অন্ধত্বকে এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, মানুষ তার হৃদয় থেকে দয়া-মায়া পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। সবচেয়ে করুণ দশা ছিল নিষ্পাপ কন্যাসন্তানদের। ঘরে মেয়ে জন্মেছে শুনলেই পিতার মুখ কালো হয়ে যেত। মনে করা হতো, মেয়ে হওয়া মানেই পরিবারের জন্য চরম অপমানের বিষয়! সেই অপমানের হাত থেকে বাঁচতে জন্মদাতা পিতা তার নিষ্পাপ ফুটফুটে মেয়েকে জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত। জাহেলি যুগের আরবদের এ নৃশংস মানসিকতা তুলে ধরে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন-
‘আর যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ প্রদান করা হয়, তখন তার চেহারা মলিন হয়ে যায় এবং সে মনের মধ্যে ক্রোধ চেপে রাখে। তাকে যে সুসংবাদ দেওয়া হলো, তার লজ্জায় সে নিজের লোকদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায়; সে ভাবে-অপমান সহ্য করেও সন্তানটিকে জীবিত রেখে দেবে, নাকি মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখ, কত নিকৃষ্ট তাদের সিদ্ধান্ত!’ (সূরা আন নাহল আয়াত-৫৮ ও ৫৯)।
প্রিয় পাঠক! আজকের দিনে এমন ঘটনা রূপকথা মনে হতে পারে, কিন্তু সে যুগের নির্মমতা ঠিক এমনই ছিল। যে বাবা সন্তানকে কোলে তুলে আদর করবে, সেই বাবাই লোকলজ্জা ও অপমান থেকে বাঁচার জন্য নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে গর্ত খুঁড়ত নিজের নিষ্পাপ মেয়েটিকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার জন্য! সমাজের এমনই এক ভয়াবহ ও অমানবিক পরিস্থিতিতে কন্যাসন্তানদের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসেন হজরত রাসূল (সা.)। নবুয়তপ্রাপ্তির অনেক আগে, শৈশব ও কৈশোর থেকেই তিনি কন্যাসন্তান জীবন্ত কবর দেওয়ার এ জঘন্য কুপ্রথাটি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন এবং সবাইকে কন্যাসন্তান হত্যা না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। পরবর্তী সময়ে নবুয়ত লাভের পর হজরত রাসূল (সা.) কন্যাসন্তান হত্যার মতো বর্বরোচিত অপরাধ চিরতরে বন্ধ করতে গ্রহণ করেন দূরদর্শী ও কার্যকরী সব পদক্ষেপ। আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পবিত্র সংস্পর্শ ও সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মানুষ যখন ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করল, তখন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের মাঝে বিরাজমান বর্বরতা ও কুসংস্কারের ঘোর অন্ধকার দূর হতে লাগল। যে সমাজ একসময় কন্যাসন্তান জন্ম হওয়াকে অপমানজনক বলে মনে করত, হজরত রাসূল (সা.)-এর বৈপ্লবিক সংস্কারে সেই সমাজেই কন্যাসন্তানের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে গেল। আর হজরত রাসূল (সা.)-এর সংস্পর্শে এসে কন্যাসন্তানের প্রতি আরবদের দৃষ্টিভঙ্গির কতটা পরিবর্তন হয়েছিল, একটি বিশেষ ঘটনার মধ্যদিয়ে তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ঘটনাটি ছিল তৎকালীন আরবের কায়েস বিন আসিমের, যিনি পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ঘটনাটি নিম্নরূপ-
ইসলাম গ্রহণের আগে কায়েস বিন আসিম তার ৮ কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন। একবার এক মজলিসে আল্লাহর রাসূল (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। সেই মজলিসে কায়েস বিন আসিমও উপস্থিত ছিলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে এক সাহাবি কায়েস বিন আসিমকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে কায়েস! তুমি যে এতগুলো কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিলে, তাদের জন্য তোমার অন্তরে ব্যথা লাগেনি?’
এ প্রশ্ন শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর কায়েস বিন আসিম বললেন-
‘হ্যাঁ। একটি মেয়েকে কবর দেওয়ার সময় কিছুটা কষ্ট লেগেছিল। মেয়েটি ছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো সুন্দর। তার মায়াবী মুখটিতে সবসময় মধুর হাসি লেগে থাকত। কী মিষ্টি করে যে সে কথা বলত! এক কথায় মেয়েটি রূপে-গুণে অতুলনীয় ছিল। আমি যখন সফরে ছিলাম, তখন তার জন্ম হয়েছিল। বাড়ি ফিরে যখন জানতে পারি, সে আমার কন্যা, তখনই আমি তার হাত ধরে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে গিয়ে একটি গর্ত খুঁড়তে লাগলাম। গর্ত খোঁড়ার সময় সে আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল, ‘আব্বাজান! আপনি কেন গর্ত খুঁড়ছেন?’ আমি তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে আমার কাজ চালিয়ে গেলাম। অধিক পরিশ্রমে একপর্যায়ে আমি দরদর করে ঘামতে লাগলাম। মেয়েটি আমার কাছে এসে তার জামা দিয়ে গভীর মমতায় আমার ঘাম মুছে দিল, আমার দাড়িতে লেগে থাকা ধুলোবালি ঝেড়ে দিতে দিতে বলল, ‘আহা! আব্বাজান! আপনার দাড়িতে ধুলা লেগেছে!’ কিন্তু আমি তার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে এক ধাক্কায় তাকে গর্তে ফেলে মাটি ঢালতে আরম্ভ করলাম। মেয়েটি হতভম্ব হয়ে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল! তার দুচোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে অত্যন্ত আকুল স্বরে সে বলতে লাগল, ‘আব্বাজান! আমি কী অপরাধ করেছি?! কী কারণে আপনি আমাকে নিষ্ঠুরের মতো মাটিচাপা দিচ্ছেন?!’ মেয়ের কথা শুনে আমার হৃদয়ে একটু ধাক্কা লাগল। ক্ষণিকের জন্য আমি থামলাম, কিন্তু পরক্ষণেই আমি দ্রুত মাটি ফেলে গর্ত পূরণ করে দিলাম। আমার মেয়েটি শিগ্গির মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল!’
কায়েস বিন আসিমের মুখে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা শুনে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পবিত্র দুচোখ মুবারক বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। সাহাবিরাও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বিষাদের এক থমথমে নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল পুরো মজলিস। দীর্ঘক্ষণ পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সেই সাহাবি আবার কায়েস বিন আসিমকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে কায়েস! আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সহবতে আসার পর এখন কন্যাসন্তানের প্রতি তোমার মনোভাব কী?’ এ প্রশ্নের জবাবে কায়েস বিন আসিম বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং দীপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর কসম! যে ঘরে কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, সেই ঘর আল্লাহর রহমতে পরিপূর্ণ থাকে!’
উপরিউক্ত ঘটনাটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পবিত্র আদর্শ ও হেদায়েতের আলো তৎকালীন বর্বর আরব সমাজে কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যে মানুষগুলো একসময় নিজ কন্যাসন্তানকে জ্যান্ত মাটিচাপা দিতেও দ্বিধা করত না, তারাই হজরত রাসূল (সা.)-এর পবিত্র সংস্পর্শে এসে কন্যাসন্তানকে আল্লাহর রহমতরূপে গ্রহণ করেছিলেন এবং আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রতুল্য আলোকিত চরিত্রের অধিকারী হয়েছিলেন। পরিশেষে, সর্বকালের, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক ও মহামানব, রাহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর কদম মুবারকে জানাই শত কোটি সালাম ও কদমবুসি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
