Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

নবীজির রাষ্ট্রচিন্তা: ন্যায় মানবমর্যাদা ও কল্যাণের দশ নীতি

Advertisement

Icon

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নবীজির রাষ্ট্রচিন্তা: ন্যায় মানবমর্যাদা ও কল্যাণের দশ নীতি

Advertisement

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে যুদ্ধ, ক্ষমতা ও সামরিক শক্তির মাধ্যমে; কিন্তু মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা ছিল ভিন্নধর্মী। এর উদ্দেশ্য শুধু ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা বা ভূখণ্ড সম্প্রসারণ নয়; বরং মানুষের আত্মিক উন্নতি, নৈতিক গঠন, ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক দায়িত্ব ও মানবমর্যাদা নিশ্চিত করা। মক্কার তেরো বছরের দাওয়াতি জীবনে ইমান, নৈতিকতা, ধৈর্য ও মানবিকতার যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, হিজরতের পর মদিনায় এসে তা একটি বাস্তব সামাজিক ও রাষ্ট্রিক কাঠামো লাভ করে। ফলে মদিনা শুধু রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল না; বরং নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার এক জীবন্ত দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিল। এখানে ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব, অধিকার ও কর্তব্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামষ্টিক নিরাপত্তা, শান্তি ও প্রতিরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ক্ষমতা একটি আমানত

নবীজির রাষ্ট্রচিন্তার প্রথম ভিত্তি হলো ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি আমানত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে।’ সূরা আন-নিসা, অয়াত:৫৮। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।’ সহিহ বুখারি। অর্থাৎ নেতৃত্ব মানে ভোগ বা শ্রেষ্ঠত্ব নয়; এটি সেবা ও জবাবদিহির দায়িত্ব। মানুষের চোখ ফাঁকি দিলেও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে-এ বিশ্বাসই রাষ্ট্রক্ষমতার নৈতিক নিয়ন্ত্রণ।

ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের প্রাণ

ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তি নেই। কুরআন নির্দেশ দেয়, নিজের বা আত্মীয়ের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায়ের ওপর অটল থাকতে। আবার কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন অন্যায়ের কারণ না হয়-সেদিকেও সতর্ক করা হয়েছে। সূরা আন-নিসা, আয়াত:১৩৫; সূরা আল-মায়িদা, আয়াত:৮। রাসূল (সা.) আইন প্রয়োগে ধনী-দরিদ্র বা ক্ষমতাবান-দুর্বলের মধ্যে দ্বৈতনীতি গ্রহণ করেননি। তিনি সতর্ক করেছেন, পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছিল যখন প্রভাবশালী অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়া হতো এবং দুর্বলকে শাস্তি দেওয়া হতো। নবীজির রাষ্ট্রচিন্তায় তাই ন্যায় শুধু শাস্তি নয়; মানুষের অধিকার রক্ষা ও সামাজিক আস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম।

মানবমর্যাদা রাষ্ট্রের কেন্দ্রে মানুষ

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ সূরা আল-ইসরা, আয়াত:৭০। মানুষের মর্যাদা তার সম্পদ, বংশ বা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিদায় হজের ভাষণে রাসূল (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই রাষ্ট্র নাগরিককে শুধু করদাতা বা প্রশাসনিক সংখ্যা হিসাবে দেখবে না; তার জীবন, সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষাকে মৌলিক দায়িত্ব হিসাবে গ্রহণ করবে।

শূরা পরামর্শভিত্তিক নেতৃত্ব

কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের কার‌্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।’ সূরা আশ-সূরা, আয়াত:৩৮। রাসূল (সা.)কেও সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূরা আলে ইমরান, আয়াত :১৫৯। বদর ও উহুদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তিনি সাহাবিদের মতামত গ্রহণ করেছেন। শূরার অর্থ শুধু সভা করা নয়; বরং ভিন্নমত শোনা, যোগ্য ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া এবং অহংকারের পরিবর্তে জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

আইনের শাসন

আইন যদি শুধু দুর্বল মানুষের জন্য কার্যকর হয়, তাহলে তা ন্যায়ের আইন নয়। রাসূল (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, তাঁর নিজ পরিবারের কেউ অপরাধ করলেও ন্যায়ের বিধান থেকে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

এ শিক্ষা রাষ্ট্রকে সতর্ক করে-রাজনৈতিক প্রভাব, সম্পদ, পরিচয় কিংবা আত্মীয়তার কারণে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। ন্যায্য বিচার, প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত এবং সবার জন্য সমান আইনই রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা সৃষ্টি করে।

যোগ্যতা ও আমানতদারিতা

রাষ্ট্রের দায়িত্ব অযোগ্য বা অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে দেওয়া সমাজের জন্য বিপজ্জনক। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো কাজ অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।’ সহিহ বুখারি।

নেতৃত্বের জন্য শুধু সততা যথেষ্ট নয়; যোগ্যতাও প্রয়োজন। আবার দক্ষতা থাকলেও আমানতদারিত্ব না থাকলে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সততা, সিদ্ধান্ত ক্ষমতা ও জনকল্যাণের মানসিকতার সমন্বয়ই আদর্শ নেতৃত্বের ভিত্তি।

দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার

একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা বোঝা যায় তার দুর্বল মানুষের অবস্থান দেখে। ইসলাম এতিম, বিধবা, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কুরআন এতিমের সম্পদ রক্ষা এবং সম্পদকে শুধু ধনীদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত না রাখার শিক্ষা দিয়েছে। সূরা আল-ইসরা, আয়াত:৩৪; সূরা আল-হাশর, আয়াত:৭।

জাকাতসহ ইসলামের সামাজিক ব্যবস্থাগুলো সম্পদের সামাজিক দায়িত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আধুনিক বাস্তবতায় শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, ন্যায্য শ্রমমূল্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এ কল্যাণচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহাবস্থান কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।’ সূরা আল-বাকারা, আয়াত:২৫৬।

মদিনা ছিল বহু গোত্র ও সম্প্রদায়ের সমাজ। মদিনার সনদের মাধ্যমে পারস্পরিক নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও দায়িত্বের একটি কাঠামো গড়ে ওঠে। নবীজির রাষ্ট্রচিন্তা শেখায়, ভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ একই রাষ্ট্রে ন্যায়, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক দায়িত্বের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে।

সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক ন্যায়

রাষ্ট্রের কাজ শুধু আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত রক্ষা নয়; মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব। ইসলামে বৈধ উপার্জন ও ব্যক্তিগত সম্পদের অধিকার স্বীকৃত, কিন্তু শোষণ, প্রতারণা ও অন্যের অধিকার হরণ নিষিদ্ধ।

জাকাত, সদকা, ওয়াক্ফ ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদকে সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। রাসূল (সা.) বাজারে প্রতারণা ও মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। অর্থনৈতিক ন্যায়ের অর্থ সবাইকে সমান সম্পদ দেওয়া নয়; বরং ন্যায্য সুযোগ, বৈধ উপার্জন এবং দুর্বল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা।

শান্তি, নিরাপত্তা ও চুক্তির মর্যাদা

আল্লাহ বলেন, ‘তারা যদি শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়।’ সূরা আল-আনফাল, আয়াত:৬১। হুদায়বিয়ার সন্ধি প্রমাণ করে, রাসূল (সা.) দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। নবীজির রাষ্ট্রনীতিতে চুক্তির মর্যাদা রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির নাম নয়। প্রকৃত নিরাপত্তা হলো-মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান সুরক্ষিত থাকা এবং ন্যায়বিচারের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা।

নবীজির রাষ্ট্রচিন্তার এ দশটি নীতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। জবাবদিহি না থাকলে ন্যায় দুর্বল হয়; ন্যায় না থাকলে মানবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়; যোগ্য নেতৃত্ব না থাকলে প্রশাসন দুর্বল হয়; আর শান্তি ও নিরাপত্তা না থাকলে উন্নয়নও টেকসই হয় না।

আজকের বিশ্বে দুর্নীতি, বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, ধর্মীয় সংঘাত ও অর্থনৈতিক অন্যায়ের প্রেক্ষাপটে এ নীতিগুলো নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। তবে নবীজির রাষ্ট্রচিন্তাকে কোনো আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে যান্ত্রিকভাবে মিলিয়ে দেখার পরিবর্তে এর নৈতিক ও সর্বজনীন শিক্ষাগুলোকে উপলব্ধি করা জরুরি।

মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল মানুষ, কিন্তু মানুষের ঊর্ধ্বে ছিল আল্লাহর বিধান ও নৈতিক জবাবদিহি। শাসক ছিলেন জনগণের আমানতদার, ক্ষমতার মালিক নন। নেতৃত্ব ছিল অলংকার নয়, দায়িত্ব; আইন ছিল প্রতিশোধের অস্ত্র নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম।

নবীজির রাষ্ট্রচিন্তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-রাষ্ট্রের মহত্ত্ব তার ভূখণ্ডের বিস্তারে নয়, মানুষের নিরাপত্তায়; সম্পদের প্রাচুর্যে নয়, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়; বাহিনীর শক্তিতে নয়, জনগণের আস্থায়; আর শাসকের ক্ষমতায় নয়, তার জবাবদিহিতে। মদিনার শিক্ষা তাই শুধু ইতিহাসের স্মৃতি নয়; এটি আজও রাষ্ট্র, সমাজ ও নেতৃত্বের নৈতিক পথনির্দেশ। ন্যায়, আমানত, মানবমর্যাদা, পরামর্শ, যোগ্যতা, কল্যাণ, নিরাপত্তা ও শান্তি-এ মূল্যবোধগুলো কখনো পুরোনো হয় না।

লেখক : সহ-সুপার আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম