Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

পদ্মার তীরে যে দরবেশ জ্বেলেছিলেন আলোর প্রদীপ

হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)

Icon

গোলাম রাসূল

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)

ছবি: সংগৃহীত

বাংলার মাটি শুধু রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী নয়; এ মাটির ইতিহাসে মিশে আছে অসংখ্য আল্লাহওয়ালা মানুষের ত্যাগ, সাধনা ও দাওয়াতের স্মৃতি। তাদের কেউ এসেছেন দূর আরব থেকে, কেউ মধ্য এশিয়া থেকে, কেউ বাগদাদ কিংবা পারস্যের জনপদ থেকে। মানুষের হৃদয়ে তাওহিদ, নৈতিকতা ও মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দিতে তারা ছুটে বেড়িয়েছেন অচেনা জনপদে। তেমনই এক স্মরণীয় নাম হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)। রাজশাহীর সঙ্গে তার নাম আজও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। চতুর্দশ শতকের এ সুফি সাধক বরেন্দ্র অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)-এর প্রকৃত নাম আবদুল কুদ্দুস জালালুদ্দিন। তিনি বাগদাদ থেকে তার বড় ভাই সৈয়দ আহমদ ওরফে মীরন শাহের সঙ্গে বাংলায় আগমন করেন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ৬৮৫ হিজরি বা ১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তাদের এ অঞ্চলে আগমন ঘটে। বাংলায় এসে তিনি বিভিন্ন স্থানে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মানুষকে ইসলামের শিক্ষা দিতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে তার দাওয়াতি কার্যক্রম বিস্তৃত হয় বরেন্দ্র অঞ্চলে। বাঘা হয়ে তিনি রামপুর-বোয়ালিয়ার দিকে আসেন, যে অঞ্চল পরবর্তী সময়ে বর্তমান রাজশাহী নগরীর গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

‘মখদুম’ শব্দের অর্থ ধর্মীয় নেতা বা সম্মানিত ব্যক্তি। ‘রূপোশ’ অর্থ আবৃত বা আচ্ছাদিত। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মুখমণ্ডল কাপড় দিয়ে আবৃত রাখতেন; সেখান থেকেই ‘রূপোশ’ নামটির প্রচলন ঘটে। তার পরিচিতি তাই ‘শাহ মখদুম রূপোশ’ নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়। তাকে ঘিরে রাজশাহী অঞ্চলে বহু কারামত ও অলৌকিক কাহিনি লোকমুখে প্রচলিত। এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে সব সূত্র একমত নয়। তাই এগুলোকে ইতিহাসের অকাট্য দলিল হিসাবে না দেখে স্থানীয় লোকস্মৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে দেখা অধিক সংগত।

শাহ মখদুম (রহ.)-এর দাওয়াতি কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল খানকাহকেন্দ্রিক সমাজ গঠন। তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন সঙ্গীও বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলামের শিক্ষা প্রচার করেন বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে। এখানে আমাদের জন্য রয়েছে বড় শিক্ষা। দাওয়াত মানে শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়া নয়। মানুষের কাছে যাওয়া, তাদের জীবন ও সমস্যা বোঝা, সুন্দর আচরণ করা, জ্ঞান বিতরণ করা এবং নিজের চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরাও দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।

একজন দাঈর সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা তার নিজের জীবন। মানুষের কাছে ইসলাম সম্পর্কে যত কথাই বলা হোক, যদি দাঈর জীবনে সত্যবাদিতা, আমানতদারী, বিনয়, দয়া ও আল্লাহভীতি প্রকাশ না পায়, তাহলে সেই দাওয়াত মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করতে পারে না।

শাহ মখদুম (রহ.)-এর স্মৃতি আমাদের তাই শুধু অতীতের কোনো সাধকের জীবনী মনে করিয়ে দেয় না; বরং প্রশ্ন করে-আজ আমরা যারা ইসলামের কথা বলি, আমাদের আচরণে ইসলামের সৌন্দর্য কতটুকু প্রকাশ পায়?

বর্তমান রাজশাহী শহরের দরগাপাড়ায় শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার অবস্থিত। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের তথ্যেও এটি জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মাজারটি রাজশাহী কলেজের নিকটবর্তী এবং পদ্মার কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। তার স্মৃতি শুধু মাজার ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। রাজশাহীর বিভিন্ন স্থান, প্রতিষ্ঠান ও জনজীবনে তার নাম আজও বহমান। রাজশাহী শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিবিষয়ক তথ্যেও তার ইসলাম প্রচারের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মাজারের বর্তমান স্থাপত্যও পরবর্তী সময়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। ১০৫৪ হিজরি বা ১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে আলীকুলী বেগ তার কবরের ওপর একটি ছোট এক গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন।

শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)-এর জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-দ্বীনের কাজ করতে হলে ত্যাগ, ধৈর্য, জ্ঞান ও সুন্দর চরিত্র প্রয়োজন। দূরদেশ থেকে এসে অপরিচিত একটি অঞ্চলে মানুষের মাঝে ইসলামের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু তার সাধনা ও দাওয়াতের স্মৃতি শতশত বছর পরও মানুষের মনে বেঁচে আছে।

আজকের সময়ে আমাদের দাওয়াতের পদ্ধতি বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমের মাধ্যমে মুহূর্তেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব; কিন্তু মানুষের হৃদয় জয় করার মূলনীতি বদলায়নি। আজও প্রয়োজন সুন্দর ভাষা, উত্তম চরিত্র, সহমর্মিতা ও জ্ঞানের সমন্বয়।

শতশত বছর পেরিয়ে গেছে। বরেন্দ্রভূমির সেই জনপদ আজ আধুনিক রাজশাহী নগরী। বদলে গেছে সময়, সমাজ ও মানুষের জীবনযাপন। কিন্তু মানুষের হৃদয়ের প্রয়োজন বদলায়নি। মানুষ আজও সত্য, শান্তি, ন্যায় ও আল্লাহর নৈকট্য খোঁজে। পদ্মার তীরের সেই দরবেশের স্মৃতি যেন আমাদের নীরবে বলে যায়-ইসলামের দাওয়াত শুধু কথায় নয়, জীবনের সৌন্দর্যে দিতে হয়। মানুষের হৃদয় জয় করতে হয় ভালোবাসা, জ্ঞান, আমল ও উত্তম চরিত্র দিয়ে। রাজশাহীর দরগাপাড়ায় শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম