নেপালের কান্না মুমিনের জন্য সতর্কবার্তা
আদনান রাফি
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রকৃতি কখনো সৌন্দর্যের, কখনো সতর্কতার বার্তা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। পাহাড়, নদী, মেঘ, বৃষ্টি-সবই মহান আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর নির্ধারিত নিয়মের অধীন। কখনো অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস কিংবা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। নেপালের বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনাও আমাদের সামনে এমনই এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এ ধরনের দুর্যোগ দেখে শুধু আতঙ্কিত হওয়ার নয়; বরং মানবিকতা, আত্মসমালোচনা, পরিবেশ-সচেতনতা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
দুর্যোগ আমাদের অসহায়ত্ব মনে করিয়ে দেয়
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও আধুনিক উদ্ধার প্রযুক্তির কারণে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও বেড়েছে। কিন্তু প্রকৃতির বড় ধরনের বিপর্যয়ের সামনে মানুষ এখনো তার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।’ (সূরা আন-নিসা, ২৮) এ আয়াত মানুষের মৌলিক দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর শিক্ষা হলো-বিজ্ঞান ও সামর্থ্য অর্জন করেও মানুষ যেন অহংকারী না হয়; বরং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতাও অবলম্বন করে।
বিপদ দেখলে কাউকে দোষারোপ নয়
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটলেই এটিকে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর পাপের নিশ্চিত শাস্তি হিসাবে ঘোষণা করা ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নয়। কোনো বিপদ কারও জন্য পরীক্ষা, কারও জন্য সতর্কবার্তা এবং কারও জন্য নিজেদের দায়িত্ব ও ভুলত্রুটি পর্যালোচনার উপলক্ষ্য হতে পারে। এর প্রকৃত হিকমত আল্লাহই ভালো জানেন। কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে।’ (সূরা আর-রুম, ৪১)। আয়াত আমাদের আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। মানুষের কিছু কর্মকাণ্ড পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত বন উজাড়, পাহাড় কাটা, নদী-খাল দখল, জলাশয় ভরাট কিংবা অপরিকল্পিত নগরায়ণ অনেক ক্ষেত্রে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই আয়াতটির শিক্ষা আমাদের নিজেদের দায়িত্ব ও আচরণ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষকে তার পাপের কারণে শাস্তি পেয়েছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বিপদে পড়া মানুষের প্রতি আমাদের প্রথম দায়িত্ব হলো সহমর্মিতা ও সহযোগিতা।
পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের শিক্ষা
মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টি জগতের দায়িত্বশীল অংশ। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন। পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা তাই শুধু আধুনিক নাগরিক কর্তব্য নয়; এর সঙ্গে ইসলামের আমানতদারী ও দায়িত্ববোধের শিক্ষাও জড়িত।
নেপালের মতো পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে অবহেলা করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। পাহাড়, বন, নদী ও জলাধার রক্ষার পাশাপাশি পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো
দুর্যোগের সবচেয়ে বড় মানবিক শিক্ষা হলো-বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ঘরবাড়ি হারানো, স্বজন হারানো কিংবা খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়া মানুষের কাছে তখন সহানুভূতির প্রতিটি হাতই গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি বিপদ দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি বিপদ দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম)। হাদিসটির শিক্ষা হলো, বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘব করা ইসলামের মহান মানবিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তাই দুর্যোগের সময় ধর্ম, জাতি বা দেশের সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।
তাওয়াক্কুলের সঙ্গে প্রস্তুতিও প্রয়োজন
আল্লাহর ওপর ভরসা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তবে তাওয়াক্কুলের অর্থ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বসে থাকা নয়। রাসূল (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা কারণ ও উপায় অবলম্বনের শিক্ষা পাই। তাই দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার-ব্যবস্থা, চিকিৎসা ও খাদ্য মজুতসহ কার্যকর প্রস্তুতি থাকা জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়েও দুর্যোগের সময় কী করণীয়, তা জানা প্রয়োজন।
নেপালের বন্যা আমাদের কী শেখায়?
নেপালের বন্যা আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়-মানুষ তার সামর্থ্য নিয়ে অহংকারী হবে না; দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষকে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়াবে; পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় দায়িত্বশীল হবে এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে। ইসলাম আমাদের বিপদ দেখে শুধু ভয় পেতে শেখায় না; বরং শিক্ষা নিতে শেখায়। নিজের ভুলত্রুটি সংশোধন, আল্লাহর কাছে ফিরে আসা, মানুষের প্রতি দয়া এবং পৃথিবীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ-এসবই একজন মুমিনের জীবনের অংশ। আজ নেপাল বন্যার মুখোমুখি; অন্য কোনো দিন অন্য কোনো দেশও একই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারে। তাই অন্যের বিপদকে শুধু খবর হিসাবে না দেখে শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রকৃতির দুর্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-মানুষ সীমাবদ্ধ, জীবন অনিশ্চিত এবং পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা, মানুষের প্রতি মমতা, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি-এ চারটি গুণই হতে পারে আমাদের জন্য নেপালের বন্যার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
