Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

বর্ণবাদ নির্মূলে রাসূল (সা.)-এর যুগান্তকারী অবদান

Icon

ইমাম সৈয়দ এএফএম মঞ্জুর-এ-খোদা

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ণবাদ নির্মূলে রাসূল (সা.)-এর যুগান্তকারী অবদান

ছবি: সংগৃহীত

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, বর্ণবাদ (জধপরংস) হলো এমন এক বৈষম্যমূলক মানসিকতা, যেখানে মানুষের ত্বকের রং, বংশ বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে শ্রেষ্ঠ আর কাউকে হীন বা নিচ বলে বিচার করা হয়। সহজ কথায়, কোনো মানুষের বাহ্যিক রূপ বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে তার ওপর অবিচার করা এবং তাকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করাই হলো বর্ণবাদ।

বর্ণবাদ এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। শুধু প্রাচীনকালেই নয়, বরং যুগ যুগ ধরে সামাজিক বৈষম্য, নিপীড়ন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নেপথ্যে এ বর্ণবাদই মূল ভূমিকা পালন করে আসছে। আধুনিক বিশ্বের তথাকথিত সভ্য সমাজেও মানুষ প্রতিদিন জাতিগত বৈষম্য ও কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ ভেদাভেদের শিকার হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষ যখন বর্ণবাদের ভয়াবহতা গভীরভাবে উপলব্ধি করে, তখন ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ কর্তৃক সর্বজনীন মানবাধিকার (Universal Declaration of Human Rights) ঘোষিত হয় এবং ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন (Civil Rights Movement) তীব্র আকার ধারণ করে। পাঠকরা জানলে হয়তো অবাক হবেন, আধুনিক বিশ্ব মাত্র ৭৬ বছর আগে বর্ণবাদ নিয়ে সচেতন হলেও আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর আগেই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল (সা.) বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে সমাজ থেকে একে চিরতরে বিদায় জানিয়ে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

রাসূল (সা.) শুধু মুখের কথায় নয়, বরং নিজ কর্ম ও যুগোপযোগী সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে বর্ণপ্রথার শিকড় উপড়ে ফেলেছিলেন। সুদীর্ঘ ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনে তিনি বারংবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহর কাছে মানুষের মূল পরিচয় তার গায়ের রং কিংবা চেহারার সৌন্দর্যে নয়, বরং তার অন্তরের বিশুদ্ধতায়। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেন-

‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের বাহ্যিক আকৃতি ও ধন-সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস নং ৫৩১৪)।

আর বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে সর্বস্তরের মানুষের সম্মুখে রাসূল (সা.) সব ধরনের বর্ণবৈষম্যের চিরসমাপ্তি ঘটিয়ে ঘোষণা করেছিলেন-

‘হে মানুষ! মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। অনারবের ওপর আরবের, কিংবা আরবের ওপর অনারবের, কালোর ওপর সাদার কিংবা সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তোমরা সবাই এক আদমের সন্তান এবং আদম মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার অধিকারী, যে আল্লাহ্কে অধিক ভালোবাসে ও ভয় করে।’

শুধু তাই নয়, কালজয়ী সেই ভাষণে রাসূল (সা.) বলিষ্ঠ কণ্ঠে আরও ঘোষণা করেছিলেন-

‘হে মানুষ! যদি তোমাদের ওপর একজন কৃষ্ণাঙ্গ হাবশী গোলামকেও নেতা নিযুক্ত করা হয় এবং সে যদি তোমাদের আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী পরিচালিত করে, তবে তোমরা তার অনুগত থাকবে, তার সব আদেশ মেনে চলবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৬১০)।

এগুলো শুধু রাসূল (সা.)-এর মৌখিক ঘোষণাই ছিল না, বরং তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে দীর্ঘ ১০ বছরের মদিনা জীবনে নানা বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বর্ণবাদ নিরসনে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। রাসূল (সা.)-এর শাসনব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কখনো কৃষ্ণাঙ্গ, কখনো অনারব, কখনো আজাদকৃত ক্রীতদাস আবার কখনো বা ক্রীতদাসের সন্তানদেরও নিয়োগ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত রাসূল (সা.) জাতি, বর্ণ, গোত্র, বাহিক্য সৌন্দর্য, সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি দ্বারা কাউকে বিচার না করে সর্বদা সব শ্রেণির মানুষকে এক গভীর মমতা ও ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতেন, যার প্রমাণস্বরূপ অসংখ্য ঘটনা সিরাত গ্রন্থগুলোয় বর্ণিত হয়েছে। এরূপ একটি চমৎকার মর্মস্পর্শী ঘটনা নিম্নে বর্ণনা করছি-

রাসূল (সা.)-এর একজন সাহাবি ছিলেন হজরত জাহের ইবনে হারাম (রা.)। সাদাসিধে স্বভাবের এ গ্রাম্য সাহাবির গায়ের রং ছিল অত্যধিক কালো এবং চেহারাও ছিল অতি সাধারণ। কিন্তু তার অন্তরজুড়ে ছিল মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা। গ্রাম থেকে মদিনায় আসার সময় তিনি রাসূল (সা.)-এর জন্য সাধ্যমতো গ্রামের নানা জিনিস উপহার নিয়ে আসতেন। রাসূল (সা.)ও তাকে ভালোবেসে শহরের বিভিন্ন সামগ্রী উপহার দিতেন। তার সম্পর্কে রাসূল (সা.) প্রায়শই হাসি মুখে বলতেন, ‘জাহের আমার গ্রাম্য বন্ধু, আর আমি তার শহুরে বন্ধু।’

একদিন মদিনা নগরীর ব্যস্ত বাজারে বসে গ্রামের কিছু জিনিসপত্র বিক্রি করছিলেন হজরত জাহের ইবনে হারাম (রা.)। সেদিন বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা ও হাঁকডাক এত বেশি ছিল, প্রচণ্ড কোলাহলের মাঝে পেছন দিক দিয়ে কে আসছে বা যাচ্ছে, এ ব্যাপারে হজরত জাহের (রা.)-এর কোনো খেয়ালই ছিল না। এরই মধ্যে হঠাৎ পেছন দিক থেকে দুটি হাত এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল! আকস্মিক এমন ঘটনায় হজরত জাহের (রা.) চমকে উঠলেন। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে তিনি বললেন, ‘এই, কে আপনি? আমাকে এখনি ছেড়ে দিন!’ অতঃপর তিনি যখন পেছনে ফিরে তাকালেন, তখন তিনি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন। জাহের (রা.) দেখতে পেলেন, তাকে যিনি জড়িয়ে ধরে আছেন, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং রাসূল (সা.)! আনন্দে আত্মহারা হয়ে জাহের (রা.) আর নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন না; বরং পরম ভালোবাসায় নিজের পিঠটি রাসূল (সা.)-এর মমতাময় পবিত্র বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে লাগিয়ে রাখলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে রাসূল (সা.) কোলাহলপূর্ণ বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মজার ছলে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘এই গোলামকে কে কিনবে? আমি একে বিক্রি করব!’ কথাটি শুনে নিজের গায়ের কৃষ্ণবর্ণ আর সাধারণ চেহারার কথা ভেবে হজরত জাহের (রা.) মাথা নিচু করে কিছুটা আফসোসের সঙ্গে বললেন- ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে তো কেউই দাম দিয়ে কিনবে না। কারণ আমি যে দেখতে কালো আর কুৎসিত!’ এ কথা শুনে রাসূল (সা.) পরম মমতায় তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন-‘হে জাহের! মানুষের চোখে তোমার মূল্য কম হতে পারে, কিন্তু সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর কাছে তুমি অনেক বেশি মূল্যবান!’ (তিরমিজি শরিফ, মিশকাত শরিফ)।

এমনি সাম্য ও মানবপ্রেমের এক জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন রাসূল (সা.)। কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ, ধনী-গরিব, উচ্চ বংশ-নিু বংশ, প্রভাবশালী-অসহায়, আরব-অনারব ইত্যাদি সব ধরনের বৈষম্য রাসূল (সা.)-এর সীমাহীন ভালোবাসা ও উদারতার সামনে ম্লান হয়ে যেত। আধুনিক পৃথিবী থেকে বর্ণবাদ ও জাতিগত বৈষম্যের অভিশাপ চিরতরে দূর করতে হলে রাসূল (সা.)-এর দেখানো এ সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের পথ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। পরিশেষে, মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ দিশারী রাসূল (সা.)-এর পবিত্র কদম মোবারকে জানাই শত কোটি সালাম ও কদমবুসি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম