মোহাম্মাদ নাম যতই জপি ততই মধুর লাগে
মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানবসভ্যতার ইতিহাসে অসংখ্য মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে। কেউ জ্ঞান-বিজ্ঞানে, কেউ নেতৃত্বে, কেউ মানবসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু এমন একজন মহান ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁর জীবন মানবজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে আলোকিত করেছে। তিনি বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। ইবাদত-বন্দেগি থেকে পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে মানবসেবা-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন অনুসরণীয় আদর্শ। মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ-তার জন্য, যে আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করে।’ (সূরা আল-আহজাব, আয়াত ২১)। এ আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের জন্য আদর্শ নন; বরং কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য তাঁর জীবন অনুসরণীয়।
ইবাদতে অনন্য আদর্শ
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী বান্দা। আল্লাহতায়ালা তাঁর পূর্বাপর সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এরপরও তিনি রাতের দীর্ঘসময় নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কখনো তাঁর পা মুবারক ফুলে যেত। হজরত আয়েশা (রা.) এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলতেন, ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৮৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮২০)। এখানে মুমিনের জন্য বড় শিক্ষা হলো-ইবাদত শুধু বিপদে বা প্রয়োজনের সময় করার বিষয় নয়; বরং আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতারও বহিঃপ্রকাশ।
মহান চরিত্রের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্রের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা আল-কলম, আয়াত ৪)। হজরত আয়েশা (রা.)কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৪৬)। অর্থাৎ কুরআনের শিক্ষা তাঁর জীবনে বাস্তব রূপ লাভ করেছিল। সত্যবাদিতা, আমানতদারী, বিনয়, দয়া, ধৈর্য, ক্ষমা ও ন্যায়পরায়ণতা ছিল তাঁর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। আজ যখন মিথ্যা, প্রতারণা, হিংসা ও অসহিষ্ণুতা সমাজজীবনে নানা সংকট তৈরি করছে, তখন নবীজি (সা.)-এর চরিত্র আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় নৈতিক শিক্ষার উৎস হতে পারে।
মানবতার প্রতি অফুরন্ত দয়া
আল্লাহতায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.)কে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসাবে প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ১০৭)। তাঁর দয়া ছিল সর্বজনীন। শিশু, নারী, বৃদ্ধ, দরিদ্র, অসহায়-সবার প্রতি তিনি ছিলেন সহানুভূতিশীল। এমনকি জীবজন্তুর প্রতিও তিনি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন।
তাই নবীপ্রেমের অন্যতম দাবি হলো-মানুষের প্রতি মমতা ও কল্যাণকামিতার মনোভাব গড়ে তোলা। শুধু নিজের জন্য ভালো থাকা নয়, অন্যের উপকারে আসাও তাঁর সুন্নাহর শিক্ষা।
পরিবারে নবীজি (সা.)-এর আদর্শ
পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদ বর্তমান সমাজের বড় সংকট। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের সামনে রেখে গেছেন একটি সুন্দর পারিবারিক জীবনের অনুপম আদর্শ। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘তিনি তাঁর পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৭৬)। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫)। এ শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের প্রকৃত চরিত্র শুধু জনসম্মুখে প্রকাশ পায় না; বরং ঘরের মানুষের সঙ্গে তার আচরণেই চরিত্রের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে।
ক্ষমার অনুপম দৃষ্টান্ত
রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনে অসংখ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাঁকে অপমান করা হয়েছে, কষ্ট দেওয়া হয়েছে, সাহাবিদের নির্যাতন করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে স্বদেশ মক্কা থেকে হিজরত করতে হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রতিশোধকে তিনি কখনো নিজের আদর্শ বানাননি।
মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর হাতে ছিল পূর্ণ ক্ষমতা। বহু বছরের নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগও ছিল। কিন্তু তিনি ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়-ক্ষমতা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য নয়; বরং ন্যায়, দয়া ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য।
সত্যবাদিতা ও আমানতদারী
নবুয়ত লাভের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে আস-সাদিক (সত্যবাদী) ও আল-আমিন (বিশ্বস্ত) নামে অভিহিত করত। তাঁর বিরোধীরাও তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতদারী অস্বীকার করতে পারেনি। আজকের সমাজে মিথ্যাচার, প্রতারণা, দুর্নীতি ও আমানতের খেয়ানত যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে নবীজি (সা.)-এর এ আদর্শ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ব্যবসায়ী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, শ্রমিক-প্রত্যেকের জীবনেই সত্যবাদিতা ও আমানতদারী প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেশীর অধিকার
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন যে, আমার ধারণা হলো, তিনি হয়তো তাকে উত্তরাধিকারী করে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০১৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬২৪)।
আধুনিক নগরজীবনে আমরা একই ভবন কিংবা একই মহল্লায় বসবাস করেও অনেক সময় পাশের মানুষের খোঁজ রাখি না। অথচ নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা হলো-প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে এবং তার অধিকার রক্ষা করতে হবে।
নবীপ্রেমের প্রকৃত দাবি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ইমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৪)। তবে নবীপ্রেম শুধু আবেগ বা মুখের দাবির বিষয় নয়; তাঁর সুন্নাহ অনুসরণই ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ কর; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১)। অর্থাৎ নবীজি (সা.)কে ভালোবাসার অর্থ হলো তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করা।
আজকের সমাজে নবীজির আদর্শ কেন জরুরি
মানুষ আজ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। কিন্তু সেইসঙ্গে নৈতিকতার সংকটও প্রকট হচ্ছে। পরিবারে অশান্তি, সমাজে হিংসা, ব্যবসায় প্রতারণা, কথায় মিথ্যাচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীনতা আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরছে। এসব সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু আইন বা প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ। আর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন সেই নৈতিকতার পূর্ণাঙ্গ বাস্তব নমুনা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করলে একজন মানুষ যেমন আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারে, তেমনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও কল্যাণের কারণ হতে পারে।
সুন্নাহর আলোয় জীবন গড়তে হবে
নবীজি (সা.)কে ভালোবাসার অর্থ হলো তাঁর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা। নামাজে তাঁর অনুসরণ, লেনদেনে তাঁর সততা, পরিবারে তাঁর কোমলতা, সমাজে তাঁর দয়া, বিরোধে তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, বিপদে তাঁর ধৈর্য এবং মানুষের প্রতি তাঁর কল্যাণকামিতা-সবই সুন্নাহর শিক্ষা। তাই মহানবী (সা.)-এর জীবনকে শুধু আলোচনা, মাহফিল কিংবা আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই নবীপ্রেম অর্থবহ হবে এবং তাঁর উসওয়াতুন হাসানা বা উত্তম আদর্শের প্রকৃত অনুসরণ হবে। পৃথিবীর সব আদর্শের ঊর্ধ্বে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ। তিনি ছিলেন মানবতার শিক্ষক এবং সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাহকে পথনির্দেশক হিসাবে গ্রহণ করাই একজন মুমিনের সফলতার শ্রেষ্ঠ পথ।
আল্লাহতায়ালা আমাদের অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সত্যিকারের ভালোবাসা সৃষ্টি করুন, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফায়াত নসিব করুন। আমিন। হ
লেখক : প্রভাষক (আরবি), মাদ্রাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
