জ্বালানি সংকটে ইসলামের শিক্ষা
Advertisement
আদনান রাফি
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যদিনের উদ্বেগের বিষয়। বিদ্যুতের লোডশেডিং, গ্যাসের সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্য ও সরবরাহ নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। এর প্রভাব পড়ছে ঘরবাড়ি থেকে শিল্পকারখানা, কৃষি থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য-সর্বত্র। এমন পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের উদ্যোগ যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিক হিসাবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
ইসলাম মানুষকে সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও সংযমের শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় কর না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আল-আরাফ : ৩১)।
এ আয়াত মূলত খাদ্য ও পানীয়ের প্রসঙ্গে হলেও অপচয়বিরোধী এর শিক্ষা সর্বজনীন। আল্লাহর দেওয়া কোনো নিয়ামত প্রয়োজনের অতিরিক্ত নষ্ট করা একজন মুমিনের চরিত্র হতে পারে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলও আল্লাহর দেওয়া সম্পদ, যা মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই এগুলোর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ও অপচয় থেকে বিরত থাকা ইসলামের সংযমের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে জ্বালানি অপচয়ের বহু চিত্র রয়েছে। প্রয়োজন না থাকলেও ঘরের বাতি-পাখা চালু রাখা, খালি কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালানো, রান্না শেষ হওয়ার পরও চুলা জ্বালিয়ে রাখা কিংবা অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করা-এসব অভ্যাস আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও সম্মিলিতভাবে এর ক্ষতি অনেক বড়।
ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের ব্যাপারেই সতর্ক করেনি; সামষ্টিক সম্পদের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে বলেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
এ হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে। একজন ব্যক্তি হয়তো ভাবতে পারেন, ‘আমি একটি বাতি কয়েক ঘণ্টা বেশি জ্বালালে কিই বা হবে?’ কিন্তু একই চিন্তা যদি লাখো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে অপচয়ের পরিমাণ ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
জ্বালানি সাশ্রয় মানে কৃপণতা নয়। ইসলাম কৃপণতাকে যেমন সমর্থন করে না, তেমনি অপচয়কেও অনুমোদন দেয় না। আল্লাহতায়ালা মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন, ‘তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয়ও করে না, কৃপণতাও করে না; বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি থাকে।’ (সূরা আল-ফুরকান : ৬৭)।
অতএব, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু প্রয়োজন শেষ হলে বাতি-পাখা বন্ধ করতে হবে। রান্নার জন্য গ্যাস ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনে চুলা জ্বালিয়ে রাখা যাবে না। প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি চালিয়ে জ্বালানি পোড়ানো থেকেও বিরত থাকা উচিত। অফিস, মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখাতে হবে-আল্লাহর দেওয়া কোনো নিয়ামত অপচয় করা যাবে না। মসজিদের ইমাম ও খতিবরা জুমার খুতবা ও ওয়াজে অপচয়বিরোধী ইসলামি শিক্ষা তুলে ধরতে পারেন। কারণ ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে জাতীয় দায়িত্ববোধ যুক্ত হলে মানুষের আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আসতে পারে।
আজকের জ্বালানি সংকট আমাদের জন্য আত্মসমালোচনারও একটি সুযোগ। আমরা কি সত্যিই প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করছি, নাকি অভ্যাস ও বিলাসিতার কারণে অতিরিক্ত ভোগ করছি? সংকটের সময়ে নিজের সামান্য সুবিধা কমিয়ে যদি অন্যের প্রয়োজনের কথা ভাবি, সেটিই হবে ইসলামের সামষ্টিক কল্যাণের শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ।
তাই সংকটের এ সময়ে আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার হোক-অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করব না, গ্যাস ও জ্বালানি অপচয় করব না, অন্যকেও সচেতন করব।
মনে রাখতে হবে, একটি বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়তো খুব ছোট কাজ; কিন্তু কোটি মানুষের কোটি ছোট সচেতনতা একটি বড় জাতীয় সাশ্রয়ে পরিণত হতে পারে। অপচয় বন্ধ করা শুধু অর্থ সাশ্রয় নয়-এটি আল্লাহর নিয়ামতের মর্যাদা দেওয়া, জাতীয় সম্পদের হেফাজত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষা করা।
