তুমি যে নুরের রবি নিখিলের ধ্যানের ছবি
Advertisement
ফিরোজ আহমাদ
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রেম এক স্বর্গীয় অনুভূতি। নবীর ভালোবাসা মুমিনের হৃদয়ে সাহস ও শক্তি সঞ্চার করে। নবী মুমিনের জানের চেয়ে প্রিয়। নবী প্রেম মুমিনের হৃদয়ে খোরাক জোগায়। নবী ভালোবাসার কাছে গোটা পৃথিবী তুচ্ছ। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের প্রাণের চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ।’ (সূরা আল-আহজাব : ৬)। নবীজি (সা.)-এর আগমনের সুসংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো পৃথিবী রঙিন সাজে সেজেছিল। আকাশ বাতাস উল্লাসে মেতে উঠেছিল। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি আপনাকে শুধু বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসাবে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)।
নবী প্রেম মুমিনের শক্তি। নবীর মহব্বত ইমানের পূর্বশর্ত। নবীজি (সা.)-এর প্রতি প্রেম মহব্বত ছাড়া কারও ইমান পরিপূর্ণ হতে পারে না। নবীজির চেহারা মুবারক দেখার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবায়ে কেরামরা ক্ষুধা তৃষ্ণার কথা ভুলে যেতেন। হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তানসন্ততি এবং সব মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হই’ (বুখারি : ১৫; মুসলিম : ৬৯)। অন্য হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহর বাণী এবং সর্বোত্তম চরিত্র হচ্ছে মুহাম্মাদ (সা.)-এর চরিত্র’। (বুখারি : ৬০৯৮; মুসলিম : ৮৬৭) ।
নবী হলো ইমানের প্রাণ। নবীজির প্রতি অগাধ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করা ইমানের প্রধান শর্ত। নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়, বরং তার আদর্শ অনুসরণ ও সুন্নাহর বাস্তবায়নই প্রকৃত নবীপ্রেমের মাপকাঠি। আল্লাহকে পেতে হলে নবীজিকে ভালোবাসতে হবে। নবীপ্রেমের কোনো বিকল্প নেই। নবীজি (সা.) খুশি হলে আল্লাহ খুশি। নবীজি (সা.) অখুশি হলে আল্লাহ অখুশি। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহপাককে ভালোবাসো, তাহলে আমার কথা মেনে চলো, আল্লাহপাক ও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন।’ (সূরা আল ইমরান : ৩১)।
নবীপ্রেমের অনন্য উদাহরণ হলো তার সাহাবায়ে কেরাম। নবীপ্রেমে পড়ে অসংখ্য সাহাবিরা ঘরবাড়ি সংসার ধর্ম ফেলে মসজিদে নববীতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তার ডাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। একবার নবীজি (সা.) তার সাহাবিদের দান-সদকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করলেন। তখন হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে বেশ সম্পদ ছিল। তিনি তার অর্ধেক দান করলেন। আর হজরত আবু বকর (রা.)-এর ঘরে যা ছিল, সব নিয়ে এলেন। হজরত জায়েদ ইবনে আসলাম কর্তৃক তার পিতার সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)কে আমি বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, নবীজি (তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে) আমাদের দান করার নির্দেশ দিলেন। সৌভাগ্যক্রমে তখন আমার হাতে বেশ সম্পদও ছিল। আমি (মনে মনে) ভাবলাম, যদি আমি কোনোদিন আবু বকর (রা.)কে ডিঙিয়ে যেতে পারি, তাহলে আজই সেই সুযোগ। আমি আমার অর্ধেক সম্পদ (নবীজির দরবারে) নিয়ে এলাম। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ (হে ওমর)?’ আমি বললাম, ‘অনুরূপ অর্ধেক রেখে এসেছি।’ তারপর আবু বকর (রা.) তার সব সম্পদ নিয়ে হাজির হলেন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবু বকর! পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?’ তিনি জবাবে বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি।’ তখন আমি বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমি কখনোই কোনো প্রসঙ্গে তার চেয়ে অগ্রগামী হতে পারব না।’ (তিরমিজি : ৩৬৭৫)।
উহুদ যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে মুসলিমদের পিছু হটার খবর ও নবীজির শাহাদতের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তখন মদিনার বনু দিন্নার গোত্রের এক নারী উহুদ থেকে আসা কাফেলার কাছে নবীজি (সা.)-এর খোঁজখবর জানতে চান। ওই আনসারী নারী সদস্য মদিনার পথে-প্রান্তরে অপেক্ষা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শহীদ হওয়ার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে পড়লে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। একে একে তার পিতা, স্বামী ও ভাই শহীদ হওয়ার সংবাদ শোনার পরও তিনি শুধু নবীজি (সা.) কেমন আছেন তা জানতে চান এবং নবীজিকে সুস্থ দেখে বলেন, ‘আপনার পর আর সব মুসিবত আমার কাছে তুচ্ছ।’ সত্যি অবাক করার মতো নবীজি (সা.)-এর প্রতি তাদের প্রেম ভালোবাসা। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের অন্তরে নবীজির প্রতি হজরত আবু বকর (রা.) হজরত ওমর (রা.) সহ অন্য সাহাবায়ে কেরামের মতো প্রেম ভালোবাসা জাগ্রত করে দিন। আমিন।
লেখক : সূফিব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠাতা, বাব-ই-ইয়াছিন ‘গুলশানে ইয়াছিন মনজিল’, ঢাকা
