নুরানি ও হাফেজি মাদ্রাসা
আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থায় সময়োপযোগী সংস্কার জরুরি
Advertisement
মাওলানা কালীম মাহফুজ
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিক্ষাঙ্গনে আবাসিক ব্যবস্থাপনা শতশত বছরের পুরোনো একটি ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের সুশৃঙ্খল, সময়ানুবর্তী ও আত্মনির্ভর করে গড়ে তুলতে এর নানা উপকারিতা রয়েছে। দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আবাসিক ব্যবস্থাপনা একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা। বিশেষত উচ্চতর ও বিশেষায়িত শিক্ষার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে আবাসিক শিক্ষার সবটুকু সব বয়সের শিশুর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। বিশেষত যে বয়সে শিশুর ব্যক্তিত্ব, মানসিকতা, সামাজিক বোধ ও আত্মপরিচয়ের মৌলিক ভিত তৈরি হয়, সেসময় দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক ব্যবস্থার সময়োপযোগিতা নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
আবাসিক ব্যবস্থার কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য ঝুঁকিও কম নয়। দীর্ঘসময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে একটি শিশু মা-বাবার স্নেহ, পারিবারিক শিক্ষা, আত্মীয়তার সম্পর্ক, স্থানীয় সমবয়সিদের বন্ধুত্ব এবং স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশ থেকে অনেকটাই দূরে চলে যেতে পারে। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় অগ্রগতি সম্ভব হলেও, শিশুর মেধা, মনন, সামাজিক দক্ষতা ও স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠ দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না।
একটি শিশুর শিক্ষা শুধু বই ও পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারকে দেখে, বড়দের সঙ্গে কথা বলে, ছোটদের সঙ্গে আচরণ করে, প্রতিবেশীর সঙ্গে মিশে, মাঠে খেলতে গিয়ে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে এবং বাস্তব জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়েও সে শিক্ষা অর্জন করে। এসব স্বাভাবিক সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকলে তার চিন্তাচেতনায় এক ধরনের সংকীর্ণতা বা অসম্পূর্ণতা তৈরি হতে পারে।
আধুনিক শিশু বিকাশের ধারণাও বলে, শৈশব ও কৈশোরে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ-তিনটি পরিবেশই শিশুর সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রশ্নটি আবাসিক ব্যবস্থা ভালো না খারাপ-এত সরল নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো-কোন বয়সে, কোন শিশুকে, কী উদ্দেশ্যে, কত সময়ের জন্য এবং কী ধরনের পরিবেশে আবাসিক ব্যবস্থায় রাখা হচ্ছে?
একটি শিশুকে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা রয়েছে। কোনো একটি ক্ষেত্রকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে অন্যটিকে তার বিকল্প বানানো শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য আদর্শ পদ্ধতি হতে পারে না। প্রারম্ভিক জীবন মূলত পারিবারিক শিক্ষা, স্নেহ, অনুকরণ ও নিরাপত্তাবোধ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেসময় দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক ব্যবস্থায় অভ্যস্ত করার অর্থ অনেকাংশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরিবারের বিকল্প হিসাবে দাঁড় করানো। অথচ প্রতিষ্ঠান যত ভালোই হোক, মা-বাবার সম্পর্কের পূর্ণ বিকল্প কোনো প্রতিষ্ঠান হতে পারে না।
এখানে পরিবারগুলোর একটি প্রবণতার কথাও বলতে হয়। সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর পর অনেককেই শিশুর শিক্ষা, চরিত্র, আচরণ ও নৈতিকতার পুরো দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা লক্ষ করা যায়। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। মাদ্রাসা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু পরিবারই শিশুর প্রথম শিক্ষাঙ্গন। সন্তানের নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে পরিবার যে ভূমিকা পালন করে, কোনো প্রতিষ্ঠান তা পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না। তাই আবাসিক মাদ্রাসার সংস্কারের পাশাপাশি অভিভাবকত্বের সংস্কারও জরুরি।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নুরানি ও হেফজখানার প্রচলিত আবাসিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস ও ইতিবাচক সংস্কার অপরিহার্য। তবে এর অর্থ আবাসিক ব্যবস্থা তুলে দেওয়া নয়; বরং বয়স, পরিপক্বতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে একটি ধাপভিত্তিক আবাসিক মডেল তৈরি করা।
প্রথম পর্যায়ে, শিশু যথেষ্ট সমঝদার ও আত্মনির্ভর হওয়ার আগ পর্যন্ত সম্ভব হলে তাকে দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক ব্যবস্থায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন না করাই ভালো। নুরানি ও প্রাথমিক কুরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে দিবাকালীন ব্যবস্থা কার্যকর বিকল্প হতে পারে। শিশু দিনে প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করবে, আর সন্ধ্যায় পরিবারে ফিরে যাবে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পারিবারিক তারবিয়াত-দুটিই বজায় থাকবে।
পরবর্তী পর্যায়ে, যেসব শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক পরিবেশ অপরিহার্য, তাদের ক্ষেত্রে সীমিত বা পর্যায়ক্রমিক আবাসিক ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পরপর বাড়ি ফেরার সুযোগ, নিয়মিত অভিভাবক-সন্তান যোগাযোগ এবং পারিবারিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক ব্যবস্থা যেন কোনোভাবেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার নাম না হয়ে ওঠে।
আর যখন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রয়োজনীয় মানসিক পরিপক্বতা, আত্মনির্ভরতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হবে, তখন পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ব্যবস্থায় যাওয়ার সুযোগ রাখা যেতে পারে। এখানে শুধু বয়স নয়, শিশুর ব্যক্তিগত পরিপক্বতা, পারিবারিক পরিস্থিতি ও তার নিজের আগ্রহও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ একই বয়সের সব শিশু মানসিকভাবে সমান পরিপক্ব নয়।
পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ব্যবস্থায়ও শিক্ষার্থীর জীবন যেন শুধু পড়াশোনা, খাবার, ঘুম ও নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। নিয়মিত খেলাধুলা, শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, অবসর, বই পড়া, সৃজনশীল কাজ, বিতর্ক, আলোচনা, সামাজিক মেলামেশা ও বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে। তাকে বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা অবশ্যই থাকবে; কিন্তু শৃঙ্খলার নামে ভয়, অপমান, অমানবিক শাস্তি বা শারীরিক নির্যাতনের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। শাসনের উদ্দেশ্য হবে ভয় সৃষ্টি করা নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করা। এজন্য শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়কদের শিশুমনোবিজ্ঞান, বয়সভিত্তিক আচরণ, যোগাযোগ দক্ষতা ও শিশু সুরক্ষা সম্পর্কে প্রশিক্ষিত হওয়া দরকার। প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং শিশু সুরক্ষার সুস্পষ্ট নীতিমালাও থাকা জরুরি।
অভিভাবককেও শিক্ষাব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদার করতে হবে। নিয়মিত অভিভাবক-শিক্ষক বৈঠকে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষার্থীর আচরণ, মানসিক অবস্থা, বন্ধুত্ব, আগ্রহ ও সমস্যাগুলো নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত। সন্তান মাদ্রাসায় থাকলেও তার সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক যেন প্রাণবন্ত থাকে, সে বিষয়টি প্রতিষ্ঠানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশু শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়; সে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি ভবিষ্যতের আমানত। তাকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা বা কুরআন মুখস্থ করার যোগ্য করে তোলাই যথেষ্ট নয়; তাকে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল, সামাজিকভাবে দক্ষ, নৈতিক ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসাবে গড়ে তোলাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য।
তাই সমাধান পরিবার বনাম মাদ্রাসা নয়; সমাধান হলো পরিবার ও মাদ্রাসার মধ্যে সুস্থ অংশীদারত্ব। শিশুর প্রথম আশ্রয় পরিবার, শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা এবং বাস্তব জীবনের বৃহত্তর পাঠশালা সমাজ। এ তিনটির সমন্বয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি হতে পারে।
আবাসিক ব্যবস্থাপনাকে তাই সেনাবাহিনীর ব্যারাক নয়, বরং শিশুর মেধা, মনন, ইমান, চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের বিকাশে সহায়ক একটি প্রাণবন্ত শিক্ষাপরিবেশ হিসাবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য। আবাসিক জীবন যেন শিশুকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়; বরং তাকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য আরও প্রস্তুত করে-এটাই হওয়া উচিত আমাদের সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আনওয়ারুল উলূম সালামবাগ, রামপুরা, ঢাকা
