Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম

বড়পীর আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)

Advertisement

Icon

ফিরোজ আহমাদ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম

Advertisement

ফাতেহার অর্থ হলো দোয়া, মোনাজাত বা প্রার্থনা করা। ইয়াজদাহম হলো ফারসি শব্দ, যার অর্থ একাদশ বা এগারো। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম বলতে মাসের ১১তম দিনকে বোঝায়। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম হলো হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর ওফাত বা ইন্তেকাল দিবস। হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর স্মরণে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালিত হয়। সুন্নি মুসলমান তথা সুফিবাদের অনুসারী তরিকাপন্থি লোকদের কাছে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম বিশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রতিবছর সুন্নি মুসলমানরা বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালন করে থাকেন। তাদের কাছে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম বিশেষ অর্থ বহন করে। আধ্যাত্মিক জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর নাম প্রত্যেক মুসলমানের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। তিনি অলীকুল শিরোমণি হিসাবেও পরিচিত। মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে তার কারামাত ও বুজুর্গির প্রভাব অপরিসীম।

হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) হিজরি ৪৭০ সালের ১ রমজান বাগদাদ শহরের জিলান এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবু সালেহ মুসা জঙ্গি, মায়ের নাম সাইয়েদা উম্মুল খায়ের ফাতেমা। তার বাবা ছিলেন নবীজি (সা.)-এর নাতি হাসান ইবনে আলীর বংশধর, মাতা ছিলেন নবীজি (সা.)-এর আরেক নাতি হোসাইন ইবনে আলীর বংশধর। একজন আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ হিসাবে বিশ্ব জগতের মুসলমানরা হজরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)কে পরম ভক্তি, শ্রদ্ধার সঙ্গে চিরকাল স্মরণ করেন।

শৈশব থেকে হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মধ্যে সচ্চরিত্রতা ও খোদা প্রেমের গুণাবলি ফুটে ওঠে। বাবা-মায়ের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে ১৮ বছর বয়সে বাগদাদ শরিফে গমন করেন। বাগদাদ গমনকালে তার মা তাকে ৪০টি দিনার বগলের নিচে জামার কাপড়ে সেলাই করে দেন এবং উপদেশ দিয়ে বললেন, প্রিয় বৎস, কখনো মিথ্যা কথা বলবে না। সর্বাবস্থায় আল্লাহতায়ালার ওপর তাওয়াক্কুল করবে। মায়ের উপদেশ পালনের ওয়াদা করে তিনি বাগদাদের পথ যাত্রা করেন; আর এ যাত্রা পথেই এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে।

বাগদাদ যাওয়ার পথে তার কাফেলা হামাদান নামক স্থানে ডাকাতের কবলে পড়ে। দস্যুরা যাত্রীদের সবকিছু লুটে নিয়ে যায়। ডাকাতদের একজন তার কাছে কিছু আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানান, আমার কাছে ৪০টি দিনার আছে। লুকানো মুদ্রা দেখে ডাকাতরা বলল, তুমি তো এ কথা স্বীকার না করলেও পারতে। তিনি ডাকাত দলের কথার উত্তরে বললেন, মা আমাকে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন, তাই আমি সত্য বলেছি। ডাকাত দল তার সত্যবাদিতায় মুগ্ধ হয়ে সব রকম অন্যায় অপকর্ম ছেড়ে দিয়ে পরবর্তী সময়ে খাঁটি মুসলমান হয়ে যায়।

হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) প্রায় ২৫ বছর বাগদাদের গভীর অরণ্যে নির্জনে মুরাকাবা-মুশাহাদা ও কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনায় কাটিয়েছেন। সারা বছর রোজা পালন করতেন। এভাবে তিনি নিজ ইচ্ছাশক্তি, কর্মশক্তি ও চিন্তাশক্তিকে আল্লাহতে সমর্পণ করে দিয়েছিলেন। তারই ইচ্ছায় সিদ্ধিতে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন।

শরিয়ত ও মারেফাতের পূর্ণতা অর্জন করার পর আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে তিনি জনসভার আয়োজন করে ইসলামের বাণী প্রচার করতেন। ওয়াজ-নসিহতের পাশাপাশি তিনি জাহেরি ও বাতেনি তালিম দিয়ে গড়ে তোলেন শক্তিশালী মুবাল্লিগ দল। তার ওয়াজের এতটাই তাসির হিম্মত ছিল, ওয়াজ শুনে উপস্থিত অনেকেই প্রাণ হারিয়ে ফেলতেন। ইসলামের সুমহান বাণী প্রচারের জন্য বিভিন্ন দেশে মুবাল্লিগ দলের প্রতিনিধি প্রেরণ করতেন। তিনি ফুতুহুল গায়ব, গুনিয়াতুত্তালিবিন, কাসিদা-ই-গাউসিয়া, ফাতহুর রাব্বানী নামক গ্রন্থ রচনা করে ইসলামের ফিকহ ও তাসাউফের দুই ধারার সম্মিলন ঘটান।

হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর অসংখ্য কারামত ও বুজুর্গির ঘটনা মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। মায়ের গর্ভে থাকাকালীন আঠারো পারা কুরআন মুখস্থ করা, একই সময়ে ৭০ ভক্তের বাড়িতে ইফতার করা, চোরকে কুতুব বানিয়ে দেওয়াসহ অসংখ্য কেরামতের ঘটনা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে শোনা যায়। সুন্নি মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, তিনি সব পীরের পীর, অর্থাৎ পীরানে পীর। সব পীরের গর্দানের ওপর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর কদম মোবারক রয়েছে। তার অনুসারীরা দেশে দেশে দরবার-খানকা প্রতিষ্ঠা করে দ্বীন প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। প্রত্যেক আরবি মাসের ১১ তারিখ তার অনুসারীরা ধর্মীয় গাম্ভীর্যতার সঙ্গে দরবার-খানাকাগুলোতে বিশেষ কুরআনখানি, দোয়া, জিকির-আসকার, জিয়ারত, শিন্নি-সালাতের আয়োজন করে থাকেন।

প্রতিবছরের মতো এ বছরও ২৩ সেপ্টেম্বর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর অনুসারী সুন্নি মুসলমানরা ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষ্যে বিভিন্ন দরবার-খানকা শরিফে ধর্মীয় গাম্ভীর্যতার সঙ্গে কুরআনখানি, আলোচনা, জিকির-আসকার, জিয়ারত, দোয়া, শিন্নি-সালাতের আয়োজন করবেন। আল্লাহতায়ালা ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের ফয়ুজাত সবাইকে দান করুক। আমিন।

লেখক : সুফিব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠাতা, বাব-ই-ইয়াছিন গুলশানে ইয়াছিন মনজিল, এলাহাবাদ, দেবিদ্ধার, কুমিল্লা

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম