কওমি শিক্ষায় নতুন দিগন্ত জামিয়া কাশিফুল উলূম
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যেই গড়ে উঠেছে এমন একটি কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে একই ছাদের নিচে চলছে কুরআন-হাদিস, দরসে নেজামি, সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বিত পাঠদান। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতায় শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার এমন উদ্যোগ কওমি শিক্ষাঙ্গনে তৈরি করেছে ভিন্নধারার একটি দৃষ্টান্ত।
প্রতিষ্ঠানটির নাম জামিয়া কাশিফুল উলূম ঢাকা। কওমি শিক্ষার প্রচলিত ধারার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছে এর শিক্ষা কার্যক্রম। রাজধানীর মাতুয়াইলে অবস্থিত এ জামিয়ার সঙ্গে রয়েছে স্কুল ও কলেজ বিভাগ। ফলে একজন শিক্ষার্থী কওমি মাদ্রাসার ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায়ও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
জামিয়ার সংশ্লিষ্টরা জানান, এখানে দিনে মাদ্রাসার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রাতে চলে স্কুল ও কলেজ বিভাগের পাঠদান। কওমি শিক্ষার পাশাপাশি স্কুল শাখার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাস করেছে।
শুধু পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়া শিক্ষকরা পাঠদান করছেন। একইসঙ্গে কওমি মাদ্রাসার দরসে নেজামির গুরুত্বপূর্ণ কিতাব পড়ানো হচ্ছে দেশের অভিজ্ঞ ও মেধাবী আলেমদের কাছে।
আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ভাষা শিক্ষাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জামিয়ায়। মাদানী নেসাবের আলোকে আরবি ভাষা শিক্ষার ওপর রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে আরবি ভাষায় কথোপকথনের অনুশীলন করানো হয়, যাতে তারা শুধু কিতাব পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে আরবি ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে রয়েছে ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব। শ্রেণিকক্ষের পাঠের বাইরে ভাষা চর্চার সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
জামিয়া কাশিফুল উলূম ঢাকার শিক্ষা পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা। একজন আলেম যেন শুধু ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধই না হন, বরং নিজের জীবিকা ও কর্মক্ষেত্রেও দক্ষতা অর্জন করতে পারেন-এ লক্ষ্যেই কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কম্পিউটার গ্রাফিক্স ডিজাইন, আউটসোর্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং, লাইটিং ও ক্যামেরা পরিচালনার মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি রয়েছে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগ। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শেখানোর জন্য রয়েছে নিজস্ব সায়েন্স ল্যাব ও কম্পিউটার ল্যাব।
বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাকে উৎসাহিত করতে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় সায়েন্স ফেয়ার। এতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ধারণা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প উপস্থাপনের সুযোগ পায়। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের সৃজনশীলতা বিকাশেও রয়েছে নানা উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রকাশিত হচ্ছে আরবি ও বাংলা মাসিক পত্রিকা। প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে ভাষা ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং চারুকলা অনুষদ, আর্টস ও ক্যালিগ্রাফি বিভাগ।
ফলে একজন শিক্ষার্থী একইসঙ্গে লেখালেখি, ভাষা, সাংবাদিকতা, শিল্প ও ক্যালিগ্রাফির মতো সৃজনশীল ক্ষেত্রে নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে।
শারীরিক সুস্থতা, মানসিক বিকাশ ও শৃঙ্খলাবোধ তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের চেষ্টা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে তাদের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে। সপ্তাহে একদিন শিক্ষার্থীরা পথশিশুদের জন্য নিজেদের উদ্যোগে খাবার রান্না করে। জামিয়ার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে ‘পথশিশুদের মক্তব’ নামে একটি কার্যক্রম। এতে সুবিধাবঞ্চিত ও ছিন্নমূল শিশুদের খাবার দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়।
দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরিতেও রয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। জাতীয় দিবসগুলোতে আয়োজন করা হয় নানা কর্মসূচি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে ‘আমার দেশ, আমি সুন্দর করি’ স্লোগান সামনে রেখে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেয়। ধর্মীয় শিক্ষার অংশ হিসাবে সুন্নাহ পরিপালন, আমল-আখলাক ও দাওয়াহভিত্তিক জীবন গঠনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য আরবি ভাষায় গবেষণামূলক কিতাবের একটি বড় সংকলনও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
জামিয়া কাশিফুল উলূম ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক লেখক, গবেষক ও বহুগ্রন্থপ্রণেতা মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা সিলেবাস সংস্কার ও আধুনিক কারিকুলাম নিয়ে কাজ করছেন। সেই চিন্তার ধারাবাহিকতায় তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সুযোগ পাবে।
তার ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে-আলেম তৈরি হবে, তবে সেই আলেম হবেন সময়-সচেতন, জ্ঞানমনস্ক, দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল। একইসঙ্গে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন নাগরিকের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মানবিক দায়িত্ববোধও থাকতে হবে।
কওমি শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের উদ্যোগ কতটা দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর মডেলে পরিণত হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির এ প্রয়াস শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে, তা কওমি শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনশীল বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

