পর্যালোচনা মিশন কাল আসছে
শর্তে আইএমএফ’র সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আবারও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েও ঋণের শর্ত পূরণ করেনি। সেজন্য তারা আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে আসা নতুন সরকারের কাছ থেকে শর্ত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়েই ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় করতে চায়। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, আইএমএফের মৌলিক অধিকাংশ শর্তই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেগুলো হয়নি সেগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। হুট করে এগুলো করা সম্ভব নয়। সময় নিয়ে করতে হবে। এসব কারণে আগামী কিস্তি ডিসেম্বরের মধ্যেই ছাড় করা উচিত। এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের শর্ত পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে আগামীকাল বুধবার একটি মিশন বাংলাদেশে আসছে। তারা দুই সপ্তাহ দেশে অবস্থান করে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করবে।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ঋণের শর্তের বিষয়ে আইএমএফের প্রধান আপত্তি হচ্ছে ডলার নিয়ে। সংস্থাটি মনে করে অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে ডলারের দাম তুলনামূলকভাবে কম। এর দাম আরও বেশি হওয়া উচিত। সরকার মনে করছে, বাংলাদেশে ডলার অতিমূল্যায়িত। এর দাম এত বেশি হওয়া উচিত নয়। কারণ বিগত সরকার ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেশি হারে কমিয়েছে। কিন্তু আইএমএফ মনে করছে, প্রকৃত বিনিময় হারে ডলারের দাম বাজার দরের চেয়ে বেশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য রয়েছে এমন ১৫টি দেশের মুদ্রার সঙ্গে সমন্বয় করে ডলারের বিপরীতে টাকার মান নিরূপণ করে সেটি প্রকৃত বিনিময় হার নামে পরিচিত। বাজারে যে দামে ডলার বেচাকেনা হয় সেটি সাধারণ বা নমিনাল বিনিময় হার নামে পরিচিত। বর্তমানে প্রকৃত বিনিময় হার ১২৭ টাকা, বাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২২ টাকায়। এখানে ৫ টাকার ব্যবধান রয়েছে। এ কারণে ডলারের দাম বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া উচিত।
সংস্থাটির মতে, বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ না করলে বাজারই ডলারের প্রকৃত দাম নির্ধারণ করবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের কারণে এর দাম বাজার নির্ধারণ করতে পারছে না। এজন্য আইএমএফ চাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনবেও না, বিক্রিও করবে না।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ডলারের দাম এখন বাজারই নির্ধারণ করছে। বাজারের ডলারের প্রবাহ বেড়ে গেলে এর দাম পড়ে গিয়ে মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে, এটি ঠেকাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। এছাড়া রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই ডলার কেনা হচ্ছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে না। প্রতিবেশী ভারতসহ প্রায় সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই বাজার থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার কেনে ও বিক্রি করে। এটি শুধু বাংলাদেশ করছে তা নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত জুলাইয়ে মুদ্রানীতি ঘোষণার সময়ই বলেছিল, সেপ্টেম্বর থেকে নীতি সুদের হার কমাবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশিতভাবে না কমায় সেটি করেনি। এখন বলছে, আগামী জানুয়ারি থেকে নীতি সুদের হার কমাবে। এতেও আইএমএফ আপত্তি করেছে। তারা বলেছে, মূল্যস্ফীতির হার ঝুঁকির নিচে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদের হার কমানো ঠিক হবে না। এ হার কমপক্ষে ৫ শতাংশের মধ্যে এলে নীতি সুদের হার কমানো যায়, এর আগে নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার অনেকটা বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে হচ্ছে। মুদ্রানীতি বা টাকার প্রবাহের সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক নেই। যে কারণে চলতি অর্থবছরসহ পরপর চার অর্থবছর ধরে টাকার প্রবাহ কমানোর নীতি অনুসরণ করেও মূল্যস্ফীতির হার কমানো যায়নি।
আইএমএফের অন্যতম একটি শর্ত হচ্ছে, খেলাপি ঋণ ২০২৬ সালের মধ্যে সরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশের মধ্যে ও বেসরকারি ব্যাংকে ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা। এ শর্ত দিয়েছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের চিত্র বেরিয়ে আসতে থাকে। যে কারণে এখন খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কমানো যাচ্ছে না। দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়ে গেছে, এ কারণে অর্থনীতিতে ওলটপালট হচ্ছে, আইএমএফ এটি আমলে নিচ্ছে না।
আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ব্যাপকভাবে সংস্কার করতে হবে। তা না হলে রাজস্ব আয় বাড়ানো যাবে না। কর জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন। এটি বাড়াতে হবে। এজন্য করছাড় ও কর অবকাশে ছাড় দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে বলেছে সংস্থাটি। এদিকে সরকার এনবিআরে ব্যাপক সংস্কার এনেছে। আরও সংস্কার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। করছাড় ও কর অবকাশ কমানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য আইএমএফের একটি পর্যালোচনা মিশন আগামীকাল বুধবার ঢাকায় আসছে। তারা এবার দুই সপ্তাহ দেশে অবস্থান করে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবে।
