স্কুলছাত্রীর লাশ ঘিরে মিলছে নানা তথ্য
যশোরে মন্দির দখলে নিতে ইসকনের অপতৎপরতা
Advertisement
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যশোর শহরের চাঁচড়া রাজবাড়ীসংলগ্ন ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দির দখলচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ইসকনের (আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ) অনুসারীদের বিরুদ্ধে। মন্দিরটির জায়গায় বসবাসকারী ৬টি পরিবারকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে তারা নানামুখী অপতৎপরতা চালাচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে। ওই মন্দির এরিয়ায় নিজ ঘর থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রা ঘোষের লাশ উদ্ধারের পরই বিষয়টি সামনে এসেছে। ছাত্রীর স্বজনসহ বাসিন্দাদের দাবি, মন্দিরের সম্পূর্ণ জায়গা গ্রাস করতেই ইসকন নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মন্দির চত্বরের একটি জরাজীর্ণ ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় মেয়েটির লাশ উদ্ধার হয়। শহরতলীর একটি প্রতিষ্ঠানে দশম শ্রেণিতে পড়ত সে। পরদিন শিক্ষার্থীর লাশ নিয়ে প্রেস ক্লাব যশোরের সামনে সড়কে বিক্ষোভ করেন তার স্বজনসহ স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, মন্দির অধ্যক্ষের অসদাচরণ, যৌন হয়রানি, মারধর, অপমান-অপদস্তের শিকার হয়ে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে।
ছাত্রীর ভাই বলেন, বছর দশেক আগে এই মন্দিরের কমিটির কতিপয় সদস্যের মাধ্যমে ইসকন এখানে কার্যক্রম শুরু করে। তারা এখানে আসার পর থেকেই আমাদের বাস্তুচ্যুত করতে নানা অপরতৎপরতা চালাচ্ছিল। তাদের সেই প্রক্রিয়ার সর্বশেষ শিকার আমার ছোটবোন। তাকে গালাগালি, যৌনপীড়ন ও অপমানের শিকার বানানো হয়।’ তার দাবি, ‘আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। সেদিন ইসকনের অধ্যক্ষ অনুপম রায় (অপার গোবিন্দ দাস) ও তার লোকজন প্রথমে আমার মাকে অশ্লীল গালাগাল দেয় ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে নির্যাতন করে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা এখানে ৭০-৮০ বছর বংশানুক্রমে বসবাস করে আসছেন। ৬২ শতক জমিতে আগে ১০ পরিবার থাকলেও বর্তমানে ৬ পরিবার রয়েছেন। মৌসুমি ঘোষ, সুরঞ্জন বিশ্বাস, শুভ ঘোষ ও মনি বিশ্বাস জানান, ইসকন ‘প্রভূরা’ বিভিন্ন সময়ে তাদের এই জায়গা ছেড়ে দিতে হুমকি দিয়ে আসছেন। এখানে তারা আরও বড় মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘ইসকন মন্দিরে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট ঘর রয়েছে। সেখানে বাইরের তরুণ ছেলেরা থাকে। তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসে। তাদের নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে।’
মন্দিরে নতুন আসা সুমন বিশ্বাস ওরফে সুমুখ শ্যামহরিদাস জানান, আগের প্রভূরা নেই, কিন্তু পূজা তো বন্ধ করা যাবে না। সেই কারণে আমাদের পাঠানো হয়েছে। মন্দিরের জমিতে থাকা লোকজন উচ্ছেদের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, শান্ত রায় নামে এক যুবকের বাড়ি পঞ্চগড় জেলা সদরের হাড়িভাসা গ্রামে। তিনি যশোর এমএম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স প্রথমবর্ষের ছাত্র। প্রায় তিন মাস তিনি এখানে অবস্থান করছেন। প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়া দেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে বাংলাদেশের নাগরিকের কোনো প্রমাণপত্র তিনি দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।
এসব ঘটনা খতিয়ে দেখছে যশোরের মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর। এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ‘ডাক্তার, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের টিম গঠন হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছি। অভিযুক্তরা অন্যত্র চলে গেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মেয়েটির মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।’
আত্মগোপনে যাওয়া মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস মুঠোফোনে বলেন, মন্দিরটি একটি দেবোত্তর সম্পত্তি। সেখান থেকে কাউকে বিতাড়ন করার চেষ্টা করা হয়নি। মেয়েটিকে কোনো কটু কথাও বলা হয়নি। কাউকে মারধর করা পূজারির কাজ নয়।
যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি কবির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রীর লাশ উদ্ধারের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, বাইরে থেকে পূজারি আসতেই পারে। এখানে যারা যুগের পর যুগ বসবাস করে আসছে, তাদের উচ্ছেদ করে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
দশমহাবিদ্যা মন্দিরের ইতিহাস : মন্দিরটি যশোরের পুরোনো স্থাপনাগুলোর একটি। চাঁচড়ার রাজবংশ এটির প্রতিষ্ঠাতা। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও রাজা শুকদেব রায় (১৭২৯-১৭৪৫) ও রাজা শ্যামসুন্দর রায়ের (১৭৩১-১৭৫০) রাজত্বকালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে ইতিহাসে জানা যায়। ২০১৬ সালে ইসকনের কথিত সাধুরা মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেন বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়।
