বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন
বড় ঋণ গ্রাহকরাই বেশি খেলাপি
ব্যবসা-বাণিজ্য খাতের ঋণ ৪৪ শতাংশই খেলাপি * ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রহীতার ৪৩.৪ শতাংশ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়লেও কমেছে ঋণ খেলাপির সংখ্যা। বড় অঙ্কের ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বেশি হওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ব্যাংকগুলোর খাতওয়ারী বিতরণ করা ঋণের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতের ঋণ সবচেয়ে বেশি খেলাপি হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিল্প ও নির্মাণ খাতের ঋণ। ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি যারা ঋণ নিয়েছে তাদের মধ্যেই খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বেশি। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান কমে গেছে। সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি বেড়ে গেছে। এসব পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
রোববার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে ঋণের নামে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। এসব ঋণের অর্থের বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে। ফলে ওইসব ঋণ এখন আদায় হচ্ছে না। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ লাফিয়ে বাড়ছে। বিশেষ করে বড় ঋণগ্রহীতারাই এখন সবচেয়ে বেশি খেলাপি। এছাড়া দেশে ও বৈশ্বিকভাবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতেও অনেক গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। তারাও এখন খেলাপি হচ্ছেন।
প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত মার্চে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল খেলাপি। গত জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে পরিপূর্ণ ইসলামী ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশই খেলাপি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ খেলাপি। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ খেলাপি। খেলাপি ঋণ সবচেয়ে কম রয়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে অর্থাৎ ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। খাতভিত্তিক ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে অর্থাৎ মোট ঋণের ৪৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিল্প খাত ও নির্মাণ খাত। দুই খাতের প্রতিটিতে খেলাপি হার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। পরিবহণ খাতে ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ, কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে। ভোক্তা ঋণের মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ খেলাপি হয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, পরিমাণ ও শতকরা হারে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়লেও ঋণখেলাপির সংখ্যা কমেছে। গত মার্চে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ৮৬ হাজার ২৮৬ জন। গত জুনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৪ জনে। তিন মাসে ঋণখেলাপির সংখ্যা কমেছে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭২ জন।
গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ৬০ শতাংশই রয়েছে বড় শিল্প খাতে। এর প্রায় ৪০ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। পরিমাণগতভাবে এ খাতেই সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে। মাঝারি শিল্পের ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ছোট শিল্পের ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ, কুটির শিল্পের ৪৬ শতাংশ ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
গত জুন পর্যন্ত ১ কোটি টাকার বেশি গ্রহীতাদের কাছে মোট ঋণ স্থিতি ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ শতাংশই খেলাপি। ১ কোটির বেশি থেকে ১০ কোটি টাকা গ্রহীতাদের মধ্যে বিতরণ করা করা ঋণ স্থিতি ৩ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ৩০ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ১০ কোটির বেশি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত গ্রহীতাদের মধ্যে ঋণ স্থিতি ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। ২০ কোটির বেশি থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত গ্রহীতাদের মধ্যে বিতরণ করা ঋণ স্থিতি ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। ৩০ কোটির বেশি থেকে ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত গ্রহীতাদের মধ্যে ঋণ স্থিতি ৬৯ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ৩৯ শতাংশই খেলাপি। ৪০ কোটির বেশি থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত গ্রহীতাদের মধ্যে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৪৬ শতাংশ। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে স্থিতি ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যেই খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বেশি।
