শেবাচিম হাসপাতাল
রোগীর চাপে বেসামাল চিকিৎসাসেবা
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভেঙে পড়েছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) চিকিৎসাব্যবস্থা। মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সরা। ১০০০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে প্রতিদিন ভর্তি থাকছেন গড়ে প্রায় তিন হাজার রোগী। শুধু তাই নয়, বহির্বিভাগেই দৈনিক আড়াই হাজারের বেশি রোগীকেও দিতে হচ্ছে চিকিৎসা। জনবল সংকটের মধ্যেই আউটডোর-ইনডোর মিলিয়ে সাড়ে ৫ হাজার রোগীর সেবা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৫০০ শয্যার জনবল দিয়ে চালানো হচ্ছে হাসপাতালটি। এই জনবলের মধ্যে আবার চিকিৎসকের ৮৭টি পদই শূন্য। নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেক পদ বর্তমানে শূন্য। জনবল সংকট সমাধানে বহুবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও আশা করার মতো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি আজ পর্যন্ত। ফলে অচল হওয়ার দশায় পড়েছে বরিশাল অঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসার একমাত্র আশ্রয়স্থল এই হাসপাতালটি।
খাবারের পাশাপাশি রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিয়েও রয়েছে সংকট। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ চাইলেও বরাদ্দ মেলে শয্যার হিসাবে। ফলে অর্থবছরের শেষ ৩-৪ মাস রোগীদের দেওয়ার মতো আর ওষুধ থাকে না। বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ বরাদ্দ দেয় না সরকার।’
রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়লেও বাড়েনি জনবল। ১০৬২টি নার্স পদের মধ্যে খালি ৫৮টি। এছাড়া ১৬১টি তৃতীয় শ্রেণির পদের বিপরীতে ৭৪ এবং চতুর্থ শ্রেণির ৪৩৩ পদের বিপরীতে ২২৪টি পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ভয়াবহ আবাসন সংকট।
মেঝে, বারান্দা ও করিডরে সর্বত্রই রোগী : গত ৫৮ বছরে নতুন করে নির্মিত হয়েছে মাত্র একটি ভবন। দুটি ভবনে প্রতিদিন ভর্তি থাকছে প্রায় তিন হাজার রোগী। ফলে স্থান সংকটে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা, করিডর এমনকি লিফট ও টয়লেটের সামনেও বিছানা করে থাকছেন রোগীরা। রোগীর চাপে পা ফেলাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। সোমবার সকালে মেডিসিন বিভাগে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। নতুন ভবনে থাকা ওই বিভাগের ওয়ার্ড, মেঝে ও করিডর সর্বত্রই রোগী। লিফট আর টয়লেটের সামনের স্থানও খালি নেই।
হাসপাতালের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) দপ্তর সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, মেডিসিন বিভাগের ১০টি ওয়ার্ডে সবমিলিয়ে শয্যা রয়েছে মাত্র ১০২টি। অথচ এসব ওয়ার্ডে সোমবার ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৪০। এর মধ্যে আবার ১২৬ জন ডেঙ্গু ও ৯৬ জন হামের রোগী। নিয়মানুযায়ী ডেঙ্গু রোগীদের সম্পূর্ণ আলাদা রাখার কথা থাকলেও জায়গা সংকটে তাদের অন্য রোগীদের সঙ্গে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের মূল ভবনের নিচের করিডরগুলোও রোগীতে ভর্তি হয়ে আছে।
মেডিসিন বিভাগে ৪৩৩ রোগীর জন্য ১ চিকিৎসক! : ‘পরিচয় না প্রকাশের শর্তে মেডিসিন বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৪০০ নতুন রোগী ভর্তি হয়। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা বাদ দিলে দৈনিক চিকিৎসাধীন থাকে ১২০০ থেকে ১৩০০ রোগী। আমরা এখানে রেজিস্ট্রার-সহকারী রেজিস্ট্রার মিলিয়ে কর্মরত থাকি তিনজন চিকিৎসক। হিসাব করে দেখুন, একজন চিকিৎসকের প্রতিদিন ৪৩৩ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়।’ এটা কি কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সম্ভব-প্রশ্ন রাখেন তিনি। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থেকে শেবাচিমে চিকিৎসা নিতে আসা ডেঙ্গু রোগী কল্পনা আক্তার বলেন, ‘এখানে আসার পর আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছি। ওয়ার্ডে নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। মেঝে পর্যন্ত রোগীতে বোঝাই।’
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, রোগীদের স্থান সংকুলানের জন্য তিন হাজার শয্যার অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া সমস্যার সমাধান হবে না।’
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মশিউল মুনির বলেন, ‘জনবল কাঠামো ও শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির প্রস্তাব বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে জমা আছে। সেটি অনুমোদন হলে সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আমরা সীমিত সাধ্য দিয়ে সবটুকু করার চেষ্টা চালাচ্ছি।’

