ব্যাংককে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর বিষয়ে প্রস্তাবনা
সহজ শর্তে ঋণের ওপর গুরুত্ব আইএমএফের
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের চাপে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব আয়ের ১৪ শতাংশে। ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমলেও সুদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমছে না। এ পরিস্থিতিতে ঋণ পুনর্গঠন দ্রুত ও কার্যকর করার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ এবং আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। শনিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এসব কথা বলেন।
এ সময় ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেনের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা দিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক জুলি কোজাকের সঞ্চালনায় ব্রিফিংয়ে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান উপস্থিত ছিলেন।
ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্য রাজস্বনীতি এবং সরকারি ব্যয়ের সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) নতুন প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জি-২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্যোগটিতে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদানের নেতৃত্বের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জর্জিয়েভা বলেন, কিছু দেশের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হলেও তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি থাকে। এসব দেশের জন্য নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সমন্বিত আন্তর্জাতিক অর্থায়নের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তার মতে, সরকার, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীরা নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে তার সুফল মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হবে।
ব্যাংকবহির্ভূত লেনদেনে এআই সাইবার থ্রেট নিয়ে সর্তকতা : আইএমএফের ‘ফিউচার অব ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক সেমিনারে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেনের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। লেনদেন স্থিতিশীলতার ঝুঁকির পরিবর্তনশীল প্রকৃতি এবং সংস্কারগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের নানা বিষয় তুলে ধরে গ্রিসের সেন্ট্রাল ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, এআই রিলেটেট সাইবার থ্রেট আছে। এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন থাকতে হবে। নাগরিকদের চাহিদা বুঝে এটা করতে হবে।
আইএমএফের উপপরিচালক মিকেলা এরবেনোভা বলেন, বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেন বেড়েছে। লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। এই জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নতুন ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, সামগ্রিক ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে। আমাদের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই কাজ করতে।
তিনি কিছু বিষয়ে সুপারিশ দিয়ে বলেন, আর্থিক খাতের বর্তমান নিয়ম-কানুন, রিপোর্টিং মানদণ্ড এবং পুঁজির মানদণ্ড নতুন ধরনের ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত কিনা, তা খতিয়ে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করার পাশাপাশি প্রতিটি দেশের নিজস্ব আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং ভিন্ন ভিন্ন গ্রহণক্ষমতার স্তরকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কাঠামো, অপারেশনাল স্থিতিস্থাপকতা, জাতীয় কর্তৃপক্ষের টুলস, নিয়ম-কানুন এবং মানবসম্পদ ও সক্ষমতার ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে তা বাস্তবায়নে সহায়তা করার ওপর জোর দিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের দাতা হলো মঙ্গোলিয়া : বিশ্বব্যাংকের স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য গঠিত তহবিল ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) দাতা হিসাবে যুক্ত হয়েছে মঙ্গোলিয়া। দেশটির পার্লামেন্ট আইডিএতে ৪৮০ কোটি মঙ্গোলীয় তুগরিক (প্রায় ১৩ লাখ মার্কিন ডলার) দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণকারী দেশ থেকে অন্য দেশকে সহায়তা দেওয়ার এই উদ্যোগকে নিজেদের উন্নয়নযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে দেখছে মঙ্গোলিয়া। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে সংস্থাটির সদস্য হওয়ার পর থেকে মঙ্গোলিয়া ১৬২ কোটি ডলারের বেশি উন্নয়ন অর্থায়ন পেয়েছে। পরিবহণ, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে দেশটি আইডিএর সহায়তাও পেয়েছে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে আইডিএর সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মঙ্গোলিয়া বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইবিআরডি) আওতাভুক্ত গ্রাহক দেশে পরিণত হয়।
মঙ্গোলিয়ার অর্থমন্ত্রী মেন্দসাইখান জাগদজাভ বলেন, আইডিএ২১-এ অবদান রাখা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতি মঙ্গোলিয়ার অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি বলেন, আইডিএর সহায়তা পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে মঙ্গোলিয়া বুঝতে পেরেছে, দারিদ্র্য কমানো, অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে সহজ শর্তের অর্থায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্য দেশগুলোকেও তাদের উন্নয়ন লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে সহায়তা করতে পেরে মঙ্গোলিয়া গর্বিত।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অংশীদারত্ব, উদ্ভাবন ও অর্থায়ন সংগ্রহবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট লিসা ফিনেরান বলেন, মঙ্গোলিয়ার উন্নয়নের অগ্রযাত্রা দেখিয়েছে, ধারাবাহিক উন্নয়ন কী ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। আইডিএর দাতা গোষ্ঠীতে মঙ্গোলিয়াকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, অন্য দেশগুলোর আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গঠনে দেশটির এই অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আইডিএ হলো বিশ্বের ৭৮টি স্বল্প আয়ের দেশের জন্য গঠিত একটি তহবিল। এই তহবিল থেকে দারিদ্র্য কমানো, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়।

