এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বাংলা প্রথমপত্র
Advertisement
ড. সনজিত পাল
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিনিয়র শিক্ষক, সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা
লালসালু
-সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
‘লালসালু’ একটি সামাজিক সমস্যামূলক উপন্যাস। যুগ যুগ ধরে শেকড়গাড়া কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ভীতির সঙ্গে সুস্থ জীবনাকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব এ উপন্যাসের মূল বিষয়। গ্রামবাসীর সরলতা ও ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ী মজিদ প্রতারণাজাল বিস্তারের মাধ্যমে কীভাবে নিজের শাসন ও শোষণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তারই বিবরণে সমৃদ্ধ ‘লালসালু’ উপন্যাস। কাহিনিটি ছোট, সাধারণ ও সামান্য; কিন্তু এর গ্রন্থনা ও বিন্যাস অত্যন্ত মজবুত। লেখক সাধারণ একটি ঘটনাকে অসামান্য নৈপুণ্যে বিশ্লেষণী আলো ফেলে তাৎপর্য-মণ্ডিত করে তুলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশবিভাগ ও নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানকে গড়ে তোলার আন্দোলনে দিশেহারা বাঙালির চিরচেনা মধ্যবিত্ত জীবনের বিচিত্রমুখী জটিলতা ও বিপর্যস্ত অবস্থা বাদ দিয়ে ঔপন্যাসিক এ উপন্যাসের জন্য বেছে নিয়েছেন গ্রামীণ পটভূমি ও সমাজ-পরিবেশ। আমাদের দেশের বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন দীর্ঘকাল ধরে অতিবাহিত হচ্ছে নানা অপরিবর্তনশীল তথাকথিত অনাধুনিক বৈশিষ্ট্যকে আশ্রয় করে। এ সমাজ থেকেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ বেছে নিয়েছেন তার উপন্যাসের পটভূমি, বিষয় ও চরিত্র। এ কারণেই ‘লালসালু’ উপন্যাসের পটভূমিতে এসেছে গ্রামীণ সমাজ; সামাজিক রীতি-নীতি, প্রচলিত ধারণা বিশ্বাস; চরিত্রগুলো একদিকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মভীরু, শোষিত, দরিদ্র গ্রামবাসী, অন্যদিকে শঠ, প্রতারক, ধর্মব্যবসায়ী এবং শোষক-ভূস্বামী।
‘লালসালু’ উপন্যাসের বিষয় নির্বাচন, কাহিনি ও ঘটনাবিন্যাস গতানুগতিক নয়। এতে প্রাধান্য নেই প্রেমের ঘটনার, নেই প্রবল প্রতিপক্ষের প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্বসংঘাতের উত্তেজনাকর ঘটনা উপস্থাপনের মাধ্যমে চমক সৃষ্টির চেষ্টা। অথচ মানবজীবনের প্রকৃত রূপ আঁকতে চান তিনি। মানুষের অন্তর্ময় কাহিনি বর্ণনা করাই তার লক্ষ্য। ফলে চরিত্র ও ঘটনার গূঢ় রহস্য, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তাকে দেখাতে হয়েছে যা জীবনকে তার অন্তর্গত শক্তিতে উজ্জীবিত ও উদ্দীপ্ত করে। যে ঘটনা বাইরে ঘটে তার অধিকাংশেরই উৎস মানুষের মনের লোভ, ঈর্ষা, লালসা, বিশ্বাস, ভয়, প্রভুত্ব কামনাসহ নানারূপ প্রবৃত্তি। বাসনাবেগ ও প্রবৃত্তি মানুষের মনে সুপ্ত থাকে বলেই বাইরের বিচিত্র সব ঘটনা ঘটাতে তাকে প্ররোচিত করে। ধর্ম-ব্যবসায়ীকে মানুষ ব্যবসায়ী হিসাবে শনাক্ত করতে না পেরে ভয় পায়। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, তার পেছনে সক্রিয় রয়েছে রহস্যময় অতিলৌকিক কোনো দৈবশক্তি। আবার ধর্ম-ব্যবসায়ী ভণ্ড ব্যক্তি যে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ বোধ করে তা নয়, তার মনেও থাকে সদা ভয়, হয়তো কোনো মানুষ স্বাভাবিক প্রেরণা ও বুদ্ধির মাধ্যমে তার গড়ে তোলা প্রতিপত্তির ভিত্তিটাকে ধসিয়ে দেবে। নরনারীর অবচেতন ও সচেতন মনের নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াই এভাবে লেখকের বিষয় হয়ে উঠেছে ‘লালসালু’ উপন্যাসে।
‘লালসালু’ উপন্যাসটি পড়ার সময় যে দিকগুলো ভালো করে খেয়াল করতে হবে-
‘লালসালু’ একটি সামাজিক উপন্যাস। এ উপন্যাসটি পড়ার সময় এর মধ্যে বিধৃত সমাজকে ভালো করে দেখতে হবে। সমাজে বসবাসরত মানুষের জীবনচেতনা, তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সাধারণ মানুষের প্রতি সমাজের মোড়ল শ্রেণির মানুষের প্রভাব বুঝতে হবে। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মজিদ কেন মহব্বতনগর গ্রামে এসে মাজার আবিষ্কার করে? কেন মজিদের মানুষদের নিজের গ্রাম ছেড়ে দূর-দূরান্তের পথে বের হতে হয়? তারা ধর্মীয় শিক্ষাকে কেন জীবন বাঁচানো হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করে? জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য কেন মজিদ মহব্বরনগরকে বেছে নিয়েছে? মজিদ কেন গ্রামের সাধারণ মানুষের উপর ধর্মীয় বুলি আওড়ায়? মজিদ কেন জোতদার খালেক ব্যাপারীর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে? অথবা খালেক ব্যাপারী কেন মজিদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখে? মজিদ গ্রামের মানুষকে কীভাবে মাজারের প্রতি অনুরক্ত করে? ছন্নছাড়া মজিদ কীভাবে শিকড়গাড়া বৃক্ষে পরিণত হয়? রহিমার মাধ্যমে মজিদ গ্রামবাসীকে কী শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে? কেন গ্রামবাসী মজিদের কথার ওপর কথা বলে না? মজিদ কেন আওয়ালপুরের পীরের আগমনকে সহ্য করতে পারেনি? মজিদ কেন আক্কাসকে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে দেয়নি? মজিদ কেন খালেক ব্যাপারীকে দিয়ে আমেনা বিবিকে তালাক দিয়েছে? মজিদ কেন তাহেরের বাবাকে ভর মজলিমে অপমান করে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে? মজিদের মধ্যে জৈবিক তাড়না কীভাবে কাজ করেছে? মজিদ জমিলাকে বিয়ে করেছে কেন? জমিলাকে অনুগত করার জন্য কেন মজিদ বারবার চেষ্টা করেছে? উপন্যাসে রহিমার চরিত্রে কোন দিকগুলো প্রকাশ পেয়েছে? জমিলা কেন মজিদ ও মাজারের প্রতি অনুগত হয়নি? জমিলা চরিত্রে প্রতিবাদ কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে? এ উপন্যাসে কুসংস্কারাচ্ছন্ন দিকগুলো কোথায় কোথায় রয়েছে? এ উপন্যাসে জীবন বাস্তবতা কোথায় প্রকাশ পেয়েছে? খালেক ব্যাপারী ও মজিদের বহুপত্নীর পরিবারের অশান্তির জায়গাগুলো কোথায় কোথায়? আমেনা বিবিকে তালাক দিতে বললে কেন খালেক ব্যাপারী কোনো প্রতিবাদ করেনি? এ উপন্যাসে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল? কেন এখানকার মানুষ জমির জন্য রক্ত দিতেও ভয় পায় না? মজিদ এ গ্রামের মানুষদের কেন ধর্মান্ধ করে রাখতে চায়? মিথ্যাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করলেও কেন মজিদ নিজের প্রতারণার কথা ভুলে যায় না? ঔপন্যাসিক এ উপন্যাসের মাধ্যমে সমাজে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন? কেন বাংলাদের মানুষগুলো আজও মাজার কিংবা পীরপ্রথায় বিশ্বাস করে? উপন্যাসে মজিদ ও খালেক ব্যাপারীর উদ্দেশ্য ও অবস্থান কেন এক ও অভিন্ন?
