তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার : রাষ্ট্রচিন্তার নতুন দিগন্ত
Advertisement
নুরুল ইসলাম মনি
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিবিসি বাংলার সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অনন্য ঘটনা হিসাবে স্থান পেয়েছে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর তিনি যখন জাতির উদ্দেশে কথা বলেন, তার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বিশ্লেষণ যেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে।
প্রথম পর্ব : যুক্তির স্বচ্ছতায় এক পরিণত নেতা
সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বে তার বক্তব্য ছিল প্রাঞ্জল, সাবলীল এবং সময়োপযোগী। তিনি রাজনীতির আবেগ নয়; যুক্তি, বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে রাষ্ট্রচিন্তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার কথায় ফুটে উঠেছে দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক ভারসাম্যহীনতা এবং জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারের এক সুস্পষ্ট রূপরেখা। তার বক্তব্যে ছিল যেমন স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, তেমনি ছিল কৌশলগত প্রজ্ঞা। তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হিসাবে নয়, বরং জনকল্যাণের একটি দায়িত্ব হিসাবে। এখানেই তিনি অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র।
দ্বিতীয় পর্ব : পরিণত নেতৃত্বের হৃদয়স্পর্শী প্রকাশ
সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব ছিল আরও গোছানো, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত এবং হৃদয়গ্রাহী। জাতি দেখেছে এক পরিণত, নীতিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী বিনয়ী নেতাকে, যিনি আবেগ নয়; রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছেন। তার কথায় ছিল না প্রতিপক্ষের প্রতি বিদ্বেষ বা তীব্র ভাষার ব্যবহার; বরং ছিল রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সংযমের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি দেখিয়েছেন, নেতৃত্ব মানে কেবল বক্তব্য নয়; নেতৃত্ব মানে রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটানো।
রাষ্ট্রদর্শন ও পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন সংজ্ঞা
ভারত ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার মন্তব্যে জাতি দেখেছে একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ককে। তিনি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন ‘বাংলাদেশ সবার আগে’ নীতির গুরুত্ব; যেখানে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। এ অবস্থান প্রমাণ করে, তার কূটনৈতিক দর্শন আবেগনির্ভর নয়, বরং যুক্তিনির্ভর ও জাতীয় মর্যাদাকেন্দ্রিক। তিনি যেমন প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের পক্ষে, তেমনি দেশের সার্বভৌম স্বার্থে কখনো আপস না করার অঙ্গীকারও দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন।
দেশ ও জনগণের জন্য তার ত্যাগ
স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে তারেক রহমান ও তার পরিবার যে ভয়াবহ নির্যাতন, নিপীড়ন ও ত্যাগ সহ্য করেছেন; তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নির্মম অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত থাকবে। তার ওপর স্বৈরাচারের অমানবিক নির্যাতনের চিত্র বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। প্রতিটি মুহূর্তে দেশের মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করে যাওয়া আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বারবার মিথ্যা মামলায় কারাগারে প্রেরণ, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা এবং রাজনৈতিকভাবে নিঃশেষ করার অপচেষ্টা ছিল এ নির্যাতনের কেন্দ্রবিন্দু। তারেক রহমান নিজে অসংখ্য মামলার আসামি হিসাবে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন, যেখানে তাকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়েছে শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে। প্রবাস জীবনে যাওয়ার আাগে তিনি তার স্নেহের একমাত্র ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে বাংলাদেশে রেখে গিয়েছিলেন। কারাগারে নির্মম নির্যাতন আর হাসিনার আক্রমণাত্মক রাজনীতির শিকার হয়ে তাকে বিদেশের মাটিতে জীবন দিতে হয়েছে। এমনকি স্বাধীনতার মহান ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে তাদের উচ্ছেদ করে সবকিছু ধ্বংস করা হয়েছে। তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানকেও মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে, এমনকি তাদের অল্পবয়সি কন্যাকেও সেই রাজনৈতিক প্রতিশোধের আগুন থেকে রেহাই দেওয়া হয়নি। একদিকে যেমন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে মায়ের কারাবাস ও দেশ থেকে বিচ্ছিন্নতার বেদনা-সবকিছু মিলিয়ে এ পরিবারটি দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীন মতের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের এই ত্যাগ প্রমাণ করে, কোনো দমননীতিই ন্যায়ের শক্তিকে দমাতে পারে না, বরং আরও দৃঢ় করে তোলে। সৃষ্টি হয় জনগণের অসীম আস্থা ও ভালোবাসা।
রক্তে লেখা গণতন্ত্রের লড়াই : তারেক রহমানের শ্রদ্ধা ও দৃঢ় অঙ্গীকার
স্বৈরাচার হাসিনার শাসনামলে যারা গুম হয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন বা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন জনাব তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এই ত্যাগ বৃথা যাবে না; বরং তাদের রক্ত ও আত্মদানই বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ভিত্তি হয়ে থাকবে। জুলাই আন্দোলনে আহত ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন, উল্লেখ করেছেন তাদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের ইতিহাস একদিন জাতির গর্বের প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত হবে। তিনি নিজেকে জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড মনে করেন না, বরং তিনি বলেছেন, দেশের জনগণই এ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের একমাত্র মাস্টারমাইন্ড। তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সেই অঙ্গীকার; বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যারা লড়েছেন, তাদের ত্যাগের প্রতি তিনি আজীবন ঋণী এবং সেই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় তিনি অটল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তারেক রহমান : এক সত্যিকার স্টেটসম্যানের প্রতিচ্ছবি
রাজনীতির ঝড়ঝঞ্ঝা, অপপ্রচার ও প্রবাস জীবনের নানা বাধা পেরিয়ে আজ জাতি দেখছে এক সত্যিকার স্টেটসম্যানের আবির্ভাব। তার কথায় আছে গভীর চিন্তা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দেশের প্রতি এক অটল দায়বদ্ধতা। তিনি বুঝেছেন; রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু নীতির প্রশ্ন নয়, এটি একটি নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। এদেশের দুঃখী, বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের যে স্বপ্ন, তার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট তার প্রতিটি বক্তব্যে।
তিনি জাতিকে যা দিতে চান
দীর্ঘ ১৭ বছর নির্যাতনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারেক রহমান ও তার পরিবার সবসময় দেশের মানুষের পাশে থেকেছেন। নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রাজনৈতিকভাবে নিজেকে আরও পরিপক্ব করে তিনি এ জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবে। মানুষকে দক্ষ হিসাবে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে বেকারত্ব দূর করে দারিদ্র্যপীড়িত এ জাতিকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা তার মূল লক্ষ্য। তরুণদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর করে গড়ে তুলে শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে তিনি পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝে ফ্যাসিস্ট হাসিনা যে ঘৃণা ছড়িয়ে দিয়েছে এবং মানুষের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করেছে, তা থেকে এ জাতিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি সবার মাঝে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চান।
আজকের বাংলাদেশের প্রয়োজন
আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন এক নেতৃত্বের আহ্বান জানাচ্ছে; যিনি উদার, জ্ঞানসমৃদ্ধ, বাস্তববাদী এবং গণমানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি। তারেক রহমানের মধ্যে সেই নেতৃত্ব আজ বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে। তার নেতৃত্বের প্রতি জনমানুষের আস্থা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ তিনি কথায় নয়, চিন্তায় ও পরিকল্পনায় তুলে ধরছেন বাংলাদেশের মুক্ত ভবিষ্যতের রূপরেখা।
সর্বোপরি
আজ তাই তারেক রহমানের প্রয়োজন শুধু বিএনপিরই নয়, বরং বাংলাদেশের অনেক বেশি প্রয়োজন। এই জাতি চায় এমন এক নেতৃত্ব, যিনি আবেগ নয়, যুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রকে পরিচালিত করবেন; যিনি প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেবেন; এবং যিনি ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থকে জাতীয় নীতির কেন্দ্রে রাখবেন। স্বৈরাচারের হাজার অত্যাচার এবং নিষ্পেষণ সহ্য করেও তিনি বিদ্বেষপরায়ণ হন নাই, প্রতিহিংসাপরায়ণ হন নাই। তিনি ঘৃণা নয়-ভালোবাসায় আবদ্ধ করতে চান সমগ্র জাতিকে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে যদি নতুন আলোর রেখা দেখা যায়, তবে সেই আলোর উৎস নিঃসন্দেহে জননেতা তারেক রহমান এবং তার রাষ্ট্রচিন্তা ও নেতৃত্বদর্শন।
নুরুল ইসলাম মনি : সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান
