Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নতুন ভোটারদের যে কথাগুলো মনে রাখতে হবে

Advertisement

Icon

ড. এ টি এম জহিরউদ্দিন

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন ভোটারদের যে কথাগুলো মনে রাখতে হবে

Advertisement

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন তথা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংস্কার ছিল সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যে তিনটি নির্বাচন (১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১) কোনোরকম বিতর্ক ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার সবগুলোই হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও শেষবারের মতো এ নির্বাচনেই মোটা দাগে মানুষ নিজের ইচ্ছামতো ভোট দিতে পেরেছিল। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ ও যুবকরা এবারই প্রথম ভোট দেবে।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কয়েকটি মেয়াদ মিলিয়ে প্রায় ১৫ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন এবং দেশের উন্নয়নে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবদান, যেগুলো প্রথমবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাওয়া তরুণদের অবশ্যই জানা উচিত। সেগুলো তুলে ধরাই এ লেখার উদ্দেশ্য।

বিএনপি তার রাজনীতির ইতিহাসে কখনোই জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি বা জনগণের কাছে করা ওয়াদার বরখেলাপ করেনি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীতে তার ক্যারিয়ার এবং নিজের ও পরিবারের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে এদেশের জনগণের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ক্যু এবং পাল্টা ক্যুয়ের প্রেক্ষাপটে কারাবন্দি জিয়াউর রহমানকে সিপাহি-জনতা মুক্ত করে যে সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় বসায়, তখন বাকশাল বাদে সব রাজনৈতিক দল এবং চারটি বাদে সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ ছিল। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েমের বদলে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার কিছুদিন পর তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। আশির দশকজুড়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৮৬ সালে সব দল মিলে এরশাদ সরকারের অধীনে সব নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতও ওই নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ১০টি আসনে জয়লাভ করে।

জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই শত প্রলোভন আর নির্যাতন সত্ত্বেও বিএনপিই শুধু ওই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছিল। ক্ষমতায় থেকেও বিএনপি জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সবসময় শ্রদ্ধা দেখিয়েছে এবং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় যত্নবান থেকেছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালুর বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সর্বদলীয় চুক্তিতে শুধু এরশাদের পদত্যাগ-পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল, যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি সরকার শুরুতে এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে।

১৯৯১ সালের স্মরণকালের সুষ্ঠু নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে এ দাবির পক্ষে জনমত গড়ে ওঠে এবং জনগণের চাওয়াকে সম্মান জানিয়ে বিএনপি সরকার এ দাবি মেনে নেয় এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ করে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। আমাদের দেশের রাজনীতিতে, যেখানে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতা দখল করে রাখাই রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করা হয় এবং ক্ষমতায় থেকে গণদাবি উপেক্ষা করা শক্তির প্রতীক এবং জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপকে কৌশল বলে মনে করা, সেখানে বিএনপির স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া এবং জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা শুধু বিরলই নয়, বরং নজিরবিহীন।

বিএনপির শাসনামলগুলোতেই শিক্ষা, অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের ভিত্তি মজবুত হয়। বর্তমানে যে মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড সোজা রেখেছে, সেই মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার এ দূরদর্শী পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের পালটাপালটি ক্যুয়ের কারণে তখনকার বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেই শুধু গতি আনেনি, বরং চার দশক পরও আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের সূচনাও হয় শহীদ জিয়ার আমলেই। স্বাধীনতার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত জাতীয়করণ নীতির ফলে উৎপাদনশীল খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অদক্ষতা ও দুর্নীতি চরমে পৌঁছায়। এর ফলে শিল্প খাতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ধস নামাসহ গোটা অর্থনীতিতে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ে। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের এই নাজুক অবস্থার অবসান ঘটাতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বেসরকারি খাত উন্মুক্ত করে দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন, যা দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বস্তুত এ সিদ্ধান্তের ফলেই জিয়াউর রহমানের শাসনামলের শেষদিকে দেশে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ ঘটে, যা এখন দেশের রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থান, বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন, যা দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলের মতো বেগম খালেদা জিয়াও তার দুটি (১৯৯৬ সালের স্বল্পমেয়াদের শাসনামল বাদ দিয়ে) শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনের জন্য বহুমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন। তার আমলেই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালু করেন। বর্তমান সময়েও ভ্যাট সরকারি আয়ের প্রধান খাত হিসাবে বিদ্যমান আছে।

শহীদ জিয়ার বেসরকারিকরণের উদ্যোগ বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে আরও বিস্তৃত হয়, যার ফলে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসারের পাশাপাশি হিমায়িত মৎস্য শিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ রপ্তানিমুখী ও স্থানীয় বাজারের জন্য বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পের প্রসার ঘটে। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের ৩০ শতাংশ অবদানের বিপরীতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২১ শতাংশ।

বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে গৃহীত এ পদক্ষেপগুলোর কারণে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান (২৭ শতাংশ) কৃষি খাতের অবদানকে (২০ শতাংশ) ছাড়িয়ে যায়। বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে মেয়েদের জন্য উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত পড়াশোনা অবৈতনিক করা হয়। এ পদক্ষেপ নারী শিক্ষা এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে, যার ফলে আনুষ্ঠানিক খাতে প্রান্তিক পরিবারগুলো থেকে লাখ লাখ নারীর কর্মসংস্থান হয়।

অতীত শাসনামলগুলোর ধারাবাহিকতায় আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে কল্যাণমুখী কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ৫ আগস্টের পরপরই ৩১ দফা ঘোষণা করে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে তারা কী কী সংস্কার করবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়াও বিএনপি নির্বাচিত হতে পারলে দেশের শিক্ষা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট এবং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

বিএনপি অবশ্যই কোনো ত্রুটিহীন দল নয়। অতীতে সরকার পরিচালনায়, বিরোধী দলে থাকাকালীন এবং ২০২৪-এর ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তাদের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে যেহেতু বিদ্যমান বিকল্পগুলো থেকে একটি দলকে বেছে নিতে হবে, সেহেতু রাজনৈতিক ইতিহাস, সরকার পরিচালনায় অতীত সাফল্য এবং আগামী দিনে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার আলোকে এবং ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বজনীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে বিএনপির কোনো বিকল্প নেই।

ড. এটিএম জহিরউদ্দিন : অধ্যাপক, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম