পুলিশব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পথরেখা
Advertisement
ড. মো. রুহুল আমিন সরকার
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পুলিশের নেতৃত্ব, কৌশলগত প্রস্তুতি এবং জনসম্পৃক্ততার ঘাটতি নিয়ে সমাজে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা এবং জনআস্থার প্রশ্ন-এ তিনটি বিষয় আজ গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে : মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা, মনোবল ও পেশাগত সক্ষমতা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির আলোকে দেখা যায়, পুলিশের নেতৃত্ব, কৌশলগত প্রস্তুতি এবং জনসম্পৃক্ততার ঘাটতি নিয়ে সমাজে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আবেগ নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, ইতিহাস এবং প্রশাসনিক যুক্তির আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
৫ আগস্টের আগে ও আশপাশের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে একাধিক বাহিনী মাঠে ছিল। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কিছু পেশাদার ও তুলনামূলক অধিক প্রশিক্ষিত বাহিনী মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত সতর্ক ও বাস্তবভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করে। তারা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে দ্রুত। জনমনের তাপমাত্রা বোঝার চেষ্টা করেছে। সংঘর্ষ এড়াতে নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী কমান্ড সমন্বয় করেছে। ফলে উত্তেজনা থাকলেও তাদের সদস্যদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি-এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক শিক্ষা হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে পুলিশের ক্ষেত্রে বহু জায়গায় ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে বলে জনপরিসরে আলোচনা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কর্মরত কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর কিংবা ইন্সপেক্টররা প্রায়ই ঊর্ধ্বতন নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন। তারা নীতিনির্ধারক নন; তারা কার্যকরী বাহু। কিন্তু যখন কৌশলগত সমন্বয় দুর্বল হয়, যখন বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে নির্দেশনার সামঞ্জস্য থাকে না, তখন ঝুঁকি বেড়ে যায় সামনের সারির সদস্যদের জন্যই। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, সময়োপযোগী নির্দেশনার ঘাটতি, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ধারণা, অথবা পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিলম্ব-এসব কারণে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। এ ধরনের সমালোচনা সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের বিষয় হলেও জনআস্থার সংকট যে তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।
পুলিশ যে সমাজেরই অংশ, সেটি বারবার মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। একজন কনস্টেবলও এ দেশের নাগরিকের সন্তান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কোথাও ভয়ের, কোথাও অবিশ্বাসের, কোথাও ক্ষোভের। এ মানসিক দূরত্ব কমানো না গেলে শুধু শক্তি বা প্রযুক্তি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। আধুনিক পুলিশিংয়ের মূল দর্শনই হলো, ‘policing by consent’ বা জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে আইনপ্রয়োগ।
ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থির সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারিকরণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। তার সময়ে মূল লক্ষ্য ছিল-রাষ্ট্রের ভেতরে সক্রিয় সশস্ত্রগোষ্ঠী, চরমপন্থি তৎপরতা এবং সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। সে সময় দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের তৎপরতা রাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রেক্ষাপটে পুলিশের বিশেষায়িত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষায়িত ইউনিট গঠন, গোয়েন্দা সক্ষমতা উন্নয়ন, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ফোর্স তৈরি-এসব ধারণা তখন গুরুত্ব পেতে শুরু করে। পরবর্তীকালে যে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটগুলোর বিকাশ ঘটেছে, সেগুলোর বীজ রোপিত হয় সেই সময়কার সংস্কারচিন্তায়। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার : কেবল সাধারণ থানা পুলিশকে সব ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়ে না ফেলে বিশেষ দক্ষ ইউনিট তৈরি করা।
তৎকালীন অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল বহু স্তরীয়। শুধু অভিযান নয়, তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় এবং প্রয়োজনে রাজনৈতিক পুনর্বাসন-এসব উপাদানও ব্যবহৃত হয়। এতে একদিকে কঠোরতা, অন্যদিকে পুনর্মিলনের বার্তা-দুটিই ছিল। ফলে অনেক এলাকায় সহিংসতা ধীরে ধীরে কমে আসে। এ অভিজ্ঞতা আজও প্রাসঙ্গিক-শুধু শক্তিপ্রয়োগ নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করতে হয়।
বর্তমান বাস্তবতায় ফিরে এলে দেখা যায়, পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জনগণের আস্থা পুনর্গঠন। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমে গেলে পুলিশ কার্যত একা হয়ে পড়ে। তথ্য পায় না। সহযোগিতা পায় না। মাঠে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে ছোট সংকটও বড় হয়ে ওঠে। তাই পুনর্গঠনের আলোচনায় প্রথমেই আসতে হবে জনমুখী পুলিশিং।
প্রথমত, নেতৃত্বের জবাবদিহি জোরদার করা জরুরি। মাঠপর্যায়ে কোনো অপারেশন ব্যর্থ হলে শুধু নিুপদস্থ সদস্যদের দিকে আঙুল না তুলে কৌশলগত সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন করতে হবে। অপারেশন-পরবর্তী স্বাধীন রিভিউ বোর্ড গঠন করা যেতে পারে, যেখানে পেশাদার মূল্যায়ন হবে-কী ঠিক ছিল, কী ভুল ছিল, কী শেখা দরকার। দ্বিতীয়ত, বাস্তব-সময়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অনেক উন্নত দেশে দেখা যায়, মাঠের কমান্ডারদের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এতে পরিস্থিতি অনুযায়ী নমনীয়তা থাকে। বাংলাদেশেও প্রশিক্ষণ ও নীতিমালার মাধ্যমে এ ক্ষমতায়ন ধীরে ধীরে বাড়ানো যেতে পারে। তৃতীয়ত, কমিউনিটি পুলিশিংকে কাগজ থেকে বাস্তবে নামাতে হবে। থানাভিত্তিক জনসংযোগ ফোরাম, নিয়মিত ওপেন হাউজ, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও তরুণদের সঙ্গে সংলাপ-এসবকে আনুষ্ঠানিকতা নয়, কার্যকর প্রক্রিয়া বানাতে হবে। পুলিশ যদি এলাকায় পরিচিত মুখ হয়, সংকটের সময় উত্তেজনা অনেক কমে। চতুর্থত, পেশাগত আচরণ ও মানবাধিকার প্রশিক্ষণ জোরদার করা জরুরি। আধুনিক ভিড় নিয়ন্ত্রণ, উত্তেজনা প্রশমন (de-escalation), আলোচনাভিত্তিক হস্তক্ষেপ-এসব দক্ষতা বাড়াতে হবে। শুধু অস্ত্র বা শক্তি নয়, পরিস্থিতি শান্ত করার কৌশলই অনেক সময় সবচেয়ে কার্যকর হয়। পঞ্চমত, কল্যাণ ও মনোবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ডিউটি, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ, পারিবারিক চাপ-এসব পুলিশ সদস্যদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে। কাউন্সেলিং, পর্যাপ্ত ছুটি, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা হলে বাহিনীর ভেতরের স্থিতি বাড়ে। ষষ্ঠত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, তবে মানবিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে। বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা, ডিজিটাল ডিউটি লগ, স্মার্ট কমান্ড সেন্টার-এসব স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে এবং ভুল বোঝাবুঝি কমাতে পারে। সপ্তমত, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার সংস্কৃতি শক্তিশালী করা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে তারা কতটা নিরপেক্ষ বলে মনে হয় তার ওপর। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, বদলি-পদায়ন নীতি এবং পেশাগত মানদণ্ড এ নিরপেক্ষতা রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অষ্টমত, গণমাধ্যম ও জনযোগাযোগ কৌশল উন্নত করা দরকার। সংকটকালে দ্রুত, স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক ব্রিফিং দিলে গুজব কমে এবং উত্তেজনা প্রশমিত হয়।
সবশেষে বলা যায়, পুলিশ সংস্কার কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ইতিহাস থেকে শিক্ষা, বর্তমানের বাস্তব মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের পেশাদার মানদণ্ড-এই তিনকে একসঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে। যে বাহিনী জনগণের আস্থা পায়, সেই বাহিনীই সবচেয়ে শক্তিশালী। আর যে রাষ্ট্র তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাখতে পারে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন প্রয়োজন দোষারোপের ভাষা কমিয়ে শেখার ভাষা বাড়ানো। মাঠে যারা জীবন ঝুঁকিতে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইসঙ্গে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা পুলিশেরও দায়িত্ব। এ দুইয়ের মিলনেই একটি কার্যকর, মানবিক ও আধুনিক পুলিশব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
ড. মো. রুহুল আমিন সরকার : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা
