অসৎ আমলাদের মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ
Advertisement
খায়রুল কবির খোকন
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
খায়রুল কবির খোকন। ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯৭৭ সালের ঘটনা। দৈনিক ইত্তেফাকের একজন পরিশ্রমী স্টাফ রিপোর্টার গেছেন প্রবীণ রাজনীতিক আতাউর রহমান খানের ধানমন্ডির বাসায়, বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে। ওই রিপোর্টারের হাতে সময় ছিল না। তার সম্পাদকের নির্দেশ-‘যাও, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন ও কর্মের সারসংক্ষেপ তৈরি করে রাখো; যাতে কোনো প্রবীণ ব্যক্তিত্ব গভীর রাতে হঠাৎ চির-ঘুমে চলে গেলে তোমার ‘অবিচুয়ারি রিপোর্ট’ তৈরিতে ঝামেলা পোহাতে না হয়। যত বেশি বয়সের নেতা, তত গুরুত্বের সঙ্গে তাদের জীবন ও কর্ম তৈরি করে রাখো।’ রিপোর্টার তখন সৌজন্যবোধ মাথায় তুলে রেখে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে পড়িমড়ি কাজ করলেন। প্রবীণ রাজনীতিক আতাউর রহমান খান অতি সজ্জন ব্যক্তিত্ব। ওই প্রতিবেদকের মতো তরুণকে পেলে নিশ্চয়ই বেজায় খুশি হতেন, হয়তো নিজের তারুণ্যের দিনগুলোতে ফিরে বিশেষ আনন্দ লাভ করতেন।
আমার বড় ভাইয়ের (প্রয়াত) ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওই রিপোর্টারের কাছে জেনেছি ঘটনাটি। একজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ (পরে জাতীয় নেতা হয়েছিলেন) প্রবীণ জননেতা আতাউর রহমানকে অনুরোধ করেছিলেন-‘ভাই, আমলাদের সব কথা শুনবেন না। ওদেরকে দিয়ে কাজ করাতে হবে, সেটা তো অপরিহার্য ব্যাপার; কিন্তু তাদের পরামর্শ একদম শুনবেন না। কারণ ওরা রাজনীতিকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালান সব সময়’ (সম্ভবত ঘটনাটি আতাউর রহমান খানের প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সময়কার)। জনাব খান ওই রিপোর্টারকে বলেছিলেন এবং আফসোস করেছিলেন-‘আমরা কেউই হয়তো সেই অভিমত সমর্থন করে সিদ্ধান্ত নেইনি, এমনকি যিনি আমাকে এ পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি নিজেও তা অনুসরণ করতে পারেননি।’ আমলাতন্ত্র নিয়ে প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও বেশ সতর্ক থাকার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু তার মতো একজন শতভাগ সৎ অর্থমন্ত্রীকেও আমলারা এবং ‘নেতার-ভাগনে’ শেখ ফজলুল হক মণিসহ কিছু বিভ্রান্ত-নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতিক প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে দিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে জবরদস্তি বের করে দিয়েছিলেন।
আমাদের রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান আমলাতন্ত্রকে ‘কাট-টু-সাইজ’ করতে সফল হয়েছিলেন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও এসব আমলাগোষ্ঠীর অপতৎপরতা ফেস করার জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন, কতটা সফল হয়েছিলেন বলা মুশকিল। এর আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, ক্ষমতায় নির্ভয়ে কাটানোর জন্যে সেটা তার জন্য জরুরি ছিল।
বিএনপির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে জিতে প্রমাণ করেছেন-তিনি রাজনীতি বোঝেন, তিনি শত্রু-মিত্র চিনতে পারেন, তাদের ফেস করতে পারেন। তিনি ৫১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার নিয়ে ধারাবাহিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। পিতা সাবেক রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে দ্রুততায় এগোচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ২৮ দিনে ২৮টি কর্মসূচি তিনি শুরু করে দিয়েছেন। ছুটির দিনেও অফিস করেন, যা আমলা ও মন্ত্রীদের জন্য শিক্ষণীয়। এসব উদ্যোগ তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়ার কর্মকাণ্ডের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
কিন্তু আমরা সবাই জানি, সেই ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী রাজত্বে যখন আমলাদের তৈরি করা হয়েছিল, তখনি তাদের দেশপ্রেমহীন, ব্রিটিশ আধিপত্যবাদীদের দালাল, সুবিধাভোগী, দুর্নীতিপরায়ণ, অদক্ষ হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের সেটাই কাজ ছিল-তা শতভাগ সত্য। এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। মান্দার গাছে তো আম ফলবে না কখনো। আমাদের রাষ্ট্রের ‘আমলাতন্ত্র আর গণমানুষ কখনো এক সাথে খাবে না’। গণসংগীতের অন্যতম সম্রাট বলে খ্যাত মহান শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সেই বিখ্যাত গান-‘থাকিলে ডোবাখানা হবে কচুরিপানা, বাঘে-হরিণে খানা একসাথে খাবে না, ও মরি, স্বভাব তো কখনো যাবে না...’ আমাদের তা স্মরণ করতেই হয়।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছে গণমানুষের অর্থনৈতিক শোষণমুক্তির কর্মসূচিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু বাধা দেবে ও দিচ্ছে সেই আমলাতন্ত্র। এখন উপায়টা কী? আমাদের দেশের আমলাদের প্রায় নব্বই ভাগ বা তারও বেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষার্থী হিসাবে সুপরিচিত (ছিলেন বা আছেন)। কিন্তু ব্রিটিশ রাজের যে উপনিবেশবাদী লক্ষ্যার্জনের ভাবনা থেকে এ আমলাতন্ত্র সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা থেকে এরা কখনো বেরোতে চান না। তারা পাকিস্তানি নয়া উপনিবেশবাদী আমলেও নিজেদের পরিশোধন করতে চাননি, পরেও চাচ্ছেন না। তারা গাছের আগারটা-তলারটা সবটাই খেতে অভ্যস্ত। তারা নিজ দায়িত্বের প্রতিদিনকার কাজ করেন স্বল্পমাত্রায়, ঘুস খান বেশি মাত্রায় (যতটা গিলতে পারেন গলা দিয়ে), রাষ্ট্রের সব বৈধ-অবৈধ সুবিধা ভোগ করেন গোগ্রাসে। এতটুকু মানবিকতা, দেশপ্রেম, রাষ্ট্রপ্রেম তাদের থাকে না-দেশবাসীর কষ্ট-বেদনা, অসহায় মর্মবেদনার জীবন, অবিরাম আহাজারির দিনকাল, তাদের চোখের জল-কখনো এ আমলাগোষ্ঠীর হৃদয় স্পর্শ করে না।
এখন এ আমলাদের দিয়েই সরকারের দৈনন্দিন ফাইলওয়ার্ক চালাতে হবে; রাজনৈতিক সরকারের নেতারা স্বাভাবিক ধর্ম হিসাবেই সরকার পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত দেবেন, গাইডলাইন দেবেন, প্রয়োজনীয় আইনকানুন তৈরি করে দেবেন; কিন্তু প্রতিদিনকার ফাইল-কাজকর্ম তো আমলাদের দিয়েই করতে হবে-এটা এক কঠিন সত্য। আমলাদের কর্মতৎপরতা কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে-সেটা ভয়ানক অপ্রিয় কাজ। কিন্তু সেই অপ্রিয় কাজটি সরকারের নেতাদের করতেই হবে, কোনো অন্যথা চলবে না। এ কাজে অসফল হলে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার, সেটি ৫১ দফাই হোক বা বেশি-কম যা-ই হোক, সেসব বাস্তবায়ন একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বিএনপির একজন সামান্য সংগঠক ও কর্মী এবং সংসদ-সদস্য হিসাবে আমার বিনীত পরামর্শ রয়েছে আমাদের শীর্ষ নেতাদের প্রতি-আমাদের দেশে সড়কে দুর্ঘটনা মারাত্মক পর্যায়ে; যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণসহ অগ্নি-দুর্ঘটনা ঘটছে, দেশব্যাপী নারী নির্যাতন বাড়ছে পাল্লা দিয়ে, পুকুরে-জলাশয়ে ডুবে শিশুমৃত্যু ভয়ানকভাবে বেড়ে গেছে। ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন অসুখ বেড়ে যাচ্ছে; কিন্তু এডিস মশার প্রজনন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ প্রায় শূন্য পর্যায়ে। এসবের দিকে দ্রুত নজর দিতে হবে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে-এসব অনাচার-অপঘাতের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যথেষ্ট তৎপর, এমন প্রমাণ মিলে না। এসব বিষয়ে বিনীতভাবে আমাদের সরকারের শীর্ষনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সরকার আমলাদের ব্যাপারে কঠোর হলে তারা ক্ষিপ্ত হবেন-এটি খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু তাদের বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। শাস্তি পেতেই হবে।
খায়রুল কবির খোকন : সংসদ-সদস্য, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক
