Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

ভারত কি পারবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন রাষ্ট্র গঠন ঠেকাতে

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভারত কি পারবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন রাষ্ট্র গঠন ঠেকাতে

Advertisement

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতে কয়েকজন সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিক গ্রেফতার হওয়ার পর সে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। গ্রেফতারকৃত এ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা সাতজন। তারা সবাই ইউরোপীয় বলে জানা গেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ গঠনে তারা জড়িত থাকতে পারে বলে ভারত অনুমান করছে। এসব ব্যক্তি পৃথক রাষ্ট্র গঠনে ছক আঁকছিলেন নাকি আরও গভীর কোনো ষড়যন্ত্র ছিল; তা খতিয়ে দেখছে ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা এনআইএ। গ্রেফতারদের মধ্যে ম্যাথু ভ্যানডাইক, যাকে মার্কিন ভাড়াটে সেনা সদস্য বলে চিহ্নিত করেছে এনআইএ। এযাবৎ যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তাতে জানা যায়, এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভারত হয়ে চোরাই পথে মিয়ানমারে প্রবেশ করে সেখানকার সশস্ত্র বিদ্রোহীদের ড্রোন প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করার অভিযোগ আছে। ম্যাথু ভ্যানডাইক তার ইউক্রেনীয় সঙ্গীদের নিয়ে পর্যটন ভিসায় ভারতে প্রবেশ করেন এবং ভারত সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই বিমানে আসামের গুয়াহাটিতে পৌঁছান। সেখান থেকে মিজোরাম হয়ে চোরাই পথে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে চলে যান। মিয়ানমারে তারা বেশ কিছুদিন অবস্থান করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সদস্যদের অস্ত্র প্রশিক্ষণসহ নানাবিধ টেকনিক্যাল যন্ত্রপাতি পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেন।

ভ্যানডাইক গ্রেফতার হওয়ার পর ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থার অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তার এমনও অনেক কুকীর্তি আছে যা ভারতীয়দের ভাবিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। ভ্যানডাইক ২০১১ সালে প্রথমবার খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন। লিবিয়ায় তখন গৃহযুদ্ধ চলছে। সে সময় লিবিয়ার বিদ্রোহী সংগঠনের সঙ্গে যোগ দিয়ে তিনি ত্রিপলিতে সরকারের হাতে ধরা পড়েছিলেন। মোয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ভ্যানডাইক মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ‘সন অব লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। তাদের এ সংগঠনের মূল কাজই হলো, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দেশবিরোধী সংগঠনের সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া। সিরিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধেও ভ্যানডাইক জড়িত ছিলেন। রুশ গোয়েন্দারা এ ব্যক্তির গতিবিধির ওপর দীর্ঘদিন নজর রাখছিলেন। মার্চের গোড়ার দিকে ভ্যানডাইক ভারতে পৌঁছানোর পরপরই ভারতকে খবর পৌঁছে দেয় মস্কো। ১৩ মার্চ কলকাতা থেকে ভ্যানডাইককে গ্রেফতার করা হয়। ভ্যানডাইককে গ্রেফতার করার খুব দ্রুততম সময়ের ব্যবধানে উত্তরপ্রদেশের লখনৌ থেকে তিনজন এবং দিল্লির বিমানবন্দর থেকে বাকি তিনজন গ্রেফতার হন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী নাগরিককে নিয়ে ভারত অস্বস্তিতে ভুগছে। ভারতীয় অনেক থিংকট্যাংক দাবি করছে, ওই অঞ্চলে পশ্চিমারা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একটি ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ গড়ে তুলতে চাইছে। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই নাকি তারা ভ্যানডাইকের নেতৃত্বে এ লাইনে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পাঠিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে তারা যেভাবে খ্রিষ্ট্রান রাষ্ট্র ‘ইস্ট তিমুর’ প্রতিষ্ঠা করেছিল; ঠিক সেই আদলেই তারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি খ্রিষ্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এসব উসকানি দিচ্ছে বলে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন। গত কয়েক দশক ধরে অতিমাত্রায় চীনের আর্থিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পশ্চিমাদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের এ অগ্রগতি কিছুতেই যেন ঠেকানো যাচ্ছে না। পশ্চিমা হিসাব কষে দেখেছে; চীনের নাকের ডগায় যদি একটি দুর্বল প্রকৃতির খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গঠন করা যায়, তাহলে এ রাষ্ট্র বরাবরই তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। ইউক্রেনকে ব্যবহার করে পশ্চিমারা যেমন রাশিয়ার খুব কাছে তাদের সামরিক শক্তি পৌঁছানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে, এ অঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে ঠিক একই কায়দায় তারা তাদের সামরিক শক্তি চীনের সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে। মূলত এ কারণেই ওই অঞ্চলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে পুঁজি করার চেষ্টা করছে পশ্চিমারা।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এলাকা। এ রাজ্যগুলোর সর্বমোট আয়তন ২ লাখ ৬২ হাজার ১৮৪ বর্গকিলোমিটার যা ভারতের মোট ভূমির প্রায় ১৩ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এ অঞ্চলের রাজ্যগুলোর রয়েছে বিশাল আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকা, যার পরিমাণ ৫ হাজার ১৮২ কিলোমিটার। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চাও আলাদা। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি রাজ্যে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা অধিক হারে বেড়েছে। ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ হলেও এ রাজ্যগুলোতে হিন্দুরাই সংখ্যালঘু হিসাবে বসবাস করছে। যেমন, নাগাল্যান্ডে প্রায় ৮৮ শতাংশ খ্রিষ্টান হলেও হিন্দুদের সংখ্যা মাত্র ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। মিজোরামে হিন্দু জনসংখ্যা ২ দশমিক ৭ শতাংশ, অথচ ৮৭ শতাংশ মানুষ সেখানে খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী। মেঘালয়ে ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ মানুষ হিন্দু। এ রাজ্যে ৭৫ শতাংশ খ্রিষ্টান। অপরদিকে অগ্নিগর্ভ মণিপুরে ৪১ শতাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী মানুষ বসবাস করেন। এ অঞ্চলের মানুষের খ্রিষ্টান হয়ে ওঠার আলাদা ইতিহাস আছে। উনিশ শতকেও ওই অঞ্চলের মানুষেরা হিন্দু রীতি অনুসরণ করে পূজা-অর্চনা করত। কিন্তু ১৮২৪-২৬ সালে প্রথম ইন্দো-বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) যুদ্ধের পর ইয়ানদাবো চুক্তির মাধ্যমে নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম দখল করে নেয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ওই আমলেই নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের মতো রাজ্যগুলোতে খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের আগমন ঘটে। কুড়ি শতক আসার আগেই সেখানকার অধিকাংশ মানুষের ভেতর হিন্দু ধর্মাচার অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩৭ সালে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বার্মাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় ব্রিটিশ সরকার। ফলে নাগা, কুকি ও মিজোর মতো উপজাতি সম্প্রদায়গুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

পশ্চিমা ধর্মযাজকদের প্রচেষ্টায় এভাবেই ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় খ্রিষ্ট ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল। ভারতের স্বাধীনতার পরও সেই ধারা অব্যাহত থাকে। ওই অঞ্চলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী হলো, মণিপুরের কুকি, মিজোরামের মিজো এবং মিয়ানমারের চিন। এ জনগোষ্ঠীর সবাই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। সম্মিলিতভাবে তারা নিজেদের ‘জো’ জনগোষ্ঠী হিসাবে দাবি করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ ছাড়া নাগাল্যান্ডের বিরাট জনগোষ্ঠীও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। ভারতকে স্বাধীনতা দিলেও এ এলাকায় একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি রাখতে চেয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। সেই চিন্তা থেকেই ভারত ত্যাগের আগে এ অঞ্চলের উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য জেলাগুলোকে নিয়ে একটি পৃথক ‘ক্রাউন কলোনি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হতে পারেনি।

ভারতের নিরাপত্তাবিষয়ক থিংকট্যাংকের অনেকেই মনে করেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একাধিক রাজ্যে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সেখানের সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা পশ্চিমাদের পক্ষে অনেকটাই সহজ হবে। এ রাষ্ট্র গঠনের শুধু ভারতই নয়, মিয়ানমারের একাংশ এবং বাংলাদেশের বান্দরবানের কুকি অধ্যুষিত কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। পশ্চিমা দেশের গোয়েন্দারা এ ব্যাপারে বেশ সক্রিয় বলেও অনুমান করা হচ্ছে। ভ্যানডাইক ও তার দল গ্রেফতার হওয়ার পর এ আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ভ্যানডাইককে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের ‘পোস্টার বয়’ নামে আখ্যায়িত করেছে। তাদের মতে, ভ্যানডাইক ভারতকে অস্থিতিশীল করে তোলার উদ্দেশ্যেই পশ্চিমাদের ইশারায় কাজ করে যাচ্ছিলেন। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ১৯৯৫ সালের আলোড়নকারী ‘পুরুলিয়া অস্ত্র বর্ষণ’ ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সেবার আকাশপথে অস্ত্র এসেছিল, আর এবারের ষড়যন্ত্র ছিল স্থলপথে আনার। এ কারণেই ভ্যানডাইক ও তার সঙ্গীদের গ্রেফতারের ঘটনাকে ভারত মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছে না। তারা মনে করছেন, ভারতের সীমান্ত বরাবর মিয়ানমারের দুর্বল অংশ থেকেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ধাক্কা আসার আশঙ্কাই বেশি। এসব বিবেচনা করে ভারত সরকার এখন মিয়ানমারের সঙ্গে খোলা সীমান্ত বন্ধের চিন্তা-ভাবনা করছে। সে মোতাবেক ৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু তাতে বাধা এসেছে ওই অঞ্চলের খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী রাজ্যগুলো থেকেই। ২৮ ফেব্রুয়ারি মিজোরামের বিধানসভায় মিয়ানমারের সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার বিরোধিতা করা ছাড়াও দুই দেশের অবাধ যাতায়াত বন্ধের সিদ্ধান্তের নিন্দা প্রস্তাব গৃহীতও হয়েছে। প্রস্তাব পেশ করেই মিজোরামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে. সাপডাঙ্গা বলেছেন, ‘জো সম্প্রদায় আজ বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিভাজিত। কিন্তু তারা শতকের পর শতক মিজোরাম ও মিয়ানমারের চিন পর্বতমালার বাসিন্দা। এক সময় তাদের নিজেদের প্রশাসন ছিল। যুগে যুগে শাসক গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া এই বিভাজন মেনে নেওয়া আর সম্ভব নয়।’ বক্তব্য শেষ করার আগে তিনি বলেন, ‘তারা (জো জনগোষ্ঠী) একদিন একটি প্রশাসনিক ইউনিটের অধীনে পুনর্মিলনের স্বপ্ন দেখছে।’ সন্দেহ নেই, তার এ বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে, একদিকে পশ্চিমাদের লোলুপ দৃষ্টি, অপরদিকে আঞ্চলিক চাপসহ সব দিক সামাল দিয়ে ভারত কি পারবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন রাষ্ট্র গঠন ঠেকাতে?

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং কলাম লেখক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা : এখন কূটনৈতিক বাস্তবায়নের পালা

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা : এখন কূটনৈতিক বাস্তবায়নের পালা

চাকরির আবেদনের সময়সীমা বাড়ানো কতটা জরুরি

চাকরির আবেদনের সময়সীমা বাড়ানো কতটা জরুরি

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম