Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না

Icon

ড. বদিউল আলম মজুমদার

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না

ড. বদিউল আলম মজুমদার। ছবি: সংগৃহীত

আমাদের যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হলো, এই গণ-অভ্যুত্থানে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে এবং গণ-আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সংস্কার তথা রাষ্ট্র মেরামত। এর পাশাপাশি অবশ্যই নির্বাচন ও বিচার-এই দুটোও ছিল। সংস্কার, রাষ্ট্র মেরামত এবং কতগুলো মৌলিক সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে ছয়টি কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন অন্যতম। এরপর আরও পাঁচটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে।

প্রথম ছয়টি সংস্কার কমিশন যখন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিপোর্ট পেশ করে, তখন সরকার ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে প্রথম ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রধানদের নিয়ে এ ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। ঐকমত্য কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর, যেগুলোর মাধ্যমে আমাদের ওপর চেপে বসা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ প্রশস্ত হয়।

আমরা ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রধানরা প্রথমে কমিশনগুলোর দেওয়া সহস্রাধিক প্রস্তাব থেকে ১৬৬টি গ্রহণ করি। এ প্রস্তাবগুলো নিয়ে একটি স্প্রেডশিট তৈরি করে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রেরণ করি। তাদের কাছে জানতে চাই কোনগুলো সম্পর্কে তারা একমত, কোনগুলো সম্পর্কে দ্বিমত বা আংশিকভাবে একমত এবং একই সঙ্গে কীভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এটা ছিল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপে আমরা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এককভাবে বসেছি। বিএনপির সঙ্গে তিন দিন, জামায়াতের সঙ্গে দুই দিন, তরুণদের এনসিপির সঙ্গে দুই দিন-এভাবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্তত একদিন আলাপ করেছি। আলাপ করে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি এবং এ আলোচনার মাধ্যমে আরও অনেক বিষয়ে ঐকমত্য সৃষ্টি হয়।

তৃতীয় ধাপে আমরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একত্রে বসেছি, যা বিটিভিতে প্রচার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ আট মাসের মতো আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এবং পর্দার অন্তরালে আলাপ-আলোচনা করে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাই। ঐকমত্য হওয়া ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ৩৬টি নোটিফিকেশন, অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বাকি ৪৮টির জন্য সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এই ৪৮টি বিষয় নিয়েই জুলাই গণভোট হয়। এই ৮৪টি বিষয়ের ঐকমত্যই হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এ সনদ বাস্তবায়নের জন্য একমত হওয়া প্রতিটি রাজনৈতিক দল এতে স্বাক্ষর করেছে এবং বলেছে, তারা পরিপূর্ণভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। পাশাপাশি তারা এই জুলাই জাতীয় সনদকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাবে না।

এরপর সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ওই ৪৮টি বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন। এ আদেশের ভিত্তিতে ৪৮টি বিষয়ে গণভোট হয় এবং সেখানে প্রশ্ন ছিল, তারা এ বিষয়গুলোতে একমত কি না। আমরা দেখেছি, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এই সংস্কারগুলোর পক্ষে জনরায় দিয়েছে। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতির ওই আদেশে একটি বিধান ছিল যে, যারা নির্বাচিত হবে, ভোটের পর তারা দুটি ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের জন্য সংসদ-সদস্য হবে, আবার ১৮০ কর্মদিবসের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবেও ভূমিকা পালন করবে, যার মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার করা সম্ভব হবে।

তবে নির্বাচনের পর সবাই সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি, যা জনগণ যে বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচনের পর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা শুরু হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করতে পারেন না এবং এটি বৈধ নয়। পাশাপাশি তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে তাদের যে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা দ্বিমত ছিল, সেগুলো গণভোটে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

তাদের এসব যুক্তি অসার। প্রথমত, যেহেতু জনগণ গণভোটে এই প্রক্রিয়ার পক্ষে মত দিয়েছে, তাই শপথ নেওয়া তাদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং জনগণের মতামতই হলো সর্বোচ্চ আইন। তাই তারা জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেনি। দ্বিতীয়ত, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করতে পারেন এবং যেহেতু জনগণ গণভোটের মাধ্যমে এটি অনুমোদন করেছে, তাই এটিও জনগণের রায়ে পরিণত হয়েছে। এ কারণে বিএনপির যুক্তিগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে তারা যুক্তি দিচ্ছে যে, তাদের নোট অব ডিসেন্ট গণভোটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আদতে নোট অব ডিসেন্ট হলো সংখ্যালঘু মতামত (Minority View)। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মেজরিটারিয়ান বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেহেতু ৮৪টি বিষয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে, তাই সংখ্যালঘু মতামত গণভোটে যাওয়ার দাবি অগ্রহণযোগ্য।

বিএনপি আগে এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলেনি, নির্বাচনের পর তারা প্রশ্ন তোলা শুরু করেছে এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে টালবাহানা করছে। পাশাপাশি গত অন্তর্বর্তী সরকার যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তার মধ্যে ২০টি তারা অনুমোদন করেনি। এর মধ্যে ৪টি পুরোপুরি রহিত করেছে আর ১৬টি বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে উত্থাপনই করেনি। কিন্তু এগুলোই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, মানবাধিকার নিশ্চিত করত এবং গুম কমিশন গঠনের নিশ্চয়তা দিত। তারা বলছে, এগুলো পরবর্তী সময়ে উত্থাপন করবে; কিন্তু কবে এবং কী রকম পরিবর্তন করবে, তা নিশ্চিত নয়। গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ব্যাপারে তাদের এই অনীহা ও সংস্কারের টালবাহানা একটি অশনিসংকেত। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনের সীমাবদ্ধতাই শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারে পরিণত করেছিল। এগুলো অব্যাহত থাকলে পরবর্তী সরকারেরও স্বৈরাচারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যদি সরকার মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার না করে এবং স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিতকারী অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন না করে, তবে পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার এবং স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের আশঙ্কা থেকে যায়। পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না; বরং তারা উলটোদিকে হাঁটছে। বহু মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি। মৌলিক সংস্কারে ব্যর্থ হলে আমরা স্বৈরাচারের ফিরে আসার সুযোগ করে দেব এবং রক্তের ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হব, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম