Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কার্ড ব্যবস্থাপনায় কেমন হবে এআইয়ের কাজ

Advertisement

Icon

ড. শাহ জে মিয়া

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কার্ড ব্যবস্থাপনায় কেমন হবে এআইয়ের কাজ

Advertisement

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার কৃষি কার্ড, হেলথ কার্ড এবং ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রজেক্ট শুরু করেছে। এ প্রজেক্টগুলো বাংলাদেশের গণমানুষের কল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। যেমন নারীদের ক্ষমতায়নে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রায় ২ থেকে ৪ কোটি গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের নারীপ্রধানদের প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, কার্ডধারীরা টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি ও চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারছেন। এছাড়া দেশের স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে এ বছরের জুনের মধ্যে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড (ইএমআর) এবং শেয়ারেবল হেলথ রেকর্ড (এসএইচআর) কার্ডের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে, যার ফলে সরকারি-বেসরকারি যে কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসকরা রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাস এবং ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট সহজেই দেখতে পারবেন। কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন এবং কৃষকদের সরাসরি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে পহেলা বৈশাখে (বাংলা ১৪৩৩) টাঙ্গাইলে ‘কৃষক কার্ড’ বা ‘কৃষি কার্ডে’র উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ ও সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ডিলারদের পিওএস মেশিনের মাধ্যমে সহজে কৃষি উপকরণ কেনার সুযোগসহ মোট ১০টি বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন।

এ কার্ড সিস্টেমসগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে, একাধিক সরকারি মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান কর্মসূচির বিশাল তথ্যভান্ডারকে একক কাঠামোর মাধ্যমে নিরাপদে পরিচালনা ও সমন্বয় করার যোগ্যতা আমাদের অর্জন করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী আইসিটি অবকাঠামো ও স্থায়ী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা। এ অবকাঠামোটির মাধ্যমে আমরা ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক পরিষেবা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন আন্তঃসংযোগ বা ডাটা যোগাযোগ নিশ্চিত করতে পারব।

বর্তমান সরকার সংবেদনশীল পারিবারিক ডেটা সুরক্ষিত রাখতে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের (ডিপিআই) দিকে এবং শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা বিধিমালা এবং প্রযুক্তিগত সুরক্ষার ওপর অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেছে। এ কার্ডগুলোর পরিচালনাকারী স্থায়ী সিস্টেম তৈরি করতে হলে সম্মিলিত ডাটা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি; যেমন, হেলথ-ব্রিজ প্ল্যাটফর্ম এবং সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম (এসআরএস), শক্তিশালী এপিআই (অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস), গোপনীয়তা প্রটোকল এবং সম্মতি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর একসঙ্গে কাজ করা দরকার হবে। এক্ষেত্রে একটি বিকেন্দ্রীভূত, এনআইডি-যুক্ত রেজিস্ট্রির মাধ্যমে, সরকারকে খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন ডেটাবেজগুলোতে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে কমাতে পারবে।

আমাদের এ কার্ড ব্যবস্থাপনার উদ্যোগগুলো বৈশ্বিক সর্বোত্তম অনুশীলন, ইউএনডিপি, বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা সমর্থিত হতে হবে।

বর্তমান বাস্তবতায়, এ কার্ডগুলো ২৫টি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে থাকা ৯৯টি খণ্ডিত সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিকে একটি সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম এবং ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির অধীনে একীভূত করা প্রয়োজন। এ সিস্টেমের মাধ্যমে নাগরিকদের অন্তহীন ম্যানুয়াল কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রশাসনিক ডেটা; যেমন, টিআইএন তথ্য, জমির রেকর্ড, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং এনআইডি ডাটাবেজ থেকে নিয়ে আসতে এবং ক্রস চেক করে গতিশীলভাবে যোগ্যতা যাচাই করতে পারবে। এছাড়া প্রথাগত ব্যাংকিং বাধাগুলো এড়িয়ে জিটুপি পেমেন্ট সরাসরি মোবাইল ওয়ালেটে পাঠানোর মাধ্যমে এ কর্মসূচিগুলো বাংলাদেশের নগদবিহীন (ক্যাশলেস) অর্থনীতিতে রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করবে।

প্রস্তাবিত সিস্টেমটি মূলত একটি বিকেন্দ্রীভূত ক্লাউডভিত্তিক মাইক্রো সার্ভিস সল্যুশন হিসাবে দেখা যেতে পারে। সহজ কথায়, এখানে একটি মাত্র কেন্দ্রীয় কম্পিউটারের পরিবর্তে অনেক ছোট ছোট স্বাধীন সার্ভিস বা ‘মাইক্রো সার্ভিস’ মেঘের মতো ছড়িয়ে থাকা সার্ভারে কাজ করে। এটি পরিচালনা করার জন্য একটি ‘অরকেস্ট্রেশন হাব’ থাকে, যা অনেকটা অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের মতো সব সার্ভিসকে মিলিয়ে চালায়। ‘অরকেস্ট্রেশন হাব’ শব্দটি সাধারণত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একাধিক জটিল কাজ বা পরিষেবাকে একটি কেন্দ্রীয় জায়গা থেকে পরিচালনা ও সমন্বয় করার ব্যবস্থাকে বোঝায়। এটি কোনো নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা প্ল্যাটফর্মের নাম হতে পারে, যা বিভিন্ন ‘এজেন্ট’ বা সার্ভিসকে একসঙ্গে কাজ করতে সাহায্য করে। পুরো কার্ড ম্যানেজমেন্ট আর্কিটেকচারটিকে বেশকিছু বিশেষায়িত লেয়ারে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমেই রয়েছে পরিচয় (Porichoy) অংশ বা লেয়ার। বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি লেয়ার দ্বারা পরিচালিত এ লেয়ারটি বায়োমেট্রিক তথ্যের নিরাপদ স্টোরেজ এবং প্রমাণীকরণ পরিচালনা করে। নিরাপত্তার জন্য এখানে একাধিক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে মূল তথ্য ফাঁস না করেই পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব। তারপর রয়েছে ঠিকানা (Thikana) লেয়ার, এটি ব্যক্তিগত তথ্য এবং আবাসিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা করে। এর পরে রয়েছে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা মডিউল ভান্ডার। ভান্ডার হলো, এ সিস্টেমের ‘মস্তিষ্ক’, যা অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে যুক্ত করে। জাতীয় আর্থিক তহবিল ব্যবস্থাপনাই ভান্ডারের প্রধান কাজ। এটি অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের সঙ্গে যুক্ত করবে। সংগৃহীত আদমশুমারির তথ্য এবং এআই লেয়ারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এটি সম্পদের সুষম বণ্টনের পরিকল্পনা করে এবং এটি এ আদমশুমারির ডাটা এবং ‘বুদ্ধিমান’ লেয়ারের বিশ্লেষণ ব্যবহার করে সম্পদের সুষম বণ্টনের পরিকল্পনা করে। পরে বাজেট তৈরি করে এটি সরাসরি ‘হালখাতা’ লেয়ারে পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তী যে লেয়ারটি রয়েছে, তার নাম হালখাতা (Halkhata), যা কার্ড লেনদেন ব্যবস্থাপনায় সরাসরি মানুষের হাতে থাকা ফ্যামিলি কার্ড এবং জাতীয় লেনদেনের হিসাব (Ledger) পরিচালনা করবে। কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের পঞ্চম লেয়ার হলো, বাজার (Bazaar)। এ পেমেন্ট ম্যানেজমেন্ট লেয়ারটি ডিজিটাল সিস্টেম এবং বাস্তব জগতের কেনাকাটার মধ্যে সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করে। এটি সিস্টেমের সঙ্গে সাধারণ বিক্রেতা ও ব্যাংকের সংযোগ ঘটায়। সর্বশেষ লেয়ারটির নাম হলো, বুদ্ধিমান (Buddhiman) : বিগ ডাটা ও এআই ইঞ্জিন এটি পুরো আর্কিটেকচারের বুদ্ধিবৃত্তিক অংশ এবং এটি পুরো আর্কিটেকচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ইঞ্জিন। এটি সিস্টেমের প্রতিটি প্রান্ত থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিগ ডাটা এবং এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

এ কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমস কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটি সুশাসনের একটি নতুন ব্যবস্থাপনার অংশ। এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে একটি নিষ্ক্রিয় আমলাতান্ত্রিক কাঠামো থেকে একটি সক্রিয়, চটপটে এবং জনবান্ধব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার শক্তি রাখে।

ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অফ বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই; নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

বাইফোকাল লেন্স অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম