Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সংকটে যাদুকাটা নদী : এখনই ব্যবস্থা নিন

Icon

ড. আনোয়ারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সংকটে যাদুকাটা নদী : এখনই ব্যবস্থা নিন

Advertisement

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য প্রতীক যাদুকাটা নদী আজ গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। যে নদী এক সময় স্বচ্ছ নীলাভ পানি, পাহাড়ঘেরা অপরূপ দৃশ্য, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং অপার পর্যটন সম্ভাবনার জন্য পরিচিত ছিল, আজ সেই নদী অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের নির্মম আগ্রাসনে বিপর্যস্ত। উন্নয়নের নামে, আর্থিক লাভের আশায় এবং একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সীমাহীন লোভের কারণে নদীটির প্রাকৃতিক অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।

ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যাদুকাটা নদী প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। ৩২ থেকে ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ আন্তঃসীমান্ত নদী বহু বছর ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসাবে কাজ করে এসেছে। পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যসম্পদ, স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা, নৌপরিবহণ এবং খনিজসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে নদীটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু গত কয়েক বছরে এ নদীকে কেন্দ্র করে যে বাণিজ্যিক লুটপাট শুরু হয়েছে, তা এর অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বালু ও পাথর উত্তোলনের নামে চলছে এক নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ। ড্রেজার মেশিন, বোমা মেশিন এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নদীর বুক চিরে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তলদেশের ভারসাম্য এবং প্রাকৃতিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের ফলে তীব্র নদীভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে, যা স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ নদীভাঙনের কারণে বহু গ্রাম বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। লাউড়েরগড়, শিমুলবাগান, ঘাগটিয়া, সাহিদাবাদ, মানিগাঁও, কুনাটছড়াসহ অসংখ্য গ্রামের মানুষ আজ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কৃষিজমি নদীতে বিলীন হচ্ছে, বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ছে।

যাদুকাটা নদীর পরিবেশ বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্যের তোয়াক্কা না করেই যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে নদীর গভীরতা অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাও নদী অতিরিক্ত গভীর হয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার তলদেশ ভেঙে গিয়ে প্রবাহের দিক পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে নদীর দুই তীরে চাপ বাড়ছে এবং নদীভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। বালু ও পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল বিলীন হচ্ছে এবং পুরো বাস্তুতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, নদীর স্বাভাবিক তলদেশ ও পানিপ্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। নদীর জল ধারণক্ষমতা কমে যাবে, বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চল এক বৃহত্তর পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা আরও উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেছে। গত আড়াই দশকে যাদুকাটা নদীসংলগ্ন অঞ্চলে ভূমি ব্যবহারের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ২০০০ সালের দিকে যেখানে বসতবাড়ি ও অবকাঠামোগত ব্যবহারের পরিমাণ ছিল মাত্র ২.৮ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ শতাংশে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তার এবং অনিয়ন্ত্রিত মানবিক হস্তক্ষেপের কারণে বনভূমি ও আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।

যাদুকাটা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটনশিল্পও আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। শিমুলবাগান, বারেক টিলা, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা এবং স্বচ্ছ নীলাভ পানির সৌন্দর্য একসময় পর্যটকদের কাছে ছিল এক অপূর্ব আকর্ষণ। কিন্তু অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীভাঙন ও পরিবেশ দূষণের কারণে সেই সৌন্দর্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা, নৌযান চালক, স্থানীয় দোকানদার এবং পর্যটক গাইডদের আয়ও কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ, পরিবেশ ধ্বংসের প্রভাব সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও পড়ছে।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যকরভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। টাস্কফোর্স গঠন, অভিযান পরিচালনা এবং জরিমানা আরোপ করা হলেও বাস্তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা খুবই সীমিত। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। ফলে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ ও পরিবেশবাদীদের আহ্বান অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

বর্তমান ইজারা ব্যবস্থাও এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহাল-যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২-উচ্চমূল্যে ইজারা দেওয়া হলেও বাস্তবে ইজারার শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। নদীর পাড় না কাটার শর্ত প্রকাশ্যে লঙ্ঘিত হচ্ছে। এমনকি ইজারার নির্ধারিত সীমার বাইরেও বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পরিবেশ সংরক্ষণের চেয়ে অর্থনৈতিক মুনাফাকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ বাস্তবতায় যাদুকাটা নদীকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইসিএ (Ecologically critical area) ঘোষণা করার দাবি যৌক্তিক হয়ে উঠেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, যেসব এলাকা পরিবেশগত ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকিতে থাকে, সেগুলোকে ইসিএ ঘোষণা করা যায়। যাদুকাটা নদীর বর্তমান অবস্থা সেই ঘোষণার জন্য সব ধরনের যৌক্তিকতা বহন করে। ইসিএ ঘোষণা করা হলে সেখানে কঠোর পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হবে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সহজ হবে। ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে। একইসঙ্গে নদীর জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিজিবি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে স্থায়ী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটিভিত্তিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা চালু করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ নদীর প্রকৃত রক্ষক নদী-তীরবর্তী মানুষই।

প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কখনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে মানুষের জীবনমান উন্নত করে। যাদুকাটা নদীর বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সেই শিক্ষা নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে একসময়ের স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত যাদুকাটা নদী ভবিষ্যতে কেবল ইতিহাসের পাতায় স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে।

ড. আনোয়ারুল ইসলাম : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা : এখন কূটনৈতিক বাস্তবায়নের পালা

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা : এখন কূটনৈতিক বাস্তবায়নের পালা

চাকরির আবেদনের সময়সীমা বাড়ানো কতটা জরুরি

চাকরির আবেদনের সময়সীমা বাড়ানো কতটা জরুরি

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম