শুধু দণ্ড কার্যকর নয়, সত্য উদ্ঘাটনও জরুরি
Advertisement
কর্নেল মো. ইলিয়াস হোসেন (অব.)
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তৎকালীন জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যাই ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, সামরিক শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এক গভীর আঘাত। স্বাধীনতার পর সামরিক অভ্যুত্থান, পালটা অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতার যে ধারাবাহিকতা বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল আলোচিত ওই অধ্যায়গুলোর অন্যতম।
সম্প্রতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফরের গ্রেফতারের খবর জাতিকে আবারও সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আত্মগোপনে থাকার পর দণ্ডপ্রাপ্ত ওই আসামিকে আইনের আওতায় আনা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এ গ্রেফতারের গুরুত্ব শুধু একজন পলাতক আসামিকে আটক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার বিচার বহু বছর ধরে চলেছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আদালত কয়েকজন অভিযুক্তকে দণ্ডিত করেছেন। কিন্তু রায় ঘোষণার পরও সব আসামিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। কেউ কেউ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মুখোমুখি হয়েছেন, আবার কেউ বছরের পর বছর দেশের বাইরে বা আত্মগোপনে থেকে বিচার এড়িয়ে গেছেন। তেমনি আত্মগোপনে থাকা অভিযুক্তদের একজন মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন, যিনি গত ৪৫ বছর ধরে দেশের বাইরে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৬ জুলাই ২০২৬ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীস্থ বনানীর একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দল তাকে আটক করে। প্রশ্ন হলো একটি রাষ্ট্রে এক দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি এত দীর্ঘ সময় আইনের নাগালের বাইরে কীভাবে থাকতে পারেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা-দুই দিকই সামনে আসে। অতীতে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঘাটতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পলাতকদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে বাধা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বায়োমেট্রিক তথ্য, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বহু বছরের পলাতক আসামিকেও খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে। সাম্প্রতিক এই গ্রেফতার সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।
মেজর (অব.) মোজাফফরের গ্রেফতারকে শুধু একটি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে আইনের আওতায় আনার ঘটনা হিসাবে দেখলে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অপূর্ণ থেকে যাবে। একজন ব্যক্তি যদি টানা প্রায় ৪৫ বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে দেশে-বিদেশে অবস্থান করতে সক্ষম হন, তবে এটি শুধু তার ব্যক্তিগত কৌশলের বিষয় নয়; বরং এর পেছনে কোনো ব্যক্তি, নেটওয়ার্ক বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ছিল কিনা, তা খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বা রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দীর্ঘ আত্মগোপনের সময়কাল শুধু বিচার এড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাস নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও একটি প্রশ্ন। এক্ষেত্রে শুধু দণ্ড কার্যকর নয়, সত্য উদ্ঘাটনের জন্য তদন্তকারী সংস্থার উচিত জরুরিভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে নিুলিখিত বিষয়গুলো পরিষ্কার করা-
ক। ১৯৮১ সালের পর তিনি কোন কোন দেশে অবস্থান করেছেন?
খ। কীভাবে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করেছেন এবং ভ্রমণের জন্য কোন পরিচয় বা নথি ব্যবহার করেছেন?
গ। বাংলাদেশে তার কোনো সহযোগী, আশ্রয়দাতা বা অর্থনৈতিক সহায়তাকারী ছিল কিনা?
ঘ। বিদেশে অবস্থানকালে তিনি কোনো রাজনৈতিক, সামরিক বা গোয়েন্দা যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন কি না?
ঙ। তার অবস্থান গোপন রাখতে দেশি বা বিদেশি কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করেছে কিনা?
চ। তিনি আত্মগোপনের সময় বাংলাদেশে একাধিকবার প্রবেশ করে থাকলে, তা কীভাবে সম্ভব হয়েছে এবং এতে কোনো প্রশাসনিক বা নিরাপত্তাজনিত ব্যর্থতা ছিল কিনা?
এ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কাউকে প্রমাণ ছাড়া অভিযুক্ত করা নয়। বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা। যদি তদন্তে নতুন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠনের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার যদি এমন কোনো প্রমাণ না পাওয়া যায়, সেটিও জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা উচিত।
বহু দেশে রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা, সন্ত্রাসবাদ বা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্ত শুধু মূল অপরাধীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার অর্থের উৎস, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, সহযোগী এবং দীর্ঘদিন পলাতক থাকার অবকাঠামোও অনুসন্ধান করা হয়। কারণ একজন অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়া বা বিচার এড়াতে সহায়তা করাও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধেরই অংশ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক হস্তক্ষেপের অধ্যায় থেকে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়-সশস্ত্র বাহিনীর সাংবিধানিক ভূমিকা এবং পেশাদারত্ব রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। স্বাধীনতার পর নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ একটি পেশাদার বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যখন সামরিক শৃঙ্খলা ভেঙে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। যার প্রমাণ আমরা নিকট অতীতেই প্রত্যক্ষ করেছি। তাই ১৯৮১ সালের ঘটনাকে শুধু অতীতের একটি ট্র্যাজেডি হিসাবে নয়, ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসাবেও বিবেচনা করা উচিত।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে সেক্টর কমান্ডার হিসাবে তার ভূমিকা ছিল গৌরবময়। জেনারেল জিয়া তৎকালীন সামরিক বাহিনীর মধ্যে একজন দৃঢ়, সৎ ও পেশাদার অফিসার হিসাবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর, দেশ যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বহীন, ভেঙে পড়া প্রশাসনিক কাঠামো, বিপর্যস্ত অর্থনীতি, ঠিক ওই সময় জেনারেল জিয়ার আগমন ছিল অনেকটা উদ্ধারকের মতো। তিনি ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন যখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টসহ দেশের বিভিন্ন সেনা স্থাপনায় ব্যাপক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। আর সেনাবাহিনীর এ অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার মধ্যদিয়েই উঠে আসেন দেশের নতুন নেতৃত্ব; একজন মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা, যার দায়িত্ববোধ ও দৃঢ়তায় দেশ নতুন স্থিতির পথে অগ্রসর হয়। তার প্রথম পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসনে স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা প্রদান। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ-দেশকে পুনর্গঠন করা, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার।’ চৌকশ এবং বুদ্ধিদীপ্ত সেনা কর্মকর্তা হিসাবে তিনি পরিস্থিতি অত্যন্ত দৃঢ়তা এবং দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে সেনাবাহিনীর মধ্যে আস্থা অর্জন এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে তিনি সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব নেন। দেশ গঠনে তার অবদান, তার নীতি এবং তার রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে সেনাবাহিনী বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই, একজন রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ড কখনোই রাজনৈতিক মতভেদের গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত এক ব্যক্তিকে হত্যা করা পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর আঘাত।
আজ ৪৫ বছর পর যখন এ মামলার একটি নতুন অধ্যায় সামনে এসেছে, তখন জাতির প্রত্যাশা হওয়া উচিত সব বিচারিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা, প্রয়োজনে নতুন সব তথ্য নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে কোনো আপস না করা। এ তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই যেন তাড়াহুড়া করে সম্পন্ন করা না হয়। এতে অনেক সত্য আড়ালে থেকে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, ইতিহাসের বিচার প্রতিশোধের ভাষায় নয়, সত্য, প্রমাণ এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
সবশেষে বলা যায়, মেজর মোজাফফরের গ্রেফতার শুধু একটি ফৌজদারি মামলার অগ্রগতি নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রের জন্য একটি আত্মসমালোচনারও সুযোগ। বিচারব্যবস্থা কতটা কার্যকর, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় কতটা শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা ফলপ্রসূ এবং আইনের শাসনের প্রতি রাষ্ট্র কতটা অঙ্গীকারবদ্ধ-এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার এটাই উপযুক্ত সময়। ইতিহাসের ক্ষত মুছে ফেলা যায় না, কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ, আরও গণতান্ত্রিক এবং আরও আইনের শাসনভিত্তিক করা যায়। একটি পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয় এখানেই।
কর্নেল মো. ইলিয়াস হোসেন, পিএসসি, পিইঞ্জ (অব.) : কলামিস্ট
