খেলাপি ঋণ কালচারের দায়ভার কি শুধুই ঋণগ্রহীতার
Advertisement
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গত বছরের মার্চে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ২ শতাংশে। আর চলতি বছরের মার্চে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে। খেলাপি ঋণের এ প্রবৃদ্ধি উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণের এ ঊর্ধ্বগতির জন্য ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও কতিপয় বড় করপোরেট গ্রুপ দায়ী।’
প্রশ্ন হলো, খেলাপি ঋণ কালচারের দায়ভার কি শুধুই ঋণগ্রহীতার? গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট প্রদানের মাধ্যমে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দিয়েছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়। বকেয়া ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে ইচ্ছাকৃত ও পরীক্ষিত ঋণখেলাপিদের বারবার বিশেষ পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
পৃথিবীর সব দেশেই ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা দেওয়া হয়। তবে আমাদের দেশের মতো এত ঢালাওভাবে এ সুবিধা দেওয়া হয় না। একান্ত অনিবার্য কারণে কোনো ঋণগ্রহীতা ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও তার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে তাকে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা দেওয়া হয়। এজন্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রণীত বিশেষ নিয়ম রয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায় ১৯৯১ সালে। সেসময়, ২০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক পত্রিকার মাধ্যমে ১৭১ জন বৃহৎ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় স্থানপ্রাপ্ত ঋণখেলাপিদের কাছে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ খেলাপি ঋণ পাওনা ছিল। এ তালিকা প্রকাশের পর ঋণখেলাপিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তারা নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ গ্রহণ করে। সেই সময় মোট তিনবার খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করা যেত। প্রথমবার ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের জন্য মোট পাওনা খেলাপি ঋণের ১০ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ২০ শতাংশ এবং তৃতীয়বার ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসাবে নগদে ব্যাংকে এককালীন জমা দিতে হতো।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাস দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। কলকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। সেসময় সরকারদলীয় সমর্থক একটি উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট জমা নিয়ে ৫০০ কোটি টাকা ও তদূর্ধ্ব অঙ্কের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনর্গঠন করিয়ে নেয়। পরবর্তীকালে আ হ ম মোস্তাফা কামাল অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেওয়া হয়। গত বছর অক্টোবরে এবং চলতি জুন কোয়ার্টারে আবারও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেওয়া হয়। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং তারা চাইলে যে কোনো আইন পরিবর্তন করতে পারেন। বারবার ঋণখেলাপিদের এভাবে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার কারণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে যারা নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিয়মিত ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে চলেছেন, তাদের কেন বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না? এভাবে ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের কারণে যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে চলেছেন, তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হতে বাধ্য। ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ বিশেষ সুবিধার আওতায় যারা তাদের ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণ করে নিয়েছেন, তাদের পরবর্তী ঋণের কিস্তি পরিশোধ কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। যারা ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করিয়ে নিয়েছেন, তাদের অনেকেই শর্ত মোতাবেক ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছেন না। ফলে যে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে খেলাপিমুক্ত করা হয়েছে, তা আবারও খেলাপি ঋণের খাতায় চলে যেতে পারে।
খেলাপি ঋণ সৃষ্টির পর তা আদায়ের জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় ঠিকই; কিন্তু খেলাপি ঋণ কেন সৃষ্টি হয় বা কী ধরনের পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির প্রবণতা রোধ হতে পারে, তা নিয়ে আমরা খুব একটা সতর্ক নই। কথায় বলে, কর্জোত্তর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে পূর্ব সতর্কতা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে। খেলাপি ঋণ সৃষ্টির পর তা উদ্ধারের চেষ্টা চালানোর চেয়ে ব্যাংক ঋণ যাতে অযোগ্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে না যায়, তা নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, আমরা খেলাপি ঋণের জন্য এককভাবে ঋণগ্রহীতাদের দায়ী করে থাকি। কিন্তু যারা ঋণদান কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তারা প্রায়ই থাকেন দায়মুক্ত। কথায় বলে, ‘এক হাতে তালি বাজে না।’ ব্যাংকারদের সহযোগিতা না পেলে একজন অযোগ্য ঋণগ্রহীতার পক্ষে প্রচলিত ব্যাংক আইনের ফাঁক গলিয়ে ঋণ মঞ্জুর করিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। ঋণ মঞ্জুরকালে মোট ঋণাঙ্কের বিপরীতে নির্দিষ্ট মূল্যের সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধক দিতে হয়। এ বন্ধকিকৃত সম্পদের মূল্য হতে হয় ১:২৫ শতাংশ অথবা ১:৫০ শতাংশ। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তা যদি ১০০ টাকা ঋণ গ্রহণ করতে চান, তাহলে তাকে ক্ষেত্রভেদে ১২৫ টাকা অথবা ১৫০ টাকার স্থাবর সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধক দিতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধকিযোগ্য সম্পদের অতি মূল্যায়ন করা হয়। ব্যাংকারদের সহায়তা পেলে ১ কোটি টাকার বন্ধকিযোগ্য সম্পদের মূল্য ১০ কোটি টাকা বা ২০ কোটি টাকা প্রদর্শন করা সম্ভব। বন্ধকিযোগ্য সম্পদের সঠিক ভ্যালুয়েশন করা হলে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির প্রবণতা অনেকটাই কমে যেত। কারণ কেউই ১০০ টাকা ঋণ নিয়ে ১৫০ টাকার সম্পদ হারাতে চাইবেন না। অ্যাসেট ভ্যালুয়েশন টিম সম্পদের অতিমূল্যায়ন করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।
ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য অন্তত ৭ থেকে ৮ জন কর্মকর্তার মতামত প্রয়োজন হয়। নথি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সব কর্মকর্তার মতামত একই রকমের। একজন কর্মকর্তাও ভিন্নমত প্রদর্শন করেন না। এর অর্থ কি এই যে, সব কর্মকর্তাই ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে একই মনোভাব পোষণ করেন? আসলে তা নয়। প্রত্যেক কর্মকর্তাকে শীর্ষ কর্মকর্তার ইচ্ছাকে তার মন্তব্যে প্রতিফলিত করতে হয়। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে নোটের মন্তব্য কী হবে, তা নিজে খসড়া লিখে দেন। কাজেই অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তার পক্ষে স্বাধীনভাবে মতামত উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না। অথচ আইন মোতাবেক প্রত্যেক কর্মকর্তার নোটে তার স্বস্ব মতামত ব্যক্ত করার কথা। সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ সেই মতামত থেকে যে কোনো একটি বা একাধিক মতের সমন্বয়ে তার নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করবে এবং অনুমোদন দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। লর্ড বেন্টিঙ্ক একবার বলেছিলেন, কেরানি থেকে শুরু করে ডিজির বক্তব্য যদি একই রকম হয়, তাহলে কেরানি আর ডিজি থাকলেই তো হয়, মাঝখানে এত কর্মকর্তার প্রয়োজন কী? ব্যাংক ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে একই কথা বলা যেতে পারে। একজন কর্মকর্তা, তিনি যে পর্যায়েরই হোন না কেন, যদি স্বাধীনভাবে তার মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ পেতেন, তাহলে খেলাপি ঋণের মাত্রা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। বড় অঙ্কের ঋণ হলে তা অনুমোদনের জন্য পরিচালনা বোর্ডে উপস্থাপন করতে হয়। পরিচালনা বোর্ডে যারা সদস্য থাকেন, তারা যদি সৎ, আন্তরিক ও দক্ষ হন, তাহলে তাদের পক্ষে কোন ঋণ প্রস্তাব ভালো, আর কোনটি ভালো নয়, তা নিরূপণ করা কঠিন নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যারা ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে সদস্য হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাদের অনেকেই আছেন, যাদের যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতা প্রশ্নাতীত নয়।
ব্যাংকে ঋণ যারা মঞ্জুর করার দায়িত্বে থাকেন, পরবর্তী সময়ে ঋণের কিস্তি আদায়ের ক্ষেত্রে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। যারা ঋণ মঞ্জুরের দায়িত্বে থাকবেন, সেসব কর্মকর্তাকে কোনো না কোনোভাবে ঋণ আদায়ের জন্য দায়বদ্ধ করা গেলে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে তারা স্বচ্ছতা মেনে চলতেন। দায়হীন ক্ষমতা কখনোই ভালো ফল দিতে পারে না। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ একটি গুরুতর সমস্যায় পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণ সৃষ্টিত্তোর তা আদায়ের ব্যবস্থা করার চেয়ে খেলাপি ঋণ যাতে সৃষ্টি হতে না পারে, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। ঋণ অনুমোদনকালে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তার দায়ভার অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং পরিচালনা বোর্ডকে নিতে হবে। কারণ বাইরে থেকে কেউ এসে ব্যাংকের ওপর খেলাপি ঋণের দায়ভার চাপিয়ে দেন না। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণেই খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়।
ব্যাংক খাত হচ্ছে একটি দেশের অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’। তাই এ খাতকে স্বচ্ছ ও খেলাপি ঋণমুক্ত রাখার জন্য যত কঠিন পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা গ্রহণ করতে হবে। দেশে ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। মার্জারের মাধ্যমে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ; বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা
অনুলিখন : এম এ খালেক
