অন্যমত
বর্তমান মুদ্রানীতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত
Advertisement
আবু আহমেদ
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমানে ঘোষিত যে মুদ্রানীতি বাংলাদেশ ব্যাংক অনুসরণ করছে, আমার দৃষ্টিতে এটা সমর্থনযোগ্য নয়। কেননা সরকার বাজেটের ফাইন্যান্স বিলে প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, বর্তমান মুদ্রানীতি এটিকে সমর্থন জোগানোর মতো নয়। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৬.৫ শতাংশ অর্জন করতে হলে একটি সহায়ক মুদ্রানীতি প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান মুদ্রানীতি সহায়ক নয়। আসলে মুদ্রানীতি হলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত এমন একটি কৌশল, যার মাধ্যমে বজারে মুদ্রা সরবরাহ, সুদের হার এবং ঋণের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখাই এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু বর্তমান মুদ্রানীতি এসব লক্ষ্য অর্জনের বিপরীতে রয়েছে বলে আমার মনে হয়। দুধরনের মুদ্রানীতি রয়েছে। একটি হচ্ছে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি, যা বাজারে অর্থের সরবরাহ ও ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়, যেটা দেশের মন্দা কাটাতে সাহায্য করে। অপরটি হচ্ছে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে বাজারে অর্থের সরবরাহ ও ঋণের প্রবাহ কমিয়ে দিতে প্রয়োগ করা হয়।
দেশে ৪ বছর ধরে যে মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, সেটি হলো সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দমিয়ে রাখার জন্য এ মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি তো কমেইনি, বরং আরও বাড়ছে। এ পলিসি প্রয়োগে প্রধান যে ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, তা হচ্ছে পলিসি রেট বা রেপো রেট। বর্তমান এ মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে এই রেপো রেটটা আগে থেকে বৃদ্ধি করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ রেপো রেট দশেই রাখা হয়েছে। আমি মনে করি, এটা কমানো উচিত ছিল। রেপো রেট ১০ মানে হচ্ছে, এ রেটে ব্যাংকগুলো ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। এ রেপো রেটের সঙ্গে ব্যাংকগুলো ৪ যোগ করবে। তাহলে মার্কিং ইন্টারেস্ট দাঁড়াবে ১০+৪=১৪। ১৪ বা কারও কারও ক্ষেত্রে ১৫ও হতে পারে।
গত মুদ্রানীতি ঘোষণা করার আগে এত উচ্চ সুদ ছিল না। আগে সুদের হার ছিল ৯ থেকে ১১-এর মধ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তিটা হচ্ছে চাহিদা কমানো, যার অর্থ মানুষের হাতে টাকা কম দেওয়া। তাতে চাহিদা কমবে, চাহিদা কমলে মূল্যস্ফীতি কমবে। কিন্তু এই নীতি বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, এটা হচ্ছে আইএমএফ মডেলের একটা অংশ, যাকে নিউ-ক্লাসিক্যাল ইকোনমি বলে। ওটারই একটা অংশ হচ্ছে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি। এটা উন্নত অর্থনীতির জন্য প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর জন্য এর ব্যবহার ঠিক আছে। আমাদের মতো দেশের অর্থনীতিতে এই নীতি কাজ করে না। কারণ আমাদের সমস্যা হচ্ছে সরবরাহ থেকে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে পর্যাপ্ত সরবরাহ হচ্ছে না দেশে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ ১৪, ১৫ শতাংশ হার সুদে সাধারণত কেউ ঋণ করবে না। ফলে সরবরাহ তো কমে যাবেই। সরবরাহ কমে গেলে মূল্যস্ফীতি তো এমনিতেই হবে। আজকে বিভিন্ন সেক্টরে যে অনিশ্চয়তা অনুভূত হচ্ছে, এটা সরবরাহ কমে যাওয়ার করণে। অথবা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে সরবরাহ বৃদ্ধি পায়নি বলে। বর্তমান মুদ্রানীতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে ৮ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশে নেমে গেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার যদি সাড়ে ৬ শতাংশ অর্জন করতে হয়, তাহলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমপক্ষে ১৫-এর উপরে থাকতে হবে। এটা এখন ৬-এর নিচে নেমে এসেছে। একদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, বাজেটে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছি। আরেকদিকে এমন মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, যেটা এর বিপরীতে অবস্থান করছে। তাহলে এর কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করব কীভাবে? বাংলাদেশ ব্যাংককে বুঝতে হবে, আমাদের এ মুদ্রানীতি সরকারের আর্থিক নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা, কিংবা এটাকে সাপোর্ট দেবে কি না। যদি সাপোর্ট না দেয়, তাহলে বিকল্প চিন্তা করা উচিত। একই ধারায় বসে থাকলে তো হবে না, দেশের অর্থনীতি এগোবে না।
অপরদিকে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে আর্থিক বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। ঠিক আছে, দিক। খাদের কিনারে থাকা ব্যাংকগুলোকে দাঁড়ানোর জন্য সরকার অর্থ তো দিচ্ছেই, এর সঙ্গে সুদের হারটা কমিয়ে দিলেই তো হয়। তাহলে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক থেকে বা অন্য কোনো সূত্র থেকে খুব সহজেই ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। এর ফলে ঋণপ্রবাহ বাড়বে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখাচ্ছে, আমরা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে মার্কেটে অতটা অর্থ ছাড় দিতে চাচ্ছি না। অপরদিকে সংকটে থাকা ব্যবসায়িক গ্রুপগুলোকে বা কলকারখানাগুলোকে প্রণোদনা বাবদ ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। ওটা তো দরকার হতো না, যদি ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে দেওয়া হতো। এখন যেটা হবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেউ কেউ ঋণ পাবে, অন্যরা পাবে না। বলতে গেলে, অন্যরা তাদের প্রকৃত চাহিদা পূরণ করার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ করতে পারবে না। অপরদিকে ব্যাংকে গ্রাহক না থাকার ফলে তারা সরকারি বন্ড কিনছে। অর্থাৎ ব্যাংক সরকারি বন্ড ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ দিচ্ছে। অথচ ঋণটা দেওয়ার কথা ছিল বেসরকারি খাতকে। উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা নেই। স্বাভাবিকভাবেই এত উচ্চ সুদে বেসরকারি খাত ঋণ নেবে না। এ অসংগতিগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখা উচিত। নীতিনির্ধারকদের কেউ একজন বলল যে, সুদের হার না বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে থাকবে, বিনিময় হারে অসুবিধা হবে ইত্যাদি। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটাই পালন করে যাচ্ছে। অথচ বাস্তব চিত্র এর বিপরীত। মূল্যস্ফীতি তো এমনিতেই হচ্ছে, বিনিময় হার তো ইতোমধ্যেই বেশি। তাহলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি চালু করে তো কোনো লাভ হলো না। আসলে এটিকে সামাল দেওয়ার অপেক্ষাকৃত ভালো বিকল্প হচ্ছে সুদের হার কমিয়ে সরবরাহ-পক্ষকে উজ্জীবিত করা। সড়ক-মহাসড়কের দক্ষতা বাড়াতে হবে। ট্রান্সপোর্ট ও লজিস্টিক সাপোর্টগুলোয় উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে হবে। নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে যদি চুক্তি করতে হয়, তবে তা দ্রুতই করতে হবে। স্রোতের বিপরীতে গা ভাসালে চলবে না। কিছু না করে বসে থাকলে অর্থনীতির চাকা তো আর ঘুরবে না। এটা এমনিতেই বিধ্বস্ত। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৩.৪ থেকে কমে ২.৮-এ নেমে গেছে। তাহলে এ বাজেটের অর্থই বা কী, এ মুদ্রানীতির সুফলই বা কী। অর্থনীতিতে তো কোনো গতি আসছে না।
আমি যেটা নিয়ে চিন্তিত তা হচ্ছে, আমাদের অর্থনীতিতে বুস্টার ডেভেলপ হচ্ছে না। দেশের অর্থনীতিতে যদি একটা বুস্টার ডেভেলপ না হয়, তাহলে এখানে নীতিগত একটা সমর্থন লাগবে। সেই সমর্থন আমি দেখছি না। কেবল কিছু জায়গায় কর কমিয়ে দিলে বা নিয়ন্ত্রণমুক্ত করলেই তো অর্থনীতি উন্নত হবে না। মুখ থুবড়ে পড়া এ অর্থনীতি শেয়ারবাজারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্বের যেখানেই উচ্চ সুদ রয়েছে, সেখানেই তা শেয়ারবাজারের বিপক্ষে গেছে। এগুলো আমাদের দেখা উচিত। সবাই মিলে বসা উচিত। একটা সঠিক সিদ্ধান্তে না আসতে পারলে আমাদের অর্থনীতি গতি হারাবে, মুখ থুবড়ে পড়বে। দেশে কোনোটাই ঠিকভাবে চলছে না। শেয়ারবাজার কোনোরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে লোকের হাতে টাকা যাচ্ছে না। কোনো বিজনেস হাউজ, কলকারখানার উদ্যোক্তারা উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংক ঋণ করতে রাজি হচ্ছেন না। তারা ইতোমধ্যে দেনাদার হয়ে বসে রয়েছেন। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। এতে অর্থনীতিতে বিপদ আরও বাড়বে।
আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, তা হলো-কিছুদিন আগে খবর বেরিয়েছে, কিছু বিজনেস হাউজ যারা এখনো সক্রিয় আছে, তারা বিদেশ থেকে ঋণ আনছে। বিদেশ থেকে ডলারে ঋণ করলে তা সস্তায় পাওয়া যায়, এ সূত্র ধরেই তারা তা করছে। একদিকে দেশীয় ব্যাংকগুলো টাকা নিয়ে বসে রয়েছে, অপরদিকে শিল্প হাউজগুলো বা ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু নিজের দেশের ব্যাংকগুলো থেকে তাদের ঋণ নেওয়ার ইচ্ছা নেই। এটার মূল কারণ হচ্ছে, ঋণের উচ্চ সুদ। এসব হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসির কারণে। এজন্য আমি মনে করি, এ মুদ্রানীতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বর্তমান সুদের হার কমানো উচিত। সবাই মিলে বসে এসব ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তা না হলে সামনে আরও বিপদ অপেক্ষা করছে আমাদের অর্থনীতির জন্য। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)
আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি
