Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

গাজার ধ্বংসস্তূপে স্বপ্নছোঁয়ার হাসি

Advertisement

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গাজার ধ্বংসস্তূপে স্বপ্নছোঁয়ার হাসি

Advertisement

যুদ্ধবিরতি হয়েছে; কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি। এখনো ইসরাইলি বিমানগুলো ভয়াবহ মাত্রায় বোমা ফেলছে, শিশু বা নারী, হাসপাতাল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোনো কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। ফলে গাজা মানেই প্রতি মুহূর্তের মৃত্যুঝুঁকি, অনাহার, ধ্বংসস্তূপ, ভেঙে পড়া ভবন, বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘ সারি। আর সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই প্রকাশিত হলো ‘তাওজিহি’ পরীক্ষার ফলাফল। ফল হাতে নিয়ে দুঃসহ কষ্টেও গাজার শিক্ষার্থীদের মুখে ফুটে উঠল অনাবিল হাসি। সেই হাসি কেবল ভালো ফলের আনন্দ নয়; এটি বেঁচে থাকার, স্বপ্ন দেখার এবং ভবিষ্যৎকে আঁকড়ে ধরার এক নজিরবিহীন ঘোষণা।

ফিলিস্তিনের সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা-তাওজিহি (আমাদের দেশের এইচএসসি সমমানের)-শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি। এ পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ, উচ্চশিক্ষার পথ এবং অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের দিকনির্দেশনা। তাই তাওজিহি শেষ করা ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু একটি শিক্ষাবর্ষের সমাপ্তি নয়; এটি জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের দরজা। তবে গাজার শিক্ষার্থীদের জন্য সেই দরজা খুলেছে এক ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে।

যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণে ২০২৪ সালে গাজায় তাওজিহি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। বহু শিক্ষার্থী, যারা স্বাভাবিক সময়ে জুন মাসে পরীক্ষার হলে বসার কথা ছিল, তারা হারিয়ে ফেলে একটি পুরো শিক্ষাবর্ষ। ধ্বংস হয়ে যায় স্কুল, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে শিক্ষার ধারাবাহিকতা, আর অনেক পরিবারকে একাধিকবার ঘরছাড়া হতে হয়; কিন্তু তবুও তারা এই ভেবে সান্ত্বনা পেতে পারে যে, তারা প্রাণটি হারায়নি। তাদের অনেকের মা-বাবা, ভাইবোন হারিয়েছে। অনেক পরিবারের সব সদস্যই চিরবিদায় নিয়েছে। ভয়াবহ হামলার মুখে কেউ আশ্রয় নেয় তাঁবুতে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ বা স্কুলের ধ্বংসপ্রায় ভবনে। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও বই-খাতার অনিশ্চয়তার মধ্যে নিয়মিত পড়াশোনা করাই যেখানে কঠিন, সেখানে একটি জাতীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব কাজ।

তবু তারা থেমে থাকেনি।

গাজার অনেক শিক্ষার্থীর পড়ার টেবিল ছিল না। ছিল না নিরিবিলি ঘর, পর্যাপ্ত আলো কিংবা প্রয়োজনীয় বই। কারও পড়াশোনা চলেছে তাঁবুর কোণে, কারও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির পাশে, আবার কেউ বন্ধু বা শিক্ষকের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে একটি বই। যুদ্ধের শব্দ, গোলাবর্ষণের আতঙ্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা পাঠ্যবই খুলেছে। কখনো মোমবাতির আলোয়, কখনো মোবাইল ফোনের ক্ষীণ আলোয়, কখনো স্মৃতি থেকে পুনরাবৃত্তি করে তারা প্রস্তুতি নিয়েছে পরীক্ষার জন্য। অনেক শিক্ষকও নিজেদের নিরাপত্তা ও সংকট ভুলে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র বা খোলা জায়গায় ছোট ছোট পড়ার দল তৈরি হয়েছে। শ্রেণিকক্ষ না থাকলেও শিক্ষা থেমে থাকেনি-এটাই ছিল তাদের নীরব প্রতিরোধ।

অনেক অপেক্ষার পর গাজার শিক্ষার্থীরা তাওজিহি পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেয়েছিল। পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল যুদ্ধের ক্ষত বহন করা ভবন, অস্থায়ী স্থান কিংবা সীমিত সুবিধার আশ্রয়কেন্দ্র। অনেক পরীক্ষার্থী তখনো বাস্তুচ্যুত, অনেকের পরিবার শোকাহত, আর অনেকেই নিজের ঘর ও প্রিয়জন হারানোর বেদনা বয়ে নিয়ে পরীক্ষার হলে পৌঁছায়। তাদের হাতে ছিল কলম, সামনে প্রশ্নপত্র-কিন্তু মনের ভেতর ছিল আরও বড় এক পরীক্ষা। মনোযোগ ধরে রাখা, ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করা এবং স্বাভাবিক জীবনের মতো পরীক্ষা দেওয়া-সবকিছুই ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার মতো।

তবু তারা পরীক্ষায় বসেছে।

ফল প্রকাশে গাজার অনেক পরিবারে আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল কান্না। কেউ সন্তানকে জড়িয়ে ধরেছে, কেউ মৃত স্বজনের ছবি সামনে রেখে ফল দেখেছে, কেউ ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছে নিজের সাফল্যের কথা। এই যেমন তালা আবু শুক্করের কথাই ধরা যাক। থাকে মধ্য গাজার বুরেজ উদ্বাস্তু শিবিরে। ২০১০ সালে তার বয়স যখন মাত্র ২, তখন সে তার মাকে হারায়। আর এবারের গাজা যুদ্ধের শুরুতে প্রথমে মারা যায় তার বড় ভাই ইউসুফ, এরপর তার বাবা মাহমুদ, তার বোন। এ ছাড়া ঘনিষ্ঠ স্বজনদেরও অনেকে শাহাদতবরণ করেছে। সাধারণ কেউ হলে পড়াশোনা করা বা পরীক্ষা দেওয়ার কথা চিন্তাও করত না; কিন্তু সে গাজার বাসিন্দা। চাচার সহায়তায় পরীক্ষা দিয়েছে এবং ৮৬ শতাংশ স্কোর করে পাশ করেছে। ফলাফলে খুশি হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে শহীদ মা-বাবা, ভাইবোনদের কথা মনে পড়েছে। তারা যদি দেখে যেতে পারতেন!

প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক পরিবার থেকে তিনজন পরীক্ষা দিয়ে সবাই দুর্দান্ত ফলাফল করার ইতিহাসও দেখা যাচ্ছে। সামা পেয়েছে ৯৭.৫ শতাংশ নম্বর, আবদুল্লাহ ৯৪.৬ শতাংশ, নাদা ৯৪.৪ শতাংশ নম্বর। তারা মনে করেছে, পরিবারে একটু আনন্দ দিতে পারে তাদের ভালো ফলাফল। তারা সেটাই করে দেখিয়েছে।

ফিলিস্তিনি শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ বারহাম আল জাজিরাকে বলেন, অধিকৃত পশ্চিমতীর, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকার প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষা দিয়েছিল। কেবল গাজা থেকেই দিয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার। সংখ্যাটি আরও হাজারের বেশি হতে পারত। ইসরাইলি হামলায় ১১শ’র বেশি তাওজিহি পরীক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

এ ফলাফল গাজার সন্তানদের কাছে শুধু নম্বরের হিসাব নয়। প্রতিটি নম্বরের পেছনে রয়েছে অনিদ্রার রাত, অনিশ্চয়তার দিন, ক্ষুধা ও আতঙ্কের সঙ্গে লড়াই এবং হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক জীবনের স্মৃতি। কেউ অসাধারণ ফল করেছে, কেউ প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে; কিন্তু এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীই এক অর্থে বিজয়ী। কারণ তারা এমন এক পরিস্থিতিতে পরীক্ষা দিয়েছে, যেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাই ছিল সাহসের কাজ। তাদের সাফল্য প্রমাণ করেছে-ধ্বংস করা যায় স্কুলভবন, ছিন্ন করা যায় বইয়ের পাতা, থামিয়ে দেওয়া যায় ক্লাস; কিন্তু জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে সহজে ধ্বংস করা যায় না।

ফল হাতে গাজার কোনো কিশোরী যখন হাসে, সেই হাসির পেছনে থাকে অনেক অশ্রু। কোনো কিশোর যখন জানায়, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়, তার কণ্ঠে শোনা যায় শুধু ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, শোনা যায় একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা। তারা ডাক্তার হতে চায়, প্রকৌশলী হতে চায়; শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা বিজ্ঞানী হতে চায়। কেউ চায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতাল পুনর্গঠন করতে, কেউ চায় শিশুদের জন্য নতুন স্কুল বানাতে, কেউ চায় নিজের শহরকে আবার বাসযোগ্য করে তুলতে। তাদের স্বপ্নগুলো যুদ্ধের বাস্তবতার চেয়ে বড়। কারণ তারা শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নয়, গাজার ভবিষ্যৎও কল্পনা করছে।

গাজার শিক্ষার্থীদের তাওজিহি সাফল্যকে তাই কেবল পরীক্ষার ফল হিসাবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি এক ধরনের শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ-যেখানে অস্ত্রের বদলে আছে বই, ধ্বংসের বদলে আছে নির্মাণের স্বপ্ন, আর হতাশার বিপরীতে আছে শিক্ষার আলো।

তারা যেন বলছে, ‘আমাদের ঘর ভেঙে দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ নয়। আমাদের স্কুল ধ্বংস করতে পারেন, কিন্তু শেখার ইচ্ছা নয়। আমাদের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিতে পারেন, কিন্তু স্বপ্ন দেখার অধিকার নয়।’

এই বার্তাই গাজার তাওজিহি ফলাফলকে বিশেষ অর্থ দিয়েছে।

তবে ফল প্রকাশের আনন্দের পরও বাস্তবতা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, যাতায়াত, অর্থের সংস্থান এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ-সবকিছুই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক শিক্ষার্থীর বাড়ি নেই, পরিবারের আয় নেই, বই-খাতা নেই। কারও কারও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথও অনিশ্চিত।

তবু তারা আশাবাদী। কারণ তারা জানে, এক ধাপ এগিয়ে যাওয়াও এ সময়ে বড় অর্জন। তাওজিহির ফল তাদের হাতে একটি সনদ দিয়েছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দিয়েছে আত্মবিশ্বাস-যে তারা প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে পারে।

গাজার ধ্বংসস্তূপে তাওজিহির ফল প্রকাশ যেন এক টুকরো বসন্ত। সেখানে আনন্দ আছে, কান্না আছে, হারানোর স্মৃতি আছে-কিন্তু আছে আগামী দিনের প্রতিশ্রুতিও।

যে শিশুরা যুদ্ধের মধ্যে বই খুলেছে, তারা শুধু পরীক্ষার উত্তর লেখেনি; তারা ইতিহাসের পাতায় লিখেছে নিজেদের দৃঢ়তার গল্প। তাদের হাসি ধ্বংসস্তূপের ওপর ফুটে ওঠা ফুলের মতো-নাজুক, অথচ অদম্য। গাজার সেই তরুণ মুখগুলো আজ বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে : স্বপ্নের কোনো ধ্বংসস্তূপ হয় না। স্বপ্ন বেঁচে থাকে-একটি কলমে, একটি ফলাফলে, একটি হাসিতে।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

শিক্ষাঙ্গনে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি

বাইফোকাল লেন্স অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

অগ্নিসন্ত্রাস কি অব্যাহত থাকবে

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সমীকরণ

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম