ঢাকার বাসযোগ্যতা ও নাগরিক আকাঙ্ক্ষা
Advertisement
খালিদ মাহমুদ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহণ, এলাকাভিত্তিক অবকাঠামো, উন্মুক্ত জনপরিসর, বায়ুদূষণ, পানি ব্যবস্থাপনা, বর্ষাকালের জলাবদ্ধতা কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই নাগরিকদের স্বস্তির জায়গা নেই। বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরী হিসাবে ঢাকা প্রায়ই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে। ফলে শহরটির বাসযোগ্যতা আজ নগরবাসীর অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বয়ং রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা জনপ্রতিনিধিরা যখন বিভিন্ন সময়ে তাদের হতাশা প্রকাশ করেন, তখন সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা আরও বৃদ্ধি পায়।
একটি শহরকে বাসযোগ্য হিসাবে গড়ে তুলতে কিছু সুস্পষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড রয়েছে। ডেনিশ স্থপতি ও নগরতাত্ত্বিক Jan Gehl রচিত ‘Cities for People’ গত দুই দশকে নগর পরিকল্পনা বিষয়ে অন্যতম প্রভাবশালী গ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জনকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে এটি একটি মৌলিক রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বাস্তব প্রয়োগের উদাহরণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কীভাবে একটি নগরকে আরও প্রাণবন্ত, নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই করে তোলা যায়। Gehl-এর মতে, একটি সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য শহর তখনই গড়ে ওঠে, যখন নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষ, তাদের চলাচল, সামাজিক যোগাযোগ, জনপরিসরে অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিক জীবনমানের উন্নয়ন।
জাতিসংঘের নগর ও মানববসতিবিষয়ক বিশেষায়িত সংস্থা ইউএন-হ্যাবিট্যাটের মতে, একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে মানসম্মত আবাসন, কার্যকর ও সাশ্রয়ী পরিবহণ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা, পর্যাপ্ত উন্মুক্ত ও সবুজ স্থান, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, নাগরিক নিরাপত্তা এবং দক্ষ ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ মানদণ্ডগুলোর আলোকে ঢাকা শহরের বর্তমান বাস্তবতা মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, শহরটি এখনো বাসযোগ্যতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূচকে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
ঢাকার বাসযোগ্যতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হয় অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপকে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসাবে ঢাকার প্রতি মানুষের আকর্ষণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্নত জীবনযাপনের প্রত্যাশায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানীমুখী হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ঢাকা মহানগর অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫৪ লাখে পৌঁছেছে। ফলে নগরীর ওপর জনসংখ্যার চাপ এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিদ্যমান অবকাঠামো, সেবাব্যবস্থা এবং পরিবেশগত সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আবাসন, পরিবহণ, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য এবং উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের মতো মৌলিক খাতে।
বাসযোগ্য নগরের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুদূষণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ মানের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ২০২৫ সালে ঢাকার গড় PM2.5 ঘনত্ব ছিল প্রায় ৬৮ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক মানদণ্ডের প্রায় ১৪ গুণ বেশি। ২০২৬ সালেরও বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে মাথাপিছু উন্মুক্ত ও সবুজ স্থানের পরিমাণ ১ বর্গমিটারেরও কম বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ন্যূনতম ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত স্থানের সুপারিশ করে। ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য, জনস্বাস্থ্য এবং নাগরিকদের মানসিক সুস্থতা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
পরিবহণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং যানজটও ঢাকার বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। উৎপাদনশীলতা হ্রাসের পাশাপাশি জ্বালানি অপচয়, বায়ুদূষণ এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধির মাধ্যমে এর নেতিবাচক প্রভাব নগরজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই অনুভূত হয়। প্রতিদিন কর্মস্থলে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করা ঢাকাবাসীর জন্য এক ধরনের স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব কিংবা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ না করাও ঢাকার বাসযোগ্যতা সংকটের একটি বড় কারণ। বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর জন্য মহাপরিকল্পনা, পরিবহণ পরিকল্পনা এবং বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়ন করা হয়েছে। সর্বশেষ ড্যাপে জলাধার সংরক্ষণ, উন্মুক্ত স্থান বৃদ্ধি, পরিকল্পিত আবাসন উন্নয়ন এবং প্রতিবেশভিত্তিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটিতে প্রতি সাড়ে ১২ বাসিন্দার জন্য খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হলেও বাস্তবে ঢাকা এখনো উন্মুক্ত স্থানের তীব্র সংকটে ভুগছে। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা কারণে এসব পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন প্রায়ই ব্যাহত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি প্রয়োজন, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার লক্ষ্যকে দুর্বল করে দেয়। ঢাকা শহরের উন্নয়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব একাধিক সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তদারকির ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি প্রায়ই দৃশ্যমান হয়। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ণের পরিবর্তে খণ্ডিত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন কার্যক্রম প্রাধান্য পায়, যা শহরের সামগ্রিক বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবে শুধু জনসংখ্যার আধিক্য, সমন্বয়হীনতা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দুর্বলতাই একমাত্র সমস্যা নয়। এর সঙ্গে নাগরিক আচরণ, জনসচেতনতা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং নগর শাসনের মানও সমানভাবে জড়িত। সড়কে ট্রাফিক আইন অমান্য করা, উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা, জলাশয় দখল কিংবা পরিবেশবিধি উপেক্ষা করার মতো আচরণগুলোও নগরের বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় নাগরিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একটি নগরের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা, অংশগ্রহণ এবং শহরকে ঘিরে তাদের সম্মিলিত স্বপ্নের মাধ্যমে। ঢাকাকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করতে হলে পরিকল্পনাবিদ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। নাগরিকদের চাহিদা, প্রত্যাশা এবং জীবনযাত্রার বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে গৃহীত নীতিমালা ছাড়া শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে একটি শহরকে বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব নয়।
খালিদ মাহমুদ : স্থপতি, নগর উন্নয়ন গবেষক
