Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

রাষ্ট্রযন্ত্রে পতিতদের শিকড় এখনো কতটা গভীরে

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্রযন্ত্রে পতিতদের শিকড় এখনো কতটা গভীরে

Advertisement

পতিত শেখ হাসিনার স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরে আসার বিষয় নিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তার কথোপকথনের একটি অডিওকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভেতরে পুরোনো রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানের ছড়িয়ে পড়া ওই অডিওতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন, পুলিশের সক্ষমতা, পুলিশ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং পুলিশে পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য শোনা যায়।

অডিওতে রাকিবুলের বক্তব্যের বিষয়বস্তু যাই থাকুক, ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থেকে সরকারি কর্মকর্তারা এখনো পুরোনো রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছেন কীভাবে? অডিওতে রাকিবুলের পরিচয় জানা গেলেও অপর প্রান্তের ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি অথবা প্রকাশ করা হয়নি। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে এটাই প্রতীয়মান হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশে যোগ দেওয়া বা পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের আওয়ামী লীগের প্রতি এখনো রাজনৈতিক আনুগত্য আছে কিনা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি অথবা উপেক্ষা করেছে। এ কারণেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুলিশের কর্মদক্ষতায় দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে কিনা, এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে।

পুলিশের এ ধরনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই কি তাহলে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে সাম্প্রতিক কয়েকটি সহিংস ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হয়েছে? বিএনপি সরকারের ২১০ দিনে কমপক্ষে ৩৭১ বার দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। নিজেদের সংগঠিত করতে তারা ব্যবহার করছে বিশেষ অ্যাপ। ফলে অনেক সময় গোয়েন্দাদের নজরদারি ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছে তারা। শুধু আগস্টেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের ব্যানারে ১৪৩টি ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে ছাত্রলীগ ৩১টি ঝটিকা মিছিল করেছে, আর আওয়ামী লীগের ব্যানারে ২২টি মিছিল ও ৩৬টি গোপন বৈঠক হয়েছে।

এ ধারাবাহিক ঘটনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানার প্রয়োজন আছে তা হলো-রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কীভাবে সংগঠিত হচ্ছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের পেছনে অর্থ, সাংগঠনিক সহায়তা ও যোগাযোগের উৎস কোথায়? একই প্রশ্ন প্রযোজ্য সিভিল প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতারা এসব কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করছেন বলে ইতোমধ্যেই শোনা গেছে। বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার দেশে ফেরাসহ বিভিন্নভাবে গুজব ছড়িয়ে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ‘উজ্জীবিত’ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশ মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যেসব পেজ বা লিংক থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) মাধ্যমে সেগুলো মুছে ফেলা (রিমুভ) হচ্ছে। বিটিআরসির মাধ্যমে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ৮৮৫টি লিংক অপসারণ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

এসব কার্যকলাপের পেছনে অর্থ জোগানের যে প্রশ্ন উঠেছে, সে ব্যাপারে আরও অনুসন্ধানের দরকার আছে। আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে যারা বর্তমান প্রভাবশালী নেতাদের লেজুড়বৃত্তি করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের কেউ কেউ এ অর্থ জোগানের পেছনে যে জড়িত নেই, তা কে জানে। এ ব্যাপারে আলাদাভাবে তথ্যানুসন্ধান করা উচিত। তাদের আর্থিক লেনদেন এবং যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন কী ফিরবেন না, সে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। ভারত ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশের অনুরোধে তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে না। তবে হাসিনা যদি স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চান, তাহলে বাধা দেবে না। ভারত তাদের এ বক্তব্যের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক কূটচাল চেলেছে। ভারত যদি বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ গ্রহণ করে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়, তাহলে সেটি হবে একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভারত সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। আবার যদি ভারত তাকে ফেরত না পাঠায় এবং শেখ হাসিনা নিজেই বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তাহলে ঘটনাটির রাজনৈতিক দায়ভার ভারত সরকারের ওপর সরাসরি বর্তাবে না। দিল্লি তখন বলতে পারবে, তাকে ভারত প্রত্যর্পণ করেনি; হাসিনা নিজের সিদ্ধান্তে দেশে ফিরেছেন। ফলে কূটনৈতিক দিক থেকে ভারত একটি ভিন্ন অবস্থানে থাকতে পারবে। এটি নিছক একটি কূটচাল নয়, এর পেছনে ভারতের হয়তো এমন কোনো কূটনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে, যা এখন প্রকাশ না করলেও সময় হলেই হয়তো কাজে লাগাতে পারবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের মাথায়ও রাখতে হবে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা উচিত। কারণ শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কেবল একটি ব্যক্তির দেশে ফেরার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে যাবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, বিচারিক প্রক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। যদি তাই ঘটে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি কীভাবে সামাল দেবে তা এখন থেকেই ঠিক করে রাখতে হবে।

তবে দেশে পরিস্থিতি দিন দিন যেদিকে যাচ্ছে, সরকারকে এখনই সতর্ক হতে হবে। এ কথা বলাই যায়, দেশে এখন একটি নৈরাজ্য পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চলছে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। পুলিশ প্রশাসনের ভেতর যে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়ে গেছে, ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুলের ঘটনাই প্রমাণ করেছে। ভাবতে অবাক লাগে, রাকিবুলের মতো একজন ওসিকে কোনোরূপ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়ন করা হয়েছে! এটি বলা অত্যুক্তি হবে না, রাকিবুলের ক্যান্টনমেন্ট থানায় বদলির পেছনে যাদের সংশ্লিষ্টতা আছে, তাদের বিষয়েও তদন্ত হওয়া উচিত।

এ কথা ঠিক, অনেক আগে থেকেই পুলিশে এক ধরনের বদলি বাণিজ্য চালু আছে। এ বাণিজ্য যে এখনো চলমান, তা রাকিবুলের অডিও বক্তব্যেও প্রকাশ পেয়েছে। অর্থ বড় কঠিন লোভ। প্রশ্ন হচ্ছে, এ অর্থের বিনিময়ে কি রাকিবুলের মতো কর্মকর্তাদের ভালো ভালো পদে জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে? আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশের অনেক কর্মকর্তাই বহু অর্থের মালিক হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, অর্থের বিনিময়ে এমন আর কতজন আওয়ামী ঘরানার পুলিশ কর্মকর্তাকে পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে? এ ‘বদলি কার্যক্রম’ দেশবিরোধী চক্রের বৃহত্তর চক্রান্তের অংশ কিনা দেখতে হবে। এ বিষয়েও পৃথক একটি তদন্ত হওয়া দরকার আছে বলে মনে করি। অনুসন্ধান করলে পুলিশের পাশাপাশি বেসরকারি প্রশাসনেও হয়তো এমন অনেক সিভিল আমলা পাওয়া যাবে, যারা নিয়মিত পতিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অথবা তাদের কোনো কন্টাক পয়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এ ব্যাপারেও সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তা না হলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যদি ঘটে, আশ্চর্য হব না।

আওয়ামী লীগ এবং প্রতিবেশী যে দেশটি তারেক রহমান এবং তার সরকারকে দুর্বল করতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে, তাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো, ধীরে ধীরে সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করা। কারণ তাদের সবচেয়ে বড় ভয় ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। আর তারেক রহমান এ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বিপুল ভোটে নির্বাচিত সরকারপ্রধান। তারা বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের জনগণের ভেতর যদি একবার ফাটল ধরাতে পারে, তাহলেই তারেক রহমানকে জনবিচ্ছিন্ন করা সহজ হবে। এজন্য তারা যা করার তাই করবে। বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কল্পনাতীত নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চেষ্টা করে যাবে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তাদের এ চেষ্টায় রাকিবুলের মতো লুকিয়ে থাকা লোকদেরও কাজে লাগানো হবে। ভবিষ্যতে সরকারের কোনো এক দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এসব সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে যে আরও একটি ‘জনতার মঞ্চ’ তৈরি করা হবে না, কে জানে। এটিকে হালকাভাবে নিলে চলবে না। এখনো সময় আছে। সরকারের সাত মাস পেরিয়ে গেছে। এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতে পারে।

পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় সরকারের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সম্ভাব্য অস্থিরতা মোকাবিলায় একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করা। প্রথমেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় বাড়িয়ে দেশের ভেতরে এবং বাইরে থেকে পরিচালিত সম্ভাব্য সাংগঠনিক তৎপরতার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও যোগাযোগের ধরন শনাক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদায়নগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে যেসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, সেগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সম্ভাব্য নাশকতা ও সহিংসতার পূর্বাভাস শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

এর পাশাপাশি সন্দেহজনক আর্থিক প্রবাহ, অবৈধ অর্থায়ন এবং দেশি-বিদেশি যোগাযোগ অনুসন্ধানে আর্থিক গোয়েন্দা ও সাইবার সক্ষমতা আরও কার্যকর করতে হবে। গুজব মোকাবিলায় সরকারের নিজস্ব তথ্যব্যবস্থাকে দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে, যাতে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা জনমনে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তবে এসব পদক্ষেপ অবশ্যই আইনের আওতায় এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে এনে এমন একটি পেশাদার কাঠামো নিশ্চিত করা, যাতে সরকারের যে কোনো দুর্বল মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করার সুযোগ না পায়।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম