Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

Icon

ড. মাহবুব হাসান

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

সরকারের প্রথম কাজ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। এর সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা। পুলিশের কর্মদক্ষতার চেয়েও তারা রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্টু বলে সন্ত্রাসী কাজ অবাধে চলতে পারছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী নেতাকর্মীরা চায় হাসিনা ফিরুক। আর হাসিনাকে ফেরাতে হলে দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করার লক্ষ্যে তারা তৎপর। বিভিন্ন জায়গায় আগুন দেওয়া, মিছিল করে জানান দেওয়া, বাস পোড়ানো, রাজনৈতিক গুজব সৃষ্টি করে ভয় দেখানো, কাঁচাবাজারে পণ্যের মূল্য বাড়ানো, সিন্ডিকেট করে মানুষের নিত্যদিনের স্পর্শকাতর বিষয়ে গুজব সৃষ্টি ইত্যাদি কাজ করছে অনেকেই। পুলিশের সামনেই কিশোর গ্যাং জমি দখলের হিংস্র অবৈধ কাজ করছে। অপরাধী চক্র অবাধে চলাফেরা করছে, তাদের পুলিশ ধরছে না। এ নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ। বিশেষ করে গ্রাম এলাকার লোকজন মনে করছে পুলিশ ইচ্ছা করেই এটা করছে। যেহেতু তারা ১৭/১৮ বছরের রাজনৈতিক সরকারের সহযোগী হিসাবে কাজ করেছে, এখনো তারা সেভাবেই নিজেদের কাজ করতে উৎসাহী।

অতি সম্প্রতি ঢাকার জাসদ অফিস থেকে ৩০০ লোককে আটক করে তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আবারও মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী দমনে তারা কি সেই ভূমিকা দেখাতে পারছে? বিশেষ করে কিশোর গ্যাংদের আটক করা, তাদের অপরাধ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা চালানো কি হচ্ছে? ঢাকার বেশিরভাগ বস্তি মাদকের ডেরা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকার সন্নিহিত এলাকার রেললাইন-সংলগ্ন বস্তিতে চলে মাদকের রমরমা ব্যবসা। সন্ত্রাসী ও গ্যাংস্টারদের মূল শক্তি হচ্ছে ওইসব মাদক-ডেরার কারবার। পুলিশ খুব ভালোভাবেই জানে বিষয়গুলো। কিন্তু কখনোই সেসব ডেরা থেকে মাদক সন্ত্রাসীদের আটকায় না। কেন তারা এতটা গা ছাড়াভাবে দায়িত্ব পালন করছে? কেন সরকারবিরোধী চক্র ওইসব মাদক ডেরার কারবারি সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়? পুলিশ কেন এর শেকড় উপড়ে ফেলে না? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন সন্ত্রাস নির্মূলে বিশেষ অ্যাকশনে যায় না?

পুলিশ ঘটনার পর কেন তৎপর হয়? ঘটনার আগে কেন তার শেকড় উপড়ে ফেলার কাজটি করে না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের প্রতি এত ক্ষোভ কেন জনমনে? অনেকেই মনে করেন, তিনি পুলিশ বাহিনী চালাতে পারছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তার ঢিলে-ঢালা কাজ তার কথার মতোই জোরহীন। তিনি জোর দিয়ে কথা বলতে পারছেন না কেন? এসব কেন এর উত্তর জানা নেই বলেই নানা গুজব সৃষ্টি হয়। তাকে আওয়ামী লীগের আমলে গুম করা হয়েছিল। তিনি ভারত থেকে ৬ বছর পর দেশে ফেরেন। তাকে হত্যা না করে ভারতে পাচার করার পেছনে আওয়ামী দস্যু লীগের কি উদ্দেশ্য ছিল? এসব তথ্য জনগণের জানা নেই বলেই অপতথ্য পল্লবিত হওয়ার সুযোগ পায়। এ সুযোগ কেন দিচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সরকার? সরকারের বয়স ৭ মাস হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ওই সময় কম নয়। তাহলে কি আমরা ধরে নেব আওয়ামী ফ্যাসিস্টের সময় যারা হাসিনাকে সেবা দিয়ে নিজেদের ইমেজকে ‘লেজুড়’ হিসাবে নির্মাণ করেছে, এখনো তারাই ওই বাহিনীতে আছে?

আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি। এর সঙ্গে জড়িত দেশের উন্নয়ন ধারা, এর সঙ্গে জড়িত বাজার অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়। সিন্ডিকেট ভেঙে সুশাসন কায়েম করা। সমাজে সুশাসন কায়েমে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। একে আমরা, অর্থাৎ আইনের শাসন হচ্ছে রাজনৈতিক সরকারের ব্যাকবোন বা শিরদাঁড়া।

অন্যদিকে দুর্ধর্ষ গ্যাং ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের চারণভূমি হিসাবে পরিচিত মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই অরক্ষিত। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকার একাধিক হাউজিং প্রজেক্ট, সরকারি খাসজমি এবং প্রবাসীদের বিরোধপূর্ণ জমি দখলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম বারবার সামনে আসে। এলাকার কিশোর গ্যাং ও ক্যাডারদের দিয়ে রাজনৈতিক দলের ব্যানার ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের সব ধরনের অপচেষ্টা চালানো হয়। এতে জমির মালিক ও ব্যবসায়ীরা মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশ গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করেছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এই হচ্ছে বা হবে শব্দগুলো গৎ-বাধা। এগুলো কেউ বিশ্বাস করে না। হচ্ছে শব্দটি যদি হয়েছে করে তোলা যায়, তাহলেই শুধু মানুষ বিশ্বাস করবে।

মাদক আর অস্ত্র, দুই সহোদর-একে অন্যকে অবলম্বন করে চলে চালায় গ্যাংস্টাররা। এই গ্যাংস্টাররা থাকে কেউ জেলখানায়, কেউ পলাতক বিদেশে। সেই বিদেশ ভারতও হতে পারে, আবার সুইডেনও হতে পারে। তাতে কিছুই আসে যায় না। সেলুলার ফোন, এনকিপটেড হোয়াটসঅ্যাপ তো আছেই। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

অপরদিকে নিউ গিনি প্রোপার্টিজের জমির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী যোগাযোগ করেন বিদেশে পলাতক আওয়ামী ঘরানার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। ঢাকার অপরাধ জগতের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেন দীর্ঘদিন বিদেশে আত্মগোপনে থেকে আন্তর্জাতিক কল বা ইন্টারনেট অ্যাপের মাধ্যমে ক্যাডারদের পরিচালনা করে আসছেন। মিরপুর, পল্লবী, ক্যান্টনমেন্ট, মোহাম্মদপুর এবং কাফরুল এলাকায় সন্ত্রাসী পাঠিয়ে চাঁদাবাজি ও অবৈধ জমি দখল পরিচালনা করা তার মূল কাজ। ইসিবি চত্বরের বিরোধপূর্ণ জমিটি মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষ হয়ে দখলের জন্য সন্ত্রাসী শাহাদাতকে যুক্ত করা হয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে শাহাদাত তার নিজস্ব দুই শতাধিক ক্যাডারকে অস্ত্রশস্ত্রসহ সেখানে পাঠিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও স্টুডিও তছনছ করান। নেতৃত্ব দেন শাহাদাতের বিশ্বস্ত শুটার সোহেল। হামলা ও ভাঙচুরের পর সুপরিকল্পিতভাবে সেটিকে ‘বিএনপি বা যুবদলের চাঁদাবাজি’ হিসাবে ফেসবুক লাইভ ও মিডিয়ায় প্রচারের কৌশল নেওয়া হয় বলেও জানা যায়।

যুগান্তরে প্রকাশিত এ রিপোর্টকে যদি সত্য বলে ধরি, তাহলে প্রশ্ন ওঠবে, সরকারের পুলিশ কি করছে? শুটার সোহেল ও তার সঙ্গে যে ২০০ সন্ত্রাসী একটি জায়গা দখলে নিতে যায়, তখনো পুলিশ অবাক হয়ে দেখতে থাকে। তারা এদের সবাইকে চেনে। সন্ত্রাসীরা ওখানকার পুলিশকে ম্যানেজ করেছে। কথা হলো পুলিশ কেন ম্যানেজ হবে সন্ত্রাসীদের দেওয়া টাকায়? কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে। সন্ত্রাসীর পরিচয় সে সন্ত্রাসী। এখানেই মূল প্রশ্ন।

আর সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ইন্টারনেট ওয়েব বা হোয়াটঅ্যাপ ব্যবহার করে শাহাদাতের মতো শীর্ষ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা দেশের ভেতরে থাকা শুটার সোহেল ও কিশোর গ্যাং চালায়, আর পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, সাদা পোশাকের পুলিশ তারা কি ঘুমায়? ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের খাঁটি শর্ষের তেল নিশ্চয় কিশোর গ্যাংয়ের মনে সৌরভ দিয়েছে।

দেশের সর্বত্রই চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কাজ করে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট লীগ, আর দুর্নাম চাপায় বিএনপির নামে। সেটাই সহজ কায়দা। লোকেরা বিশ্বাস করে ১৭ বছর কিছু করতে পারেনি, তাই দল ক্ষমতায় গেছে, এখনই তো লুটে খাওয়ার সময়। হাসিনার লুটেপাটের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাজ দিয়ে শান্ত রাখা। স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়নের ব্যবস্থাপনায় তাদের কাজ দেওয়া হতো, জনপ্রতি ২ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ। ১৭ বছরে নেতাকর্মীরা যা লুটেছে, না লুটতে পারলে দেশের কোনো সড়কের অবস্থা এমন করুণ হতে পারত না। বিএনপি বোকা-সোকাদের দল, কীভাবে লুটতে হয়, তাও জানে না। কিন্তু দুর্নাম নিতে তাদের কোনো অসুবিধা নেই।

ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : সম্ভাবনা, সংকট ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : সম্ভাবনা, সংকট ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

অন্যমত জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম