Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

অভিবাসীবান্ধব সিটিগুলোতেও নতুন আতঙ্ক

Advertisement

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে অভিবাসন সংক্রান্ত নতুন নতুন বিধিবিধান এবং সেগুলো প্রয়োগের উপায়-পদ্ধতি। এদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সিংহভাগই যেহেতু অ্যাসাইলাম বা প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বৈধতা লাভ করেছেন এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যকের আবেদন বিবেচনাধীন রয়েছে এবং অবৈধ উপায়ে বসবাস করছেন, অতএব সংগত কারণেই তারা সার্বক্ষণিক উদ্বেগের মধ্যে থাকেন-কখন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অভিবাসন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ‘ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি’ বা ‘আইস’ তাদের আটক করে হাতকড়া পরিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করার পর তাদের এ উদ্বেগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রয়োগের পর গত জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বাংলাদেশি অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সাড়ে তিন দশকেও এত বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি বহিষ্কারের আওতায় আসেনি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক, গ্রিনকার্ডধারী, ওয়ার্ক পারমিটধারী, স্টুডেন্ট ভিসাসহ অন্য ক্যাটাগরির ভিসাধারী এবং আনডকুমেন্টেড বা অবৈধ মিলে আনুমানিক তিন লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। এটা পিউ রিসার্চ সেন্টারের হিসাব। আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬৪, যা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৪ কোটি ৬২ লাখ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মাত্র ০.৬ শতাংশ। বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রায় অর্ধেকই বাস করেন নিউইয়র্ক সিটিতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসীর বসবাস ক্যালিফোর্নিয়ার জনবহুল সিটি লস অ্যাঞ্জেলেসে। বাকিরা অন্য বড় সিটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাস করেন। এসব সিটির অধিকাংশই ডেমোক্রেট দলের নিয়ন্ত্রিত এবং সেসব শহরে অবৈধ অভিবাসীরাও নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারেন, যদি তারা কোনো অপরাধে জড়িত না হন। সিটি প্রশাসন তাদের আইডি কার্ড ইস্যু করে; বিনা ওয়ার্ক পারমিটে যাদের কাজ করার অনুমতি নেই, তারাও এসব সিটিতে কাজ করতে পারে, চিকিৎসা সুবিধা নিতে পারে এবং পাবলিক স্কুলে তাদের সন্তানরা পড়াশোনাও করতে পারে। অভিবাসীদের জন্য ডেমোক্রেট নিয়ন্ত্রিত এ সিটিগুলো ‘স্যাঙ্কচ্যুয়ারি সিটি’ বা ‘অভয়াশ্রম নগরী’ হিসাবে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের আইন প্রয়োগকারীরা অবৈধ ও অপরাধে অভিযুক্ত অভিবাসীদের শনাক্ত ও আটক করার ক্ষেত্রে স্যাঙ্কচ্যুয়ারি সিটিগুলোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সহযোগিতা পায় না। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী এজেন্সির জনবল বৃদ্ধি করে প্রধান প্রধান স্যাঙ্কচ্যুয়ারি সিটিতে অবৈধ ও অপরাধে অভিযুক্ত অভিবাসীদের আটকাভিযান জোরদার ও দ্রুততর করতে। এ জন্য সর্বাধিকসংখ্যক অভিবাসীর আবাসস্থল নিউইয়র্কে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীসহ সামগ্রিকভাবে অভিবাসী কমিউনিটির মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করার পর থেকে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে সব ধরনের অভিবাসীর জন্য তিনি আতঙ্ক হয়ে উঠেছেন। তার নির্বাহী আদেশে স্থির করে দিয়েছেন কোন কোন দেশের নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাসাইলামের জন্য আবেদন করতে পারবে। এর পাশাপাশি আবেদন প্রক্রিয়া এবং যাচাই-বাছাই পদ্ধতিও কঠোর করা হয়েছে। এর ফলে ট্রাম্পযুগে অ্যাসাইলাম আবেদনকারীর আবেদন অনুমোদনের হার অনেক হ্রাস পেয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে অ্যাসাইলাম আবেদন অনুমোদন হার ছিল বার্ষিক গড়ে পাঁচ হাজারের মতো। অ্যাসাইলাম আবেদনের সংখ্যাবৃদ্ধির পাশাপাশি ২০১০-এর দশক থেকে অনুমোদন হারও বৃদ্ধি পায় এবং ২০২৩ সালে অ্যাসাইলাম আবেদন অনুমোদন পায় ৫৪ হাজারের বেশি। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া কঠোর হওয়ায় অ্যাসাইলাম অনুমোদন হার অনেক হ্রাস পেয়েছে। ফলে বিবেচনাধীন আবেদনের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেত, যদি ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর মেক্সিকো সীমান্ত ডিঙিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী অনুপ্রবেশের জোয়ার বন্ধ না করতেন। ‘ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশনে’র দাবি অনুযায়ী পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী অনুপ্রবেশ ৯০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পাঁচ বছরে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে ১ কোটি ১০ হাজার বিদেশি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে; কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শপথ গ্রহণ করার পরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অবৈধ অভিবাসনবিরোধী তার নতুন নির্বাহী আদেশ জারির পর ফেব্রুয়ারিতেই সীমান্ত অনুপ্রবেশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৩৪৭-এ।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এবং ইমিগ্রেশন আদালতগুলোতে বিবেচনাধীন অ্যাসাইলাম আবেদন সংখ্যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৯ লাখের অধিক। এর মধ্যে ইউএসসিআইএসে রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ এবং ইমিগ্রেশন আদালতগুলোতে রয়েছে ২২ লাখ ৮০ হাজার। এ জট নিরসনে প্রশাসন কুলকিনারা করতে না পারলেও প্রতিবছর জট বাড়ছে। শুধু অ্যাসাইলাম আবেদন নয়, শরণার্থী কোটায় যুদ্ধ ও দাঙ্গাবিধ্বস্ত দেশগুলো থেকে আবেদন বিবেচনাও কঠোর করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী গ্রহণ সীমিত করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন স্থির করেছে, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র সাড়ে ৭ হাজারের বেশি শরণার্থী গ্রহণ করবে না, যা শরণার্থী গ্রহণের ক্ষেত্রে ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বনিু। ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দাদের শরণার্থী হিসাবে গ্রহণ করতে যতটা আগ্রহী, বিশ্বের অন্য কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে শরণার্থী গ্রহণে ততো আগ্রহী নন। বাইডেন প্রশাসন ২০২৪ সালে শরণার্থী গ্রহণ করেছিল ১ লাখের বেশি। একই বছরে ইউএসসিআইএস ও ইমিগ্রেশন আদালতগুলো থেকে প্রায় ৭০ হাজার অ্যাসাইলাম প্রার্থীর আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। ২০২৩ সালে অনুমোদন পেয়েছিল প্রায় ৫২ হাজার অ্যাসাইলাম প্রার্থী। কিন্তু ২০২৫ ও ২০২৬ সালে, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউজে যাওয়ার পর অ্যাসাইলাম আবেদন অনুমোদনের হার ঐতিহাসিকভাবে কম।

‘স্টেট অব ইমিগ্রেশন রিপোর্ট’ ও ‘টিআরএসি’র (ট্রানজ্যাকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিং হাউজ) রিপোর্ট অনুযায়ী ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অ্যাসাইলাম প্রার্থীর ভাগ্য নির্ভর করে সম্পূর্ণভাবে ইমিগ্রেশন আদালতের বিচারকদের ওপর; আবেদনকারী কোন দেশের নাগরিক ও তাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আবেদনের ধরন, আবেদনের সময় এবং আবেদনে অ্যাসাইলামের জন্য যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়, সেসব কারণের যথার্থতা প্রমাণের শক্তিশালী দলিলের ওপর। ট্রানজ্যাকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিং হাউজের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশি অ্যাসাইলাম আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে ১ হাজার ৪২৭ জন বাংলাদেশির অ্যাসাইলাম আবেদন বিবেচনা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে যারা অভিবাসন আইনজীবীদের তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে দিয়েছে, তাদের আবেদনের ৪৪.৯ শতাংশ নাকচ হয়েছে। অন্যদিকে, যারা তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কোনো আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারেনি, তাদের ৮৯.৮ শতাংশ আবেদন নাকচ হয়েছে। অধিকাংশ বাংলাদেশি অ্যাসাইলাম প্রার্থীর পক্ষে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা সম্ভব হয় না আইনজীবীদের উচ্চ ফি-এর কারণে। তারা নিজেরাই সরাসরি আবেদন করেন এবং ইন্টারভিউয়ে অ্যাসাইলাম অফিসারের মুখোমুখি হন। বেশিরভাগের ক্ষেত্রে ইংরেজি জ্ঞানের স্বল্পতা অথবা সদ্য যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের কারণে আমেরিকান ইংরেজি উচ্চারণ বুঝতে না পারার কারণে ইন্টারভিউয়ে ভালো করতে পারেন না। অ্যাসাইলাম অফিসাররা তাৎক্ষণিকভাবে আবেদন নাকচ করেন অথবা ইমিগ্রেশন আদালতে পাঠিয়ে দেন। আদালতের শুনানিতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং অ্যাসাইলাম প্রার্থীর ওপর বহিষ্কারের খক্ষ নেমে আসে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ফিরে আসার পর ২০২৫ সালে ৫ লাখ ২৭ হাজারেরও বেশি অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ‘আইস’ বহিষ্কার করেছে ৩ লাখ ৪০ হাজার। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রায় ২০ লাখ অবৈধ ও অপরাধী অভিবাসীকে বহিষ্কার করতে বদ্ধপরিকর। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ১ কোটি ২০ হাজারের অধিক আনডকুমেন্টেড বা কাগজপত্রবিহীন অভিবাসী রয়েছে।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : সিনিয়র সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

নিউইয়র্কের চিঠি অভিবাসীবান্ধব সিটিগুলোতেও নতুন আতঙ্ক

অভিবাসীবান্ধব সিটিগুলোতেও নতুন আতঙ্ক

অক্টোবর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’

অক্টোবর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম