Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

Advertisement

Icon

সাজ্জাদ সাব্বির

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

Advertisement

কুমিল্লায় ১৩ বছরের অপ্রতীমকে হত্যার পর তার মা নাহিদা বেগমের মুখ থেকে ভয়াবহ হতাশার সুরই ভেসে এসেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ফাঁসি চাই না, দেশটা তলিয়ে যাক।’ গত মে মাসে পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার পর তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।’ আর শহীদ শরীফ ওসমান হাদির বিচার নিয়ে তার পরিবারের আইনজীবী আদালতে জানিয়েছেন, হাদি জীবিত অবস্থাতেই নিজের হত্যার পর ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতেন।

এই বাক্যগুলোর মধ্যে মানুষের একটি সাধারণ অনুভূতি ও ক্ষোভ আছে। মানুষ অপরাধের শিকার হওয়ার পর রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা ও বিচার চায়। যখন সেই জায়গায় তার মনে হয় অপরাধী ধরা পড়লেও শেষ পর্যন্ত বিচার হবে না, মামলা বছরের পর বছর চলবে, সাক্ষী হারিয়ে যাবে, তদন্ত আটকে থাকবে অথবা আসামি জামিনে বেরিয়ে যাবে, তখন রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ওপর মানুষের বিশ্বাস দুর্বল হয়।

বাংলাদেশে এ অবিশ্বাসের পেছনে বাস্তব অভিজ্ঞতাও আছে অহরহ। সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ১৪ বছর পরও তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ১২৫ বার বাড়ানো হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা আদালতে জানান, তদন্তকারী টাস্কফোর্স এখনো গুরুত্বপূর্ণ নথি ও প্রমাণের ঘাটতিতে রয়েছে।

সোহাগী জাহান তনু হত্যার দশ বছর পূর্ণ হয়েছে। মামলায় ৭৮টি শুনানির পরও গ্রেফতার বা বিচার এগোয়নি। তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী, সাগর রুনি, তনু ও মসারাত জাহান মুনিয়া হত্যার মতো দীর্ঘদিন অমীমাংসিত আলোচিত মামলাগুলো নিয়েও ২০২৬ সালে নাগরিক সমাবেশে বক্তারা বিচারহীনতার সংস্কৃতির কথা বলেছেন। অন্যদিকে আদালতে মামলা পৌঁছালেই যে বিচার নিশ্চিত হয়, সেই ধারণাটিও বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় মেলে না। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় গবেষণায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় দণ্ডের হার মাত্র ৩ শতাংশ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাসের তথ্য উঠে এসেছে।

মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রেও ব্যবধানটি বড়। অধিকারের তথ্যের ভিত্তিতে ২০১০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৩ হাজার ৮৭৬টি মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে, অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ২৪২টি। একই সময়ে কার্যকর হয়েছে ৪৭টি মৃত্যুদণ্ডের রায়। অর্থাৎ বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের ৯৮ শতাংশের বেশি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। উচ্চ আদালতে বেশিরভাগ মামলায় মৃত্যুদণ্ড কমে যাওয়া, পরিবর্তন বা বাতিল হওয়ার কারণেই এমন চিত্র দেখা গেছে। এখানে উল্লেখ্য, এ ৪৭ জনের মধ্যে শেখ মুজিবর রহমানের হত্যাকাণ্ড ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অপরাধে ১২ জন সাজাপ্রাপ্তও আছে।

বিপরীতে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বছর ৩ হাজার থেকে ৪ হাজারটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং এ সময়ে মোট খুনের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এর সঙ্গে আছে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার প্রশ্ন। ২০০১ সাল থেকে ২০১৩ সালের সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী ৩০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাজা রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমায় মওকুফ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে হাইকোর্ট ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমা, সাজা কমানো বা স্থগিত করার পূর্ণ নথি প্রকাশ না করার বিষয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

আবার জামিনও বিচারব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। গ্রেফতার মানেই দোষী নয়। আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে জামিন দিতে পারেন। কিন্তু তদন্ত দুর্বল হলে, বছরের পর বছর চার্জশিট না হলে, সাক্ষী হাজির না হলে অথবা জামিনের পর মামলার বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠলে মানুষের চোখে আইনের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

এই জায়গায় বিচারহীনতা একটি সামাজিক আচরণ তৈরি করতে পারে। মানুষ যখন মনে করে রাষ্ট্র অপরাধীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না, তখন কেউ কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে ন্যায্য ভাবতে শুরু করে। ২০১৯ সালে ধর্ষণ মামলার আসামিদের ধারাবাহিকভাবে হত্যার ঘটনায় ‘হারকিউলিস’ নামে একটি রহস্যময় গোষ্ঠীর আলোচনা তৈরি হয়েছিল।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, অপরাধীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল এবং তাদের হত্যা বেআইনি। মানবাধিকারকর্মীরাও তখন বিচারব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস বাড়ার আশঙ্কা জানিয়েছিলেন। এটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর একপর্যায়। কারণ আইনের শাসন তখন মানুষের কাছে নীতিগত ধারণা থাকে না, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় হয়ে যায়।

এশিয়া ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের জাতীয় জরিপে মাত্র ২০ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা পুলিশকে উচ্চ সততার প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখেছেন। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২২ সালে বিচার বিভাগের জন্য হারটি ছিল ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ। একটি ছোট একাডেমিক গবেষণাতেও ৭৬ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা আদালতের জবাবদিহিমূলক সক্ষমতাকে কম বা গড় মানের বলে মূল্যায়ন করেছেন। গবেষণাটির নমুনা মাত্র ৫২ জন, তাই জাতীয় মতামতের প্রতিচ্ছবি হিসাবে এটি ব্যবহার করা যায় না। তবে বিচারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের একটি গবেষণামূলক সংকেত হিসাবে এর মূল্য আছে।

রাষ্ট্রের বৈধতা অনেকাংশে নির্ভর করে নাগরিকের এ বিশ্বাসের ওপর যে অন্যায় হলে সে প্রতিকার পাবে। অপরাধী প্রভাবশালী হোক বা সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক পরিচয় থাকুক বা না থাকুক, তার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে এবং প্রমাণ থাকলে বিচার হবে। এ বিশ্বাস ভেঙে গেলে মানুষ শুধু আদালতের ওপর আস্থা হারায় না। পুলিশ, প্রশাসন, রাজনীতি এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিও তার আস্থা ক্ষয় হতে থাকে। রামিসার বাবার কান্না, অপ্রতীমের মায়ের ক্ষোভ, সালমান মুক্তাদিরের আইনের প্রতি অবিশ্বাস কিংবা হাদির ন্যায়বিচারের আকুতি এগুলো নাগরিকের রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশার বিপরীতে আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।

এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উত্তরও হওয়া উচিত, কথা দিয়ে নয়, দ্রুত ও দৃশ্যমান ন্যায়বিচার দিয়ে প্রমাণ করা যে আইন এখনো কার্যকর। কারণ মানুষ যখন আদালতের দরজা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন রাষ্ট্রের হাতে শেষ পর্যন্ত পড়ে থাকে শুধু আইন। আর আইনের ওপর মানুষের বিশ্বাস না থাকলে সেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্বও ধীরে ধীরে ফাঁপা হয়ে যায়। বিচারহীনতার শেষ প্রান্তে তাই শুধু অপরাধীর দুঃসাহস থাকে না। সেখানে তৈরি হয় আস্থাহীন নাগরিক।

সাজ্জাদ সাব্বির : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

ভারতের নির্বাচন কমিশনের কেলেঙ্কারি ফাঁস

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আস্থার সংকট

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম