Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব বাড়াতে হবে

Advertisement

Icon

ড. আল-মামুন

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব বাড়াতে হবে

Advertisement

খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আর এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় দূরদর্শী বিনিয়োগের বিকল্প নেই।

জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমির সংকোচন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যের টেকসই জোগান নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবনেই নিশ্চিত হবে আগামীর পুষ্টি’ কেবল উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান নয়; বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কার্যকর নীতির সমন্বয়ে এমন একটি খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়, যার সুফল পৌঁছাবে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে।

স্বাধীনতার পর দেশের কৃষি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭২-৭৩ সালে দেশে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল প্রায় এক কোটি টন, যা বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ে জনসংখ্যা প্রায় আড়াইগুণ বৃদ্ধি এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও খাদ্য উৎপাদনে এ সাফল্য সম্ভব হয়েছে উন্নত জাতের বীজ, সেচ সম্প্রসারণ, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কৃষির সক্ষমতার পরিচায়ক।

তবে খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য অর্জন করলেই পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। মানুষের সুস্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজন বৈচিত্র্যময়, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য এবং তা কেনার সামর্থ্য। ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূলের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতার পাশাপাশি পুষ্টিশিক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশও অপরিহার্য। বাজারে পুষ্টিকর খাদ্য থাকলেও নিম্ন-আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকলে সেই প্রাপ্যতা অর্থবহ হয় না। তাই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যের সাশ্রয়ী মূল্য, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টিকর খাদ্যের ন্যায্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাকে জাতীয় কৃষি ও খাদ্যনীতিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাংলাদেশের কৃষি এখন বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে। হাওড়, উপকূল, চর ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষি পরিস্থিতি এক নয়। এ ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা এবং প্রতিকূলতা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন, রোগবালাই প্রতিরোধী, অধিক উৎপাদনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

জেনেটিক্স, জিনোমিক্স, মার্কার সহায়ক নির্বাচন, জেনোমিক সিলেকশন, জিন এডিটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যনির্ভর কৃষি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণ, জাত উন্নয়নের সময় কমানো, রোগবালাইয়ের পূর্বাভাস এবং পানি ও সারের দক্ষ ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, পরিবেশগত নিরাপত্তা, ব্যয় সাশ্রয়িতা ও কৃষকের বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে। আধুনিক গবেষণার সঙ্গে স্থানীয় জাত, কৃষকের অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত জ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই উদ্ভাবন অধিক কার্যকর হবে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। অথচ ভবিষ্যতের খাদ্যচাহিদা পূরণে উর্বর কৃষিজমি সংরক্ষণ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পানির দক্ষ ব্যবহার এবং ফসলের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। কৃষিজমির অপরিকল্পিত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পতিত জমির কার্যকর ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

কৃষিশিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে আধুনিক কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে তরুণদের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। কৃষিকে শুধু প্রথাগত পেশা হিসাবে নয়, বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তাভিত্তিক সম্ভাবনাময় খাত হিসাবে গড়ে তুলতে হবে।

কৃষি গবেষণার সার্থকতা শুধু নতুন জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে কৃষকের মাঠে তার কার্যকর প্রয়োগের ওপর। একটি উদ্ভাবন কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় কতটা বাড়ায়, উৎপাদন ব্যয় ও ঝুঁকি কতটা কমায় এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কী ভূমিকা রাখে তার ভিত্তিতে গবেষণার বাস্তব প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা ধান, গম, ভুট্টা, পাট, আখ, চা, ফল, সবজি, আলু, মসলা, ডাল ও তেলজাতীয় ফসলসহ বিভিন্ন ফসলের ১,১৫১টি জাত এবং ১,৮১১টি কৃষি উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এসব উদ্ভাবন কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

কৃষি গবেষণার অগ্রগতি নির্ভর করে দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানীদের ওপর। এজন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত গবেষণা অর্থায়ন, আধুনিক অবকাঠামো এবং পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা। গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সময়োপযোগী নিয়োগ, যোগ্যতাভিত্তিক পদোন্নতি, গবেষণা প্রণোদনা এবং উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে।

পাশাপাশি বিজ্ঞানীদের বিধিসম্মত অবসরকালীন সুবিধা নিশ্চিত করা এবং অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে তরুণ গবেষকদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ। উৎপাদন পর্যায়ে উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ, নিরাপদ বীজের ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ, বালাইনাশকের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন শুধু জনস্বাস্থ্য রক্ষা করে না; এটি ভোক্তার আস্থা এবং কৃষিপণ্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ায়।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতায় কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। দেশীয় বীজ ও কৃষিযন্ত্র উৎপাদন, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, আধুনিক সংরক্ষণাগার এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। ভর্তুকি ও অন্যান্য নীতিসহায়তা প্রণয়নে কৃষকের স্বার্থ, বাজারের বাস্তবতা এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক বিধিবিধান বিবেচনায় রাখতে হবে।

কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য গবেষণা ও উদ্ভাবনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং গবেষণার ফলাফল মূল্যায়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা জরুরি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও সম্প্রসারণ সংস্থার সমন্বয়ে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

গবেষণায় বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার, উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতার মতো সূচকের ভিত্তিতে অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্য অপচয় কমানো, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ওপর কৃষির চাপ হ্রাসকে উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও বাজারব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় ছাড়া সর্বজনীন পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জন সম্ভব নয়।

বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল তাৎপর্য হলো খাদ্য উৎপাদনের সাফল্যকে সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তায় রূপান্তর করা। বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি, জলবায়ু সহনশীল উদ্ভাবন, কৃষকের ন্যায্য অধিকার এবং কৃষি গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিবিজ্ঞানীদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকার, গবেষক, কৃষক, উদ্যোক্তা ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ এবং গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

কৃষিবিদ ড. আল-মামুন : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ইউটিউবের ভিডিও দেখে আনারকলি চাষ, মিঠুর নতুন স্বপ্ন

ইউটিউবের ভিডিও দেখে আনারকলি চাষ, মিঠুর নতুন স্বপ্ন

আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

ন্যানো ফার্টিলাইজার কী, ব্যবহার হয় কীভাবে?

ন্যানো ফার্টিলাইজার কী, ব্যবহার হয় কীভাবে?

কারখানায় হাতে-কলমে শেখাচ্ছে বাপা, প্রশিক্ষণ ছড়িয়েছে দেশজুড়ে

কারখানায় হাতে-কলমে শেখাচ্ছে বাপা, প্রশিক্ষণ ছড়িয়েছে দেশজুড়ে

যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি ছেড়ে কৃষিতে, এখন বছরে আয় ‘৬০০ কোটি রুপি’

যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি ছেড়ে কৃষিতে, এখন বছরে আয় ‘৬০০ কোটি রুপি’

মৎস্য উৎপাদনে মান নিশ্চিত করে রপ্তানি বাড়াতে হবে: কৃষিমন্ত্রী

মৎস্য উৎপাদনে মান নিশ্চিত করে রপ্তানি বাড়াতে হবে: কৃষিমন্ত্রী

আরও পড়ুন

পূর্ণ শক্তির সার্ক আগের চেয়েও জরুরি

পূর্ণ শক্তির সার্ক আগের চেয়েও জরুরি

সুন্দরবনে হারানো নগরী : ইতিহাসের আরেক অধ্যায়

সুন্দরবনে হারানো নগরী : ইতিহাসের আরেক অধ্যায়

কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব বাড়াতে হবে

কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব বাড়াতে হবে

শতফুল ফুটতে দাও মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম