Logo
Logo
×
   

Advertisement

দৃষ্টিপাত

মাদ্রাসার নৈতিক শক্তি, কর্মদক্ষতার নতুন দিগন্ত: বাংলাদেশের অর্থনীতির অপ্রকাশিত মানবসম্পদ

Advertisement

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

মাদ্রাসার নৈতিক শক্তি, কর্মদক্ষতার নতুন দিগন্ত: বাংলাদেশের অর্থনীতির অপ্রকাশিত মানবসম্পদ

Advertisement

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। লাখ লাখ পরিবারের সন্তান মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। তাদের একটি বড় অংশ এসেছে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। অনেক পরিবার নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে মাদ্রাসায় পাঠায়। এই শিক্ষার প্রতি তাদের গভীর আস্থা আছে। সেই আস্থাকে সম্মান করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। মাদ্রাসা শিক্ষা কোনোভাবেই অপ্রয়োজনীয় শিক্ষা নয়। বরং ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের নৈতিকতা, আত্মসংযম, দায়িত্ববোধ, সততা, মানবিকতা এবং স্রষ্টার প্রতি জবাবদিহির চেতনা শক্তিশালী করতে পারে। একজন মানুষ যদি সত্যবাদিতা, আমানতদারি, পরোপকার, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বোধের শিক্ষা লাভ করে, তবে তা তার ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক জীবনের জন্য বড় সম্পদ।

সমস্যা অন্য জায়গায়।

সমস্যা হলো—এই শক্তিশালী নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে যদি আধুনিক জীবন ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় জ্ঞান যুক্ত না হয়, তাহলে বিপুল সম্ভাবনাময় একটি জনগোষ্ঠীর বড় অংশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে।

আজকের পৃথিবী জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির পৃথিবী। এখানে শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন দক্ষতা। শুধু জ্ঞান নয়, প্রয়োজন সেই জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষমতা। শুধু নৈতিকতা নয়, প্রয়োজন নৈতিকতার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সমন্বয়।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রয়োজন রয়েছে।

মাদ্রাসার ছাত্ররা বোঝা নয়, বিশাল সম্ভাবনার সম্পদ

আমাদের সমাজে কখনো কখনো মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা খোঁজার আগে তাদের শক্তি দেখতে হবে।

এই তরুণদের বড় একটি অংশ শৈশব থেকেই কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে বেড়ে ওঠে। তারা দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করে। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে। আত্মসংযমের শিক্ষা পায়। দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হয়।

তাদের অনেকের জীবনযাপন সাধারণ। চাহিদা সীমিত। পরিশ্রম করার মানসিকতা প্রবল। কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও অনেকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব গুণ একটি দেশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।

একজন তরুণের মধ্যে যদি নৈতিকতা থাকে, পরিশ্রমের মানসিকতা থাকে, শৃঙ্খলা থাকে এবং তার সঙ্গে আধুনিক কর্মদক্ষতা যুক্ত হয়, তাহলে সে শুধু নিজের জীবন পরিবর্তন করবে না। সে তার পরিবারকেও পরিবর্তন করবে। তার পরিবার থেকে পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়বে সমাজে। শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তন জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।

অতএব, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে সমস্যা হিসেবে দেখার পরিবর্তে জাতীয় মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

ধর্মীয় শিক্ষা ও কর্মমুখী শিক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন

আমাদের সামনে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষা কীভাবে কমানো যায়, তা নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে কীভাবে কর্মমুখী শিক্ষা যুক্ত করা যায়।

একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী কুরআন-হাদিস পড়বে। আরবি ও ইসলামী জ্ঞান অর্জন করবে। পাশাপাশি সে গণিত শিখবে। বিজ্ঞান শিখবে। তথ্যপ্রযুক্তি শিখবে। ইংরেজি শিখবে। যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করবে।

সে কম্পিউটার চালাতে পারবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবে। অনলাইন ব্যবসা করতে পারবে। হিসাবরক্ষণ শিখবে। উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ পাবে।

কেউ হবে দক্ষ কারিগর। কেউ হবে উদ্যোক্তা। কেউ হবে শিক্ষক। কেউ হবে আইটি পেশাজীবী। কেউ হবে অনুবাদক। কেউ কাজ করবে ব্যাংকিং বা হিসাব ব্যবস্থাপনায়। কেউ কৃষি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হবে। কেউ ই-কমার্সে যুক্ত হবে।

অর্থাৎ মাদ্রাসার ছাত্রের পরিচয় শুধু ‘ধর্মীয় শিক্ষার্থী’—এখানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার পরিচয় হবে—নৈতিক ও দক্ষ নাগরিক।

কর্মদক্ষতা ধর্মীয় মূল্যবোধকে দুর্বল করে না

এখানে একটি ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। অনেকেই মনে করেন, আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা কর্মমুখী শিক্ষা যুক্ত হলে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। বরং নৈতিক শিক্ষা ও কর্মদক্ষতার সমন্বয় একটি শক্তিশালী সমাজ তৈরি করতে পারে। কারণ দক্ষতা মানুষকে কাজ করার ক্ষমতা দেয়। আর নৈতিকতা তাকে সেই ক্ষমতা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখায়।

একজন দক্ষ কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ যদি নৈতিক হন, তাহলে তার দক্ষতা সমাজের জন্য কল্যাণকর হবে। একজন ব্যবসায়ী যদি নৈতিক হন, তাহলে তিনি প্রতারণার পরিবর্তে বিশ্বাসযোগ্য ব্যবসা গড়ে তুলবেন। একজন হিসাবরক্ষক যদি আমানতদার হন, তাহলে দুর্নীতির সম্ভাবনা কমবে। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি দায়িত্বশীল ও নৈতিক হন, তাহলে জনগণ ভালো সেবা পাবে।

অর্থাৎ দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয়ই উন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। এই জায়গায় মাদ্রাসা শিক্ষার একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর হাতে যদি প্রযুক্তি তুলে দেওয়া যায়

একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী হয়তো আজ একটি কিতাব পড়ছে। আগামীকাল সেই শিক্ষার্থী যদি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখে, তাহলে সে সফটওয়্যার তৈরি করতে পারে।

যে শিক্ষার্থী আরবি ভাষায় দক্ষ, সে অনুবাদ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কাজে যুক্ত হতে পারে। যে শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেছে, সে অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। যে শিক্ষার্থী ভালো বক্তা, সে যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণ খাতে কাজ করতে পারে। যে শিক্ষার্থী পরিশ্রমী, তাকে যদি কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সে বৈদ্যুতিক কাজ, ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি মেরামত, মোবাইল সার্ভিসিং, কৃষি প্রযুক্তি কিংবা অন্যান্য পেশায় দক্ষ হতে পারে।

একজন শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ পেলে ছোট ব্যবসা শুরু করতে পারে। আর একজন সফল হলে তার সঙ্গে আরও কয়েকজন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এভাবেই একজন শিক্ষার্থীর পরিবর্তন একটি পরিবারের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

পরিবারের পরিবর্তন স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। আর লাখ লাখ শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে সেটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

দারিদ্র্য থেকে দক্ষতার পথে

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আর্থিকভাবে সীমিত পরিবারের সন্তান। ফলে তাদের জন্য কর্মমুখী শিক্ষা শুধু শিক্ষানীতির বিষয় নয়। এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও বিষয়।

একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান যদি শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থান না পায়, তাহলে তার দারিদ্র্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে পারে। কিন্তু একই শিক্ষার্থী যদি ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি একটি বাস্তব কর্মদক্ষতা অর্জন করে, তাহলে তার সামনে নতুন দরজা খুলে যায়।

সে চাকরি করতে পারে। সে ব্যবসা করতে পারে। সে ফ্রিল্যান্সিং করতে পারে। সে উদ্যোক্তা হতে পারে। সে বিদেশে দক্ষ কর্মী হিসেবে যেতে পারে। সে নিজের এলাকায় কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। এখানে রাষ্ট্রের বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।

কারণ একজন শিক্ষার্থীকে দক্ষ করে তোলার অর্থ শুধু একজন মানুষকে প্রশিক্ষিত করা নয়। এর অর্থ একটি পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা।  

মাদ্রাসায় ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট ল্যাব’ হতে পারে নতুন উদ্যোগ

দেশের প্রতিটি বড় মাদ্রাসায় ধীরে ধীরে ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট ল্যাব’ চালু করা যেতে পারে।

সেখানে কম্পিউটার থাকবে। ইন্টারনেট থাকবে। ডিজিটাল প্রশিক্ষণ থাকবে। ইংরেজি ভাষা প্রশিক্ষণ থাকবে। হিসাবরক্ষণ শেখানো হবে। উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ থাকবে। কারিগরি দক্ষতার সুযোগ থাকবে। ফ্রিল্যান্সিং শেখানো হবে। সাইবার নিরাপত্তার প্রাথমিক জ্ঞান দেওয়া হবে। ডিজিটাল মার্কেটিং শেখানো হবে। এমনকি কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নের প্রশিক্ষণও দেওয়া যেতে পারে।

প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি বাস্তব কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। এটি কোনোভাবেই ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প নয়।

বরং ধর্মীয় শিক্ষার পরিপূরক।

নৈতিকতার সঙ্গে উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। শুধু সরকারি চাকরি দিয়ে তাদের কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। তাই উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। এখানেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একজন নৈতিক ও পরিশ্রমী তরুণ ছোট ব্যবসা শুরু করতে পারে। সে কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে পারে। অনলাইন ব্যবসা করতে পারে। পোশাক তৈরি করতে পারে। খাদ্যপণ্য উৎপাদন করতে পারে। ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

তার ব্যবসায় যখন আরও পাঁচজন কাজ করবে, তখন সে শুধু নিজের কর্মসংস্থান করবে না। অন্যদের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে। এইভাবে মাদ্রাসা শিক্ষা ও উদ্যোক্তা শিক্ষার সমন্বয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন শক্তি তৈরি করতে পারে।

নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ প্রয়োজন

মাদ্রাসা শিক্ষার আলোচনায় নারী শিক্ষার্থীদের ভুলে গেলে চলবে না। মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা মেয়েদেরও প্রযুক্তি, ভাষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কর্মদক্ষতার সুযোগ দিতে হবে।

তারা অনলাইন কাজ করতে পারে। শিক্ষকতা করতে পারে। অনুবাদ করতে পারে। ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতে পারে।

অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। ফলে একটি মাদ্রাসা শিক্ষিত মেয়ের দক্ষতা একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব: সমালোচনা নয়, বিনিয়োগ

মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কারিকুলাম নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে।

কিন্তু একটি বিষয়ে আমাদের ঐকমত্য প্রয়োজন। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সন্তান। তাদের ভবিষ্যৎও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তাই তাদের শিক্ষাকে অবহেলা করে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না। রাষ্ট্রের উচিত মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আধুনিক ল্যাব স্থাপন করতে হবে। ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতকে যুক্ত করতে হবে।

মাদ্রাসা থেকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরি করতে হবে। শুধু সার্টিফিকেট নয়—দক্ষতার স্বীকৃতিও নিশ্চিত করতে হবে।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মনোবল আমাদের সম্পদ

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের আরেকটি শক্তি হলো তাদের মানসিক দৃঢ়তা। অনেক শিক্ষার্থী সীমিত সুযোগের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যায়। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে। স্বপ্ন দেখে। পরিশ্রম করে।

এই মনোবল যদি আধুনিক দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে ফল হবে অসাধারণ। আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে পারি, যারা একই সঙ্গে নৈতিক এবং দক্ষ।

যারা একই সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে পারদর্শী। যারা একই সঙ্গে দেশপ্রেমিক এবং বিশ্ববাজারের উপযোগী। যারা একই সঙ্গে সৎ এবং উদ্যোক্তা। যারা একই সঙ্গে আত্মসংযমী এবং উদ্ভাবনী।

এমন মানবসম্পদ একটি দেশের জন্য বিরাট সম্পদ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লবের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ। আমাদের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। এই তরুণদের দক্ষ করে তুলতে পারলে জনসংখ্যা বোঝা নয়, জনশক্তি হয়ে উঠবে।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সেই জনশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বাদ দিয়ে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

তাদের শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের নৈতিকতাকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের পরিশ্রমকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের মনোবলকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের সাহসকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধকে কাজে লাগাতে হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি জ্ঞান ও উদ্যোক্তা দক্ষতা। তখন যে পরিবর্তন আসবে, তা শুধু শিক্ষা ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি পরিবর্তন করবে পরিবারকে। পরিবর্তন করবে শ্রমবাজারকে। পরিবর্তন করবে স্থানীয় অর্থনীতিকে। পরিবর্তন করবে উদ্যোক্তা সংস্কৃতিকে। এবং দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করবে জাতীয় অর্থনীতিকে।

শেষ কথা: মাদ্রাসার দরজা থেকেই বের হতে পারে নতুন বাংলাদেশের শক্তি

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের দিকে করুণার চোখে তাকানোর প্রয়োজন নেই। তাদের প্রয়োজন সুযোগ। তাদের প্রয়োজন সম্মান।

তাদের প্রয়োজন দক্ষতা অর্জনের পথ। তাদের প্রয়োজন নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম প্রমাণ করার ক্ষেত্র।

তাদের মধ্যে যে নৈতিক শক্তি আছে, সেটিকে দুর্বল করার প্রয়োজন নেই। বরং সেই নৈতিক শক্তির সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান যুক্ত করতে হবে। কারণ একটি দক্ষ কিন্তু অনৈতিক মানুষ সমাজের জন্য ঝুঁকি হতে পারে। আবার একজন নৈতিক কিন্তু কর্মদক্ষতাহীন মানুষ নিজের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে নাও পারে। কিন্তু নৈতিকতা ও দক্ষতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মানুষ একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।

বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—

কুরআনের জ্ঞান থাকবে, নৈতিকতার শক্তি থাকবে; সঙ্গে থাকবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতা। মাদ্রাসার ছাত্র শুধু চাকরি খুঁজবে না; সে চাকরি সৃষ্টি করবে। সে শুধু নিজের পরিবারকে বদলাবে না; সে সমাজের অর্থনীতিকে বদলাবে।

আজ প্রয়োজন মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা নয়। প্রয়োজন তাকে বাংলাদেশের বৃহত্তর শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কাঠামোর সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা।

কারণ মাদ্রাসার প্রতিটি শিক্ষার্থী কেবল একজন শিক্ষার্থী নয়। সে একটি পরিবারের আশা। সে একটি সমাজের সম্ভাবনা। আর সঠিক শিক্ষা, দক্ষতা ও সুযোগ পেলে—

সে হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম শক্তিশালী কারিগর।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম