Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

উপমহাদেশের রাজনীতির সেতুবন্ধনে ‘ক্রিকেট কূটনীতি’

Advertisement

Icon

রবিউল হক

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

উপমহাদেশের রাজনীতির সেতুবন্ধনে ‘ক্রিকেট কূটনীতি’

Advertisement

উপমহাদেশে ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, এটি জাতীয় আবেগ, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। একসময় ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচকে ঘিরে এ দেশের মানুষ দুভাগে বিভক্ত হয়ে যেত। 

বাংলাদেশ ক্রিকেট শক্তিশালী হওয়ার পর সেই আবেগের কেন্দ্রে এসেছে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট। খেলার সময় দলমত ভুলে মানুষ দেশের পক্ষে এক হয়ে যায়। ধর্ম ও জাতিবাদের ঊর্ধ্বে উঠে এ অঞ্চলের মানুষকে একটি আবেগের সূত্রে গাঁথার ক্ষেত্রে ক্রিকেটের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিনটি একদিনের আন্তর্জাতিক বা ওয়ানডে এবং তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে। মূলত গত বছরের আগস্টে সিরিজটি আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তখন সিরিজটি স্থগিত হয়ে যায়। 

সেপ্টেম্বরের সিরিজ নিয়েও এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। এটি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’

সিরিজটি নিয়ে দুই দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কারণ বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ এখন যথেষ্ট ক্রিকেটীয় উত্তেজনা তৈরি করে। 

এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ২০২২ সালের বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ। ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল। টেস্টে অবশ্য ২-০ ব্যবধানে হেরেছিল।

আইপিএলে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট সম্পর্কে একধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। কিন্তু তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সরকারের সিদ্ধান্তের দায় ক্রিকেটার ও ক্রিকেট বোর্ডের ওপর চাপিয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্রিকেট বোর্ড ও খেলোয়াড়েরা।

কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সেই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আসিফ নজরুল ও তার সহযোগীদের পদত্যাগের পর ক্রিকেট বোর্ড, কোচিং স্টাফ এবং খেলোয়াড়রা জানান, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট কেউ এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। 

জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আসিফ নজরুলের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আসিফ নজরুলই বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের ছেলেদের বঞ্চিত করেছেন। তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে না পারায় তার খারাপ লেগেছে। তার বক্তব্য ছিল, ‘সিদ্ধান্তটা ক্রিকেট বোর্ডের ছিল না, এটা সরকার থেকে এসেছে।’

সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার কারণ দেখানো হলেও বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দুজন আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত ও গাজী সোহেল দায়িত্ব পালন করেছেন। ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খানও বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন। ক্রিকেট বয়কটের কয়েক দিন পরই এশিয়ান রাইফেল ও পিস্তল শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে শুটার রবিউল ইসলাম ভারতে গিয়েছিলেন। তাঁদের কারও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।

বাংলাদেশ যখন নিরাপত্তার অজুহাতে বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই দাবিকে সমর্থন করে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় পাকিস্তান। তারা প্রথমে বলেছিল, বাংলাদেশের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তারা শ্রীলঙ্কায় ভারতের বিরুদ্ধে খেলবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি ছিল তাদের কৌশলগত অবস্থান। 

আইসিসির কাছ থেকে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের পর পাকিস্তান সিদ্ধান্ত বদলে নির্ধারিত ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলেছে। 

একসময় ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনা কমাতে ক্রিকেট কূটনীতির কথা শোনা যেত। রাজনৈতিক বৈরিতা কমানোর ক্ষেত্রেও ক্রিকেটকে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চরম বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই সময় ক্রিকেট কূটনীতি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভূমিকা রাখে।

২০০৪ সালে ‘ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ’ খেলতে পাকিস্তানে যায় ভারতীয় ক্রিকেট দল। সফরের আগে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীর হাতে একটি ব্যাট তুলে দেন। ব্যাটটিতে লেখা ছিল, ‘খেল হি নাহি, দিল ভি জিতিয়ে’। অর্থাৎ, ‘শুধু ম্যাচ জেতো না, মনও জেতো।’ শুধু ক্রিকেটাররাই নন, ভারতীয় সমর্থকরাও সেই সিরিজ দেখতে বিশেষ ভিসায় পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক বেশ ভালোই এগোচ্ছিল।

তবে ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আবারও তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এর মধ্যেও ২০১১ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে আমন্ত্রণ জানান। দুই প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসে ম্যাচটি দেখেছিলেন। 

ক্রিকেট কূটনীতির ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এরপর থেকে ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

১৯৯৬ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ এবং কলম্বোয় বোমা হামলার ঘটনায় নিরাপত্তার অভিযোগ তুলে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু সেই বিশ্বকাপেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শ্রীলঙ্কা চ্যাম্পিয়ন হয়। বিশ্বকাপের পর শ্রীলঙ্কা কোনো অনিরাপদ দেশ নয়, এই বার্তা দিতে ভারত ও পাকিস্তান শ্রীলঙ্কায় গিয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলে। বিশ্বকে বোঝানো হয়, নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও আঞ্চলিক স্বার্থে তারা একসঙ্গে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে কখনো কোনো দেশের ক্রিকেট বৈরিতা তৈরি হয়নি। একসময় পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো ছিল না। তারপরও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সিরিজ বাতিল হয়নি। ভারতের সঙ্গেও শুধু দ্বিপাক্ষিক সিরিজের সম্পর্ক নয়, আইপিএলেও বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিয়মিত খেলেছেন। ফলে দুই দেশের ক্রিকেট নিয়ে সাম্প্রতিক যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা করা যায়।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে ক্রিকেট অনেক সময় সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করেছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেমন ক্রিকেট কূটনীতি মানুষের দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও ক্রিকেট একই ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। 

মাঠের লড়াই কখনো উত্তেজনা বাড়ায়, আবার সেই মাঠই কখনো রাজনৈতিক দূরত্ব কমানোর সুযোগ তৈরি করে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ক্রিকেট কূটনীতি রাজনৈতিক সীমানা পেরিয়ে দুই দেশের মানুষের হৃদয়কে একটি সুতোয় বাঁধতে পারে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল। 

শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। রাষ্ট্রের সম্পর্ক যখন কঠিন হয়ে ওঠে, তখনও একটি ব্যাট, একটি বল এবং একটি ম্যাচ মানুষের মধ্যে যোগাযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।

লেখক: ক্রীড়া বিশ্লেষক, প্রভাষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পিএইচডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া


Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ১০ ব্যাটার কারা?

ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ১০ ব্যাটার কারা?

আজকের খেলা: ২২ অক্টোবর ২০২৬

আজকের খেলা: ২২ অক্টোবর ২০২৬

সর্বকালের সেরা ১০ উইকেটশিকারি বোলার যারা

সর্বকালের সেরা ১০ উইকেটশিকারি বোলার যারা

উপেক্ষা করেই যাচ্ছে ভারত, তবু আশা ছাড়ছেন না শামি

উপেক্ষা করেই যাচ্ছে ভারত, তবু আশা ছাড়ছেন না শামি

এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ার ৪ মাস পরেই ইউসুফ পাঠানের পকেটে ২০ কোটির জমি

এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ার ৪ মাস পরেই ইউসুফ পাঠানের পকেটে ২০ কোটির জমি

৭৭ বছরেও যা হয়নি, সে রেকর্ড দেখল ভারত

৭৭ বছরেও যা হয়নি, সে রেকর্ড দেখল ভারত

আরও পড়ুন

চায়ের আমন্ত্রণে সাংবিধানিক পদ থেকে পদত্যাগ: সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়?

চায়ের আমন্ত্রণে সাংবিধানিক পদ থেকে পদত্যাগ: সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়?

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম