Logo
Logo
×

Advertisement

শিক্ষাঙ্গন

ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০১ পিএম

ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

ফাইল ছবি

Advertisement

ক্যাডেট কলেজের ধাঁচে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ৬০০টি দৃষ্টিনন্দন মডেল স্কুল ও কলেজ গড়ে তোলার এক বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ভাবনা অনুযায়ী, প্রতিটি আসনে ছেলেদের ও মেয়েদের জন্য আলাদা দুটি সম্পূর্ণ আবাসিক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তোলা হবে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে থাকবে থাকার বন্দোবস্ত, খেলাধুলা, সাঁতার শেখা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের দারুণ সব সুযোগ।

প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) বেশ আগেই পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলেও বিপুল অঙ্কের বাজেটের এই প্রকল্পটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের মুখ দেখেনি।

মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা এই মেগা প্রকল্পের মোট খরচের ৭০ শতাংশ বিদেশি সাহায্য থেকে আনার পরিকল্পনা করা হলেও সেই অর্থায়নের পথ এখনো পরিষ্কার নয়। এর ওপর ৬০০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় জমি জোগাড়, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং ভবিষ্যতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন খরচ কীভাবে আসবে—সেসব জটিল বিষয়েও এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা তৈরি করা হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত এলাকাসমূহে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৬৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ২০ হাজার ৫২০ কোটি টাকা বা ৩০ শতাংশ এবং প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ৪৭ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা বা ৭০ শতাংশ সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), কোরিয়ার ইডিসিএফ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগীর কাছে সম্ভাব্য অর্থায়নের কথা প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো সংস্থার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি এখনো নিশ্চিত নয়।

প্রকল্পের মোট ব্যয়কে ৬০০টি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ভাগ করলে প্রতিটি স্কুল নির্মাণে গড় ব্যয় দাঁড়ায় ১১৪ কোটি টাকা। তবে এটি শুধু প্রকল্পের প্রস্তাবিত মূলধনী ব্যয়ের হিসাব।

প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে একটি বালক ও একটি বালিকা স্কুল নির্মাণ করা হবে। এই হিসাবে ৩০০টি বালক এবং ৩০০টি বালিকা স্কুল মিলিয়ে মোট প্রতিষ্ঠান হবে ৬০০টি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আনুমানিক তিন একর জমি প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে জমির প্রয়োজন দাঁড়াবে প্রায় এক হাজার ৮০০ একর।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে জমির প্রাপ্যতা, স্থান নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই করার কথা রয়েছে। সংসদীয় আসনভিত্তিক সমানসংখ্যক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও কোনো এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি, জনসংখ্যা, শিক্ষার্থীসংখ্যা ও স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে স্থান নির্বাচন কিভাবে হবে, তা প্রস্তাবে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা থাকবে। একটি প্রতিষ্ঠানে আনুমানিক এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পাবে। প্রতি শ্রেণিতে তিন থেকে চারটি শাখা এবং প্রতিটি শাখায় ৩৮ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই হিসাবে ৬০০ প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ছয় লাখ।

শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবন, সাধারণ ও মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের পরীক্ষাগার নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি থাকবে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবটিকস চর্চার জন্য বিশেষ ল্যাব এবং ডিজিটাল শিক্ষাকেন্দ্র। ক্যাম্পাসে ইন্টারনেট সংযোগ, ই-লাইব্রেরি ও ডিজিটাল লার্নিং ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, কোরীয়, আরবি ও ম্যান্ডারিন ভাষা শেখার জন্য ভাষা ল্যাব স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। থাকবে পাঠাগার, মিলনায়তন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সংগীত, নাচ, নাটক ও চিত্রকলার চর্চার সুযোগ। বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক, খেলাধুলা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০০ আসনের আবাসিক হোস্টেল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। খেলার মাঠ, ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা, ইনডোর গেমস এবং বহুমুখী ক্রীড়া অবকাঠামো রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সুইমিংপুল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখানো ও জীবন রক্ষাকারী দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করার লক্ষ্য রয়েছে এ উদ্যোগের।

শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় রান্নাঘর ও খাবার ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা থাকবে। এ ক্ষেত্রে জাপানের স্কুলভিত্তিক খাবার ও পুষ্টিশিক্ষা ব্যবস্থার আদলে কার্যক্রম পরিচালনার ধারণা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা ও প্রাথমিক চিকিৎসা কক্ষ, স্কুল নার্স, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। মেয়েদের জন্য পৃথক কমনরুম, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও মাসিককালীন স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও থাকবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য র‌্যাম্প, লিফট ও বাধামুক্ত চলাচলের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য সীমানাপ্রাচীর, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ, সিসিটিভি ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখা হবে।

পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়তে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আনুমানিক ৪৫ জন শিক্ষক প্রয়োজন হবে। সেই হিসাবে ৬০০টি প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষক লাগবে প্রায় ২৭ হাজার। প্রস্তাবিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনুপাত হবে প্রায় ২২ঃ১। শিক্ষক ছাড়াও প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, পরীক্ষাগার ও তথ্য-প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট জনবল, গ্রন্থাগারিক, নার্স, পুষ্টি ও খাবার ব্যবস্থাপনার কর্মী, হোস্টেল তত্ত্বাবধায়ক এবং নিরাপত্তাকর্মী প্রয়োজন হবে।

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে অর্থায়ন নিশ্চিত করা। মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা বিদেশি সহায়তা থেকে সংগ্রহ করতে হবে।

এ ছাড়া ৬০০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি সংগ্রহ, পাঁচ বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা এবং একসঙ্গে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগের বিষয়গুলোও বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সুবিধা চালু রাখতে বিপুল পরিচালন ব্যয় প্রয়োজন হবে। এসব ব্যয় কিভাবে এবং কোন খাত থেকে বহন করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য চার কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। সমীক্ষায় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, স্থান নির্বাচন, জমির প্রাপ্যতা, ব্যয়, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করার কথা। সমীক্ষার ফলের ভিত্তিতে বিস্তারিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অনুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় নেই। উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ ও অর্থায়নের সম্ভাবনা থাকলে নিয়ম অনুযায়ী সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ডিপিপি প্রণয়ন এবং পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। প্রকল্প এখনো পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে; চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরই এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণসহ আট দফা দাবি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণসহ আট দফা দাবি

শিক্ষা, ভাষা ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ-ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা, ভাষা ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ-ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়

‘বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপতে মিলেমিশে লুটপাট’ প্রতিবেদন নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা

‘বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপতে মিলেমিশে লুটপাট’ প্রতিবেদন নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা

নির্ধারিত সময়ে বই পৌঁছাতে প্রেস পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর

নির্ধারিত সময়ে বই পৌঁছাতে প্রেস পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর

৬৫১ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন, যোগদানের সময় জানাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়

৪৯তম বিসিএস ৬৫১ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন, যোগদানের সময় জানাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়

প্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষকের পদায়নের নতুন তারিখ ঘোষণা

প্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষকের পদায়নের নতুন তারিখ ঘোষণা

আরও পড়ুন

ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা ৩০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার সবুজ সংকেত বিশ্বব্যাংকের

৩০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার সবুজ সংকেত বিশ্বব্যাংকের

বাকৃবিতে শিক্ষার্থীদের মারামারি, ইন্ধনের অভিযোগ অস্বীকার ছাত্রদল নেতার

বাকৃবিতে শিক্ষার্থীদের মারামারি, ইন্ধনের অভিযোগ অস্বীকার ছাত্রদল নেতার

এইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার ফি নিয়ে জরুরি নির্দেশনা

এইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার ফি নিয়ে জরুরি নির্দেশনা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম