Logo
Logo
×

Advertisement

রাজধানী

এক যুগ ধরে বন্ধ সার্জারি বিভাগ

মহানগর শিশু হাসপাতাল এখন নিজেই ‘রোগী’

Advertisement

মো. জহিরুল ইসলাম

মো. জহিরুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:০৮ এএম

মহানগর শিশু হাসপাতাল এখন নিজেই ‘রোগী’

এক যুগের বেশি সময় ধরে সার্জারি বন্ধ থাকায় অপারেশন থিয়েটারের মূল্যবান যন্ত্রপাতি ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ছবি: যুগান্তর

Advertisement

রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ থানার গৌরসুন্দর রায় লেনে অবস্থিত ১০০ শয্যার মহানগর শিশু হাসপাতাল একসময় পুরান ঢাকাসহ আশপাশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের শিশুদের চিকিৎসার অন্যতম ভরসার কেন্দ্র ছিল।

মাত্র ১০ টাকার টিকিটে ২৪ ঘণ্টার জরুরি, বহির্বিভাগ ও ইনডোর চিকিৎসাসেবা মিললেও বছরের পর বছর চিকিৎসক, কনসালট্যান্ট, সার্জন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, আবাসিক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের সংকট, শূন্য পদে নিয়োগ না হওয়া এবং প্রশাসনিক অবহেলায় হাসপাতালটি আজ নিজেই চিকিৎসাসংকটে।

২০১৪ সালের আগ থেকেই সার্জারি বিভাগ এবং ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ইনডোর সেবা বন্ধ রয়েছে। নেই পর্যাপ্ত শিশু বিশেষজ্ঞ, আইসিইউ ও পূর্ণাঙ্গ ২৪ ঘণ্টার চিকিৎসাসেবা। কোটি টাকার অপারেশন থিয়েটার ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হলেও প্রতিদিন শত শত শিশু চিকিৎসার আশায় এই হাসপাতালে ভিড় করছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় এক বিঘা জমির ওপর নির্মিত চারতলা হাসপাতাল ভবনটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখানে বহির্বিভাগ, ইপিআই টিকাদান কেন্দ্র, টিকিট কাউন্টার, মেডিসিন, ডায়রিয়া ও ডেঙ্গু ওয়ার্ড, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ স্টোর, জরুরি বিভাগ, সিস্টার রুম, চিকিৎসকদের কক্ষ, নারীদের নামাজের স্থান ও ফার্মেসি স্টোর রয়েছে। শিশু জন্মের পর থেকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল, হাম, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন টিকা এবং বর্তমানে এমআর (মিজলস-রুবেলা) টিকা দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালে তিনটি অপারেশন থিয়েটার, ডিজিটাল প্যাথলজি ল্যাব, এক্স-রে বিভাগ, ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা, ফিজিওথেরাপি ইউনিট, শিশু চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং চারতলায় চিকিৎসক-নার্সদের আবাসন রয়েছে, যার সংস্কার চলছে। তবে জনবলের অভাবে অধিকাংশ অবকাঠামো অকার্যকর।

এক যুগের বেশি সময় ধরে সার্জারি বন্ধ থাকায় অপারেশন থিয়েটারের মূল্যবান যন্ত্রপাতি ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বহির্বিভাগ ও জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু থাকলেও রাতের ইনডোর চিকিৎসা না থাকায় গুরুতর রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। ভর্তি রোগীরা সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ওয়ার্ডে থাকতে পারলেও পরে বাসায় ফিরে পরদিন সকাল ৮টায় আবার হাসপাতালে এসে ভর্তি থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চালুর পর বিভিন্ন অর্গানোগ্রামে ১৩০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ৭৩ জনে নেমে এসেছে। এর মধ্যেও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন অন্য হাসপাতালে কর্মরত থাকায় কার্যকর জনবল আরও কমে গেছে।

বর্তমানে হাসপাতালটির জন্য শুধু বহির্বিভাগ পরিচালনার বাজেট রয়েছে। প্রতিদিন ২৮০ থেকে ৩৫০ শিশু এখানে জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিতে আসে এবং অধিকাংশ ওষুধ বিনামূল্যে পায়। তবে জটিল ও রাতের রোগীদের অন্য হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে। ভর্তি রোগীদেরও রাত ৮টার পর থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত বাসায় থাকতে হচ্ছে।

ইসলামবাগের জুপসি বলেন, সন্তানের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত এখানে আসি। চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ ভালো পেলেও ২৪ ঘণ্টার ইনডোর সেবা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

লালবাগের শহীদনগরের গোলাপ জান বলেন, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত নাতির চিকিৎসা ১০ টাকার টিকিটে হয়। কিন্তু জটিল হলে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়।

হাজারীবাগের ঝাউচরের মাহিদুর বলেন, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত সন্তানকে দুই দিন ভর্তি রাখার পর হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ায় এখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

ইসলামবাগের টাইফয়েডে আক্রান্ত ৯ বছর বয়সি এক শিশুর অভিভাবক বলেন, চিকিৎসা ও ওষুধে তারা সন্তুষ্ট।

অভিভাবকদের দাবি, ২৪ ঘণ্টার ইনডোর ও জরুরি সেবা চালু এবং উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হলে নিম্নআয়ের মানুষের শিশুদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজ ও কার্যকর হবে।

হাসপাতালের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক ও কনসালট্যান্ট প্যাথলজিস্ট ডা. হামিদা খাতুন বলেন, আমি ২০১৪ সালে এখানে যোগ দিই। তখন থেকেই সার্জারি বিভাগ বন্ধ ছিল। সে সময় মেডিসিন ওয়ার্ডে সবসময় রোগী ভর্তি থাকত এবং ১৫-১৬ চিকিৎসক কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে মাত্র ছয়জন চিকিৎসক দিয়ে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও সীমিত ডে-কেয়ার সেবা চালাতে হচ্ছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ইনডোরের রাতের সেবা বন্ধ। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ডে-কেস হিসেবে ইনডোর সেবা চালু আছে। কনসালট্যান্ট, আবাসিক চিকিৎসক, নার্স ও পর্যাপ্ত মেডিকেল অফিসার না থাকায় ২৪ ঘণ্টার সেবা চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, হাসপাতালের সবচেয়ে বড় সংকট জনবল। ছয়জন কনসালট্যান্টের জায়গায় একজন, ১৩ মেডিকেল অফিসারের জায়গায় ছয়জন এবং ৩০ নার্সের জায়গায় মাত্র ১০ জন রয়েছেন। সার্জন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, আবাসিক চিকিৎসক ও আবাসিক সার্জন না থাকায় সার্জারি বিভাগ চালু করা যাচ্ছে না।

তার ভাষায়, জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক, কনসালট্যান্ট, সার্জন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, মেডিকেল অফিসার, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ানসহ শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে ১০০ শয্যার এ হাসপাতালকে আবারও পূর্ণাঙ্গ ২৪ ঘণ্টার শিশু হাসপাতালে রূপান্তর করা সম্ভব।

প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমানের সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। পরে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টসহ জনবল নিয়োগের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। ওষুধের চাহিদাও নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে।  পুরান ঢাকার মানুষের জন্য হাসপাতালটিতে পূর্ণাঙ্গ ও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে সুযোগ-সুবিধা দ্রুত বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

রোগীর পথ যত সহজ হবে, স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতা তত ভালো হবে

রোগীর পথ যত সহজ হবে, স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতা তত ভালো হবে

সন্তান নিতে চিকিৎসা, ঝুঁকি আছে কি- সতর্ক থাকবেন যারা

সন্তান নিতে চিকিৎসা, ঝুঁকি আছে কি- সতর্ক থাকবেন যারা

ঢাকায় ১০ তলা ভবন থেকে ফেলে ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যার অভিযোগ

ঢাকায় ১০ তলা ভবন থেকে ফেলে ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যার অভিযোগ

সরকারি হাসপাতালের ৬১ অক্সিজেন প্ল্যান্টে মিলছে না সেবা

সমন্বিত ব্যবস্থাপনার তাগিদ সরকারি হাসপাতালের ৬১ অক্সিজেন প্ল্যান্টে মিলছে না সেবা

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ‘এএসডি আক্রান্ত’ শিশুদের ঘুমের সমস্যা

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ‘এএসডি আক্রান্ত’ শিশুদের ঘুমের সমস্যা

হাসপাতালে ‘জাতীয় কাকা’ খ্যাত অভিনেতা রিফাত চৌধুরী, চিকিৎসার খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার

হাসপাতালে ‘জাতীয় কাকা’ খ্যাত অভিনেতা রিফাত চৌধুরী, চিকিৎসার খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার

আরও পড়ুন

যানজটে নাকাল রাজধানীবাসী অটোরিকশা চালকদের অবরোধ ভাঙচুর

অটোরিকশা চালকদের অবরোধ ভাঙচুর

ঢামেকের মর্গে প্রেমিকের মরদেহ দেখার কয়েক ঘণ্টা পর নার্সের মৃত্যু

ঢামেকের মর্গে প্রেমিকের মরদেহ দেখার কয়েক ঘণ্টা পর নার্সের মৃত্যু

বংশালে নিশার আত্মহত্যা: বান্ধবীসহ গ্রেফতার ২

বংশালে নিশার আত্মহত্যা: বান্ধবীসহ গ্রেফতার ২

রাজধানীতে ফিজিওথেরাপি কলেজের কিচেনে আগুন

রাজধানীতে ফিজিওথেরাপি কলেজের কিচেনে আগুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম