পটুয়াখালীর নদ-নদীতে ডুবোচর, ব্যাহত লঞ্চ চলাচল
Advertisement
জলিল রহমান, পটুয়াখালী
প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে ঢাকা–পটুয়াখালী নৌরুটে ‘রোটেশন প্রথা’ তুলে নেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকে এ রুটে নিয়মিত লঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশেষ সার্ভিস চালুর প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
তবে যাত্রীসেবার এ উদ্যোগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নৌপথের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্ট ভয়াবহ ডুবোচর, যাতে লঞ্চ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লঞ্চচালক ও সংশ্লিষ্টরা জানান, পটুয়াখালী লঞ্চঘাট সংলগ্ন লোহালিয়া নদীর মোহনা, বগা, লক্ষিপাশা, সোনাকান্দা, কোবাই, বিশাইনকান্দি এবং মেঘনার প্রবেশমুখ গঙ্গারচর এলাকায় পানির গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ভাটার সময় এসব এলাকায় প্রায়ই লঞ্চ আটকে পড়ে। জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে।
ঢাকা–পটুয়াখালী রুটের পূবালী-১২ লঞ্চের সারেং সুমন হীরা বলেন, ডুবোচরের কারণে ভাটার সময় চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ঈদযাত্রায় চরম ভোগান্তি হবে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান এমভি প্রিন্স কামাল-১ লঞ্চের চালক মো. নাসির উদ্দিন খান। তিনি বলেন, এখন জোয়ার-ভাটার হিসাব করেই লঞ্চ চালাতে হচ্ছে। মাঝপথে আটকে গেলে যাত্রীদের বিরক্তি ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
মঙ্গলবার সকালে ঢাকা থেকে লঞ্চে পটুয়াখালী আসা গলাচিপা উপজেলার আমখোলা গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, মাঝরাতে কোবাই এলাকায় লঞ্চ প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে ছিল। পরিবারের সবাই নিয়ে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পটুয়াখালী লঞ্চঘাট এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পলি জমে বালুচর সৃষ্টি হয়েছে। ভাটার সময় এসব চর স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং লঞ্চ ভিড়তে গিয়ে প্রায়ই আটকে যায়। কোথাও কোথাও নদীর তীর থেকে ৬০–৭০ ফুট পর্যন্ত পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ছোট নৌযানগুলোও চরে আটকে থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমিত পরিসরে ড্রেজিং কার্যক্রম চললেও তা সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।
পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মো. কামাল হোসেন বলেন, লঞ্চঘাটটি কার্যত নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। ঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়তেই দীর্ঘ সময় লাগে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এটি একসময় অচল হয়ে পড়বে।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান রুমি বলেন, নদীনির্ভর এ অঞ্চলের অর্থনীতি নাব্যতা সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি ড্রেজিং কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনার আহ্বান জানান।
অপর ব্যবসায়ী মো. হারুণ-অর-রশিদ বলেন, সড়ক যোগাযোগ সহজ হলেও এখনও অনেক যাত্রী কম খরচে লঞ্চে যাতায়াত করেন। কিন্তু বর্তমান সংকটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ কমে যাওয়ায় ঘাটকেন্দ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ঘাট শ্রমিক জসিম হাওলাদার জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন ৮০–৯০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন তা নেমে এসেছে ৮–১০ জনে। কাজ কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে অতিরিক্ত লঞ্চের বার্থিং নিশ্চিত করতে বিআইডব্লিউটিএ জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করেছে।
সহকারী বন্দর ও পরিবহণ কর্মকর্তা মো. জাকী শাহরিয়ার জানান, তিনটি পন্টুন এলাকা পরিষ্কার করা হয়েছে এবং বার্থিং সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। পটুয়াখালী অংশের ডুবোচর অপসারণে কাজ চলছে, বরিশাল অংশেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. মামুন-উর-রশীদ বলেন, নদীর স্রোত কমে যাওয়ায় পলি জমে নাব্যতা কমছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় ২৫০ ফুট প্রস্থের নৌচ্যানেল সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
নিরাপত্তার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল বলেন, ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে লঞ্চঘাটগুলোতে বিশেষ টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ এবং ছিনতাই-হয়রানি ঠেকাতে সাদা পোশাকে সদস্য মোতায়েন থাকবে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, স্থায়ী নদী শাসনের জন্য প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অতীতে ড্রেজিংয়ে অনিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে সরকার সজাগ থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত ও কার্যকর ড্রেজিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হলে আসন্ন ঈদযাত্রায় এই নৌরুটে ভোগান্তি আরও বাড়বে।
