আমি কোনো মামলা করিনি: সাবেক র্যাব কর্মকর্তা
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কক্সবাজারে ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার সংক্রান্ত এক মামলায় বাদী হিসেবে নাম থাকা র্যাব-১৫-এর সাবেক কর্মকর্তা মো. ফিরোজ আহাম্মেদ হঠাৎ আদালতে হাজির হয়ে মামলা অস্বীকার করেছেন।
তিনি আদালতে বলেন, আমি কোনো মামলা দায়ের করিনি। মামলার এজাহারে থাকা স্বাক্ষর আমার নয়। এ মামলা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। কে বা কার দ্বারা এ মামলার এজাহার দায়ের করা হয়েছে, আমি জানি না।
বাদীর এই অকপট বক্তব্যে আদালতে উপস্থিত বিচারক, আইনজীবী ও অন্যরা রীতিমতো হতবাক হন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুর রশিদ। তিনি জানান, বাদী লিখিতভাবে মামলা অস্বীকার করে বিস্তারিত হলফনামা দিয়েছেন।
গত ৩১ মার্চ কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে এ ঘটনা ঘটে।
মামলার নথি ঘেঁটে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে র্যাব-১৫-এর ডেপুটি ডিরেক্টর মো. ফিরোজ আহাম্মেদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি টিম টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের পানছড়ি পাড়ার আবুল কালামের বাড়িতে অভিযান চালায়।
অভিযানের সময় কবির আহাম্মদের ছেলে মো. আব্দুল্লাহ ও মৃত আলী আহাম্মদের পুত্র মো. আলীকে আটক করা হয়। তাদের হাতে থাকা পলিথিনের ব্যাগ থেকে ৩০ হাজার করে মোট ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তিনটি মোবাইল সেটও জব্দ করা হয়। উদ্ধারকালে বাড়ির মালিক আবুল কালাম পালিয়ে যান। এ ঘটনায় একটি জব্দ তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর মো. ফিরোজ আহাম্মেদ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় আব্দুল্লাহ, মো. আলী এবং আবুল কালামকে পলাতক আসামি দেখিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এজাহার দায়ের করেন। এজাহারটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করেন ওসি মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ ও পরিদর্শক (তদন্ত) নাছির উদ্দিন মুজমদার। মামলা নম্বর ছিল ২৩/২০২৩ এবং জিআর নাম্বার ৬৪১/২০২৩। মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে নিযুক্ত হন এসআই মোহাম্মদ গোলাম হক্কানী।
তদন্ত ও চার্জশিট:
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম হক্কানী এক মাস ১১ দিনের মধ্যে ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে ধৃত আসামি আব্দুল্লাহ, মো. আলী এবং আরও তিনজনকে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়। পলাতক আসামি আবুল কালামের বিরুদ্ধে অব্যাহতির আবেদন করা হয়।
৫ নভেম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চার্জশিট গ্রহণ করেন এবং মামলাটি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে প্রেরণ করা হয়। সেখানে এটি এসটি : ৫৫/২০২৫ নাম্বারের সেশন ট্রায়াল মামলা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
২০২৫ সালের ৬ মে মামলার চার্জ (অভিযোগ) গঠন হয় এবং বিচার কাজ শুরু হয়। মামলার বাদী মো. ফিরোজ আহাম্মেদসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়। সমন পেয়ে ৩১ মার্চ তিনি কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে হাজির হন।
অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুর রশিদ জানান, সাক্ষীর কাঠগড়ায় শপথ গ্রহণের পর বাদী বলেন- ‘আমি কোনো মামলা দায়ের করিনি। এ মামলার এজাহারে থাকা স্বাক্ষর আমার নয়। আমি এই মামলার বিষয়ে কিছুই জানি না।’
এই অকপট স্বীকারোক্তিতে আদালতে উপস্থিত আইনজীবী, বিচারক ও অন্যান্যরা হতবাক হন।
মামলার আসামি আব্দুল্লাহ ও মো. আলী জানান, তারা বাদীকে চেনেন না। একইভাবে বাদীও কাঠগড়ায় উপস্থিত আসামিদের চেনেন না।
এ অবস্থায় বাদী মো. ফিরোজ আহাম্মেদ তার বক্তব্য স্বহস্তে লিখে হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করেন। হলফনামায় তার নমুনা স্বাক্ষরও নেওয়া হয়। হলফনামাটি আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট সত্যায়িত করেন।
এ সময় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বাদীর বক্তব্য দ্বিধাহীন ও যথাযথভাবে প্রদত্ত। মামলাটি ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) সারণির ১১(গ)/৪১ ধারায় রুজুকৃত। মামলায় ৬০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
বিচারক আরও বলেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় স্বয়ং এজাহারকারীই চিহ্নিত নয়। এটি মামলার মারাত্মক ত্রুটি। মামলার প্রক্রিয়া, এজাহার দায়ের, তদন্ত ও আসামি নির্ধারণের স্বরূপ উদঘাটন এবং প্রকৃত ঘটনার তদন্ত অপরিহার্য। বিচারক একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদা বা তার উপরে) তদন্ত করে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজিকে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের আদেশের কপি আইজিপির কাছেও প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, মামলার কথিত বাদী মো. ফিরোজ আহাম্মেদ বর্তমানে বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় ৯ বিজিবিতে সুবেদার পদে কর্মরত রয়েছেন।
এ বিষয়ে র্যাব ১৫-এর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
