চৈত্রসংক্রান্তিতে নেত্রকোনায় খনার মেলা, লোকজ সংস্কৃতিতে প্রাণের জোয়ার
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম
দিনব্যাপী আয়োজনে পালাগান, বাউলগান, কবিতা, কিচ্ছাপালা ও আলোচনা পর্বে খনার বচনের দার্শনিক ও কৃষিভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী খনার মেলা। গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান ও কৃষিজীবনে খনার বচনের গুরুত্ব তুলে ধরতেই তৃতীয়বারের মতো এ আয়োজন করা হয়।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার আঙ্গারোয়া গ্রামে স্থানীয় কৃষক, সংস্কৃতিকর্মী ও দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে মেলার উদ্বোধন করা হয়।
দিনব্যাপী আয়োজনে পালাগান, বাউলগান, কবিতা, কিচ্ছাপালা ও আলোচনা পর্বে খনার বচনের দার্শনিক ও কৃষিভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে মেলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
স্থানীয় সংগঠন মঙ্গলঘর পরিসরের উদ্যোগে এবং ‘কুল এক্সপোজার’-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এ মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা অংশ নেন।
সকাল থেকেই মেলায় পালাগান, কবিতা, বাউলগান ও কিচ্ছাপালা পরিবেশিত হয়। পাশাপাশি ছিল ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ প্রদর্শনী, লণ্ঠন উৎসব এবং ‘ভোরের হাওয়া’ নামে একটি স্মারকের মোড়ক উন্মোচন। সংগীত, শ্লোক ও আলোচনা পর্বে খনার কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীবনবোধ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
সোমবার বিকালে লোকসংগীতশিল্পী কফিল আহমেদের পরিবেশনায় লোকগান ও পুঁথিপাঠের আসর বসে। এছাড়া সংগীত পরিবেশন করে সমগীত, সহজিয়া, চিৎকার ও কৃষ্ণকলি দল।
মেলায় দেশি-বিদেশি শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। প্রদর্শনীতে ছিল কুলা, পাইলা, ধুচনি, দাঁড়িপাল্লা, ধারি, মাটির কলস, মটকি, সানকি এবং পাটজাত বিভিন্ন শিল্পকর্ম। কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে দেশি বীজ বিনিময় করেন। পরিবেশ সচেতনতার অংশ হিসেবে মেলা প্রাঙ্গণে প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। তবে বসার জন্য প্লাস্টিকের চেয়ার ছিল।
সকালের আলোচনা পর্বে ‘জল ভালো ভাসা, মানুষ ভালো চাষা’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য দেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনের সংগঠক দেলোয়ার জাহান, কবি আহমেদ নকিব, লেখক বাকি বিল্লাহ, সংস্কৃতিকর্মী বীথি ঘোষ, কবি আসমা বীথি, আবুল কালাম আল আজাদ, লোকসাহিত্য গবেষক রাখাল বিশ্বাস এবং আয়োজক বদরুন নূর চৌধুরী।
মেলায় অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মনোরঞ্জন সরকার বলেন, খনার বচনের মাধ্যমে সমাজের নানা অসংগতি ও কৃষিজীবনের বাস্তবতা উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ও তিনি বহু আগে ইঙ্গিত করেছেন।
কলমাকান্দা উপজেলার শিক্ষক পল্লব চক্রবর্তী বলেন, খনার বচনে মানুষের জীবন, খাদ্যাভ্যাস ও আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উঠে আসে। এ ধরনের আয়োজন আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। মেলায় এসে তিনি কৃষি সম্পর্কে নতুন ধারণা পেয়েছেন এবং এসব জ্ঞান কৃষকদের জন্য উপকারী বলে মনে করেন।-69dd0ad8ee1e6.jpg)
সংগঠক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুই বছর আগে আঙ্গারোয়া গ্রামে এ মেলার সূচনা হয়। খনার বচনের মাধ্যমে লোকায়ত বাংলার জীবন, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
ভারতীয় সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক বলেন, খনা কেবল একজন ব্যক্তি নন বরং তিনি এক ধরনের প্রতীক—যিনি যুগ যুগ ধরে মানুষের জীবনের বাস্তবতা ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে আছেন।
দিনব্যাপী এ আয়োজন ঘিরে আঙ্গারোয়া গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
