চারজনের পরিবারে সবাই প্রতিবন্ধী; একমাত্র উপার্জনক্ষম মারফতও এখন বিছানায়
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:১০ পিএম
চারজনের পরিবারে সবাই প্রতিবন্ধী; একমাত্র উপার্জনক্ষম মারফতও এখন বিছানায়
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি পরিবার, চারজন সদস্য। পরিবারের প্রত্যেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার। এর মধ্যে যিনি সামান্য কাজ করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতেন, সেই ৮৫ বছরের মারফত আলীও এখন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন।
চিকিৎসার অভাবে দিন কাটছে চরম যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তায়। দুই বেলা খাবার জোগাড় করাই এখন পরিবারটির কাছে এক কঠিন যুদ্ধ।
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার মনসুরপুর গ্রামের বাসিন্দা মারফত আলী। তার স্ত্রী জবেদার বয়স ৭০ বছর। তাদের দুই মেয়ে নাজমা আক্তার (২৫) ও শারমিন আক্তার (২০)। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরিবারের চার সদস্যই প্রতিবন্ধী। নিজেদের কোনো বসতভিটাও নেই। অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারটি।
একসময় মারফত আলী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও মানুষের বাড়িতে টুকটাক কাজ করতেন। দিনে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনোমতে চলত সংসার; কিন্তু কিছুদিন আগে পড়ে গিয়ে তার কোমরের হাড় মারাত্মকভাবে ভেঙে যায়। এরপর থেকে তিনি শয্যাশায়ী। অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।
স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, মারফত আলীর চিকিৎসার জন্য আনুমানিক ২ থেকে ৩ লাখ টাকা প্রয়োজন; কিন্তু যে পরিবারে দুমুঠো খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে এত টাকা সংগ্রহ করা একেবারেই অসম্ভব। ফলে যন্ত্রণায় কাতরালেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারছেন না তিনি।
এখন পরিবারের উপার্জনের কেউ নেই। অন্যের সহায়তায় কখনো খাবার জুটছে, আবার কখনো অনাহারেই কাটছে দিন। মানুষের সাহায্য ছাড়া এই পরিবারটির বেঁচে থাকার যেন আর কোনো অবলম্বন নেই; কিন্তু মানুষের সহায়তাও তো সব সময় পাওয়া যায় না।
একদিকে চারজনের প্রতিবন্ধিতা, অন্যদিকে মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁই নেই। তার ওপর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অসুস্থতা—সব মিলিয়ে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটছে পরিবারটির।
মনসুরপুর গ্রামের বাসিন্দা পলাশ তালুকদারের বাড়িতে আশ্রয়ে থাকেন মারফত আলী। পলাশ তালুকদার বলেন, মারফত আলীর স্ত্রী জবেদা খাতুন আমার ফুফু হন। প্রায় ১৬ বছর ধরে তারা আমাদের বাড়িতেই থাকেন। তাদের দুই মেয়েও শ্রবণ ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। মারফত আলী বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তারপরও তিনি কাজকর্ম করে যা পেতেন তাই দিয়ে সংসার চালাতেন; কিন্তু কয়েক মাস আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তিনিও শয্যাশায়ী। এখন তারা খেয়ে না খেয়ে থাকেন। চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।’
একই এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী হাফছা আক্তার বলেন, ‘তিনি পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়ার পর আমরা একটা হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম; কিন্তু পরিবারের চারজনই প্রতিবন্ধী। সবাই অচল, এমন অবস্থায় বৃদ্ধ মারফত আলীর চিকিৎসা এবং পরিবারের খাবার কিছুই হচ্ছে না। পরিবারটি খুব অসহায়। এই পরিবারটি এখনো সরকারি-বেসরকারি কোনো সহযোগিতা পায়নি। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে পরিবারটি রক্ষা পেত।’
মারফত আলীর পরিবারের এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জরুরি চিকিৎসা ও নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং মানবিক সংগঠনগুলোর কাছে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আকুল আবেদন জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা। মানুষের একটু সহানুভূতি, সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা কিংবা চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়াই পারে চারটি অসহায় জীবনে নতুন করে বেঁচে থাকার আশা জাগাতে।
