কিশোরগঞ্জের হাওড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ২৫৯ কোটি টাকার ফসল নষ্ট
Advertisement
এটিএম নিজাম, কিশোরগঞ্জ ব্যুরো
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ১০:৫২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কিশোরগঞ্জে ৫০ হাজারেরও বেশি বোরো চাষির ২৫৯ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির অসম্পূর্ণ চলমান প্রতিবেদনে এমন চিত্র ওঠে এসেছে।
তবে সম্পূর্ণ প্রতিবেদনে এ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও বেড়ে যাবে বলেও জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
বুধবার (৬ মে) দুপুরে কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে এমন ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরা হয়।
কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামার বাড়ি) তথ্যমতে, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলসহ জেলার ১৩টি উপজেলায় উঠতি বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির এ চিত্র সামনে উঠে এসেছে।
তথ্যমতে, মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলার প্রায় ১৩ হাজার ১২২ হেক্টর জমির ধান পানি নিচে তলিয়ে রয়েছে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার কৃষক।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৫৯ কোটি টাকাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এমন তথ্যমতে, ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অন্যতম হাওড় উপজেলা হিসেবে পরিচিত ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামসহ অন্যান্য উপজেলার খাল-বিল ও নিচু এলাকার ফসল।
এর মধ্যে ইটনা উপজেলায় ১১ হাজার ৫০টি পরিবারের ৩ হাজার ২৬১ হেক্টর জমি তলিয়ে প্রায় ৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অষ্টগ্রামে ৯ হাজার ১৫০টি পরিবারের ২ হাজার ৭০৩ হেক্টর জমিতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তাড়াইলে ১ হাজার ২২৪ হেক্টর জমিতে ক্ষতি ২৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, নিকলীতে ৯২৩ হেক্টরে ক্ষতি ২১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং করিমগঞ্জে ৮৩০ হেক্টরে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
এছাড়া মিঠামইনে ৬৯০ হেক্টরে ১৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, কটিয়াদীতে ৫৮৫ হেক্টরে ১৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, সদর উপজেলায় ২৭৫ হেক্টরে ৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ভৈরবে ২১১ হেক্টরে ৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং বাজিতপুরে ১৬২ হেক্টরে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কুলিয়ারচরে ৬৫ হেক্টরে প্রায় ১৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং হোসেনপুরে ৪৭ হেক্টরে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকার ফসলহানি হয়েছে।
তবে বোরো চাষিদের দাবি, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক জরিপে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উঠে আসেনি।
ক্ষতিগ্রস্তদের মতে, হাওড়ে বিশেষ ব্যক্তি-মহলের লাভজনক উন্নয়নের নামে অপরিণামদর্শী অপরিকল্পিত অলওয়েদার সড়কপথ ও বাঁধ নির্মাণ এবং পলি পড়ে নদ-নদী ও খাল-বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ অধিকাংশ স্লুইসগেট জলকপাট অকেজো হয়ে পড়ায় এসব পথে বৃষ্টির পানি নামতে পারেনি। এতে করেও নজিরবিহীন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জের অন্যতম হাওড় উপজেলা ইটনার সদর ইউনিয়নের দীঘির পাড় গ্রামের কৃষক দাউদ সালেক মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, এবার ৮ একর জমিতে বোরো ফসল চাষ করেন তিনি। এর মধ্যে মাত্র ৩ থেকে সাড় ৩ একর জমির ফসল কেটে ঘরে তুলতে পারেন। বাকি সাড়ে ৪ একর জমির ফসল অথৈ পানিতে তলিয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, এ বোরো ফসল করেই আমাদের জীবিকা নির্বাহ চলে; কিন্তু এবার মহাজনি ঋণ এবং ব্যাংক ঋণ শোধের কোনো সুযোগই থাকল না।
তিনি আরও বলেন, এক সময় অকাল বন্যায় ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেলে এলাকার নিম্ন আয়ের লোকজন কিংবা শ্রমিকদেরকে এসব ডুবন্ত ফসল কেটে তুলে এক ভাগ তাদের দিয়ে দিয়ে দুই ভাগ নিজেরা পেতাম। এ ছাড়া ভয়াবহ ফসল ডুবির সময় এ সুযোগও না থাকলে ওই নিম্ন আয়ের এবং শ্রমিক শ্রেণির লোকজনকে ‘নয়ন ভাগায়’ পুরো ডুবন্ত ফসল কেটে নিয়ে যেতে বলা হতো- আর আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতাম। কিন্তু এবার ‘তে ভাগা তো দূরের কথা, নয়ন ভাগাতেও’ আগ্রহ নেই ওই নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষের। বর্তমানে কাঁচা ফসল ৪শ টাকা মণও বিক্রি করা যাচ্ছে না। যে সময়ে যে পরিমাণ ফসল তারা তুলবে- এ সময় অন্য কাজে গেলে তিন-চারগুণ বেশি টাকা উপার্জন করতে পারবে।
এ নিয়ে বড় হাটি গ্রামের কৃষি শ্রমিক কালা মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনিও এমনটি জানিয়েছেন। এছাড়া রয়েছে ফসল উৎপাদনে সার,বীজ, কীটনাশক এবং তীব্র ডিজেল সংকটের কারণে হার্ভেস্টার মেশিন ও শ্রমিক দিয়ে ধানখেত কর্তনে অতিরিক্ত টাকা প্রদানের ট্রাক-নৌকা, টমটমসহ অন্যান্য যানবাহনে কাটা ফসল পরিবহণের বিড়ম্বনা।
কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, ৪ মে পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির এমন তথ্য মিলেছে। আর এ হিসাব শেষ হতে না হতে আরও প্রায় দেড় হাজার হেক্টর বোরো ধান নতুন করে পানিতে তলিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ এখনও চলমান রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
