কলাগাছের সুতায় কলাবতী শাড়ি
পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই শিল্প বিলুপ্তির পথে
Advertisement
আব্দুর রাজ্জাক রাজা, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে কলাগাছের সুতায় শাড়ি তৈরি করছেন রাধাবতী দেব -ফাইল ফটো
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৌলভীবাজারে ১৯৭৫ সাল থেকে মণিপুরি বস্ত্র বানাচ্ছেন কারিগর রাধাবতী দেবী। এ পর্যন্ত তিনি কত শাড়ি, গামছা, মাফলার, ওড়না, থ্রিপিস বানিয়েছেন, তার হিসাব নেই। এ কাজে তিনি দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তবে তিনি ২০২৩ সালে দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি করে। সে সময় তাকে এ কাজের জন্য বান্দরবানে নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরিজি। সেখানে পাহাড়ি কলাগাছের তন্তুর সঙ্গে তাঁতের সুতা দিয়ে বুনন করেন এক বিশেষ শাড়ি-যার নাম দেওয়া হয় কলাবতী শাড়ি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সেই শাড়ি উপহার দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন রাধাবতী। সরকারপ্রধান খুশি হয়ে তাকে এক লাখ টাকা ও সম্মাননা দিয়েছিলেন। তবে এখন তিনি নতুন করে আর কাজ করতে পারছেন না। পৃষ্ঠপোষকতা ও তহবিলের অভাবে সেই উজ্জ্বল সম্ভাবনা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে।
রাধাবতীর বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে মণিপুরি অধ্যুষিত গ্রাম ভানুবিল মাঝেরগাঁওয়ে। তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। অবিবাহিত রাধাবতী থাকেন ছোট ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রঞ্জিত সিংহের পরিবারে বাবার বাড়িতে। তিনি তাঁতবস্ত্র তৈরি করে সংসার চালাতে ভাইকে সহায়তা করেন। তিনি ১৯৭৫ সাল থেকে বাড়িতে টকটকি (বড় তাঁতে) মণিপুরি বস্ত্র বুনন করেন। ১৯৮৬ সালে প্রথমে ভারতের মণিপুরের ইম্পলে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি কমলগঞ্জের মাধবপুরে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে দুবার প্রশিক্ষণ নেন। আগে কোনো তাঁতবস্ত্র দোকানের চাহিদা এলেই সে হিসাবে তিনি পোশাক তৈরি করে দিতেন।
রাধাবতী জানান, ২০২৩ সালে তাকে বান্দরবানে নিয়ে যান জেলা প্রশাসক। বলা হয়, কলাগাছের সুতা দিয়ে একটি শাড়ি বুনন করে দিতে। নিজ বাড়ির তাঁত সঙ্গে নিয়ে বান্দরবানে গিয়ে তিন সহযোগীর সহায়তায় ১৫ দিনে কলাগাছের তন্তুর সঙ্গে তাঁত সুতা মিশিয়ে শাড়ি বুনন করে চমকে দেন তিনি। শিল্পীর নামের অংশের মিল রেখে শাড়িটির নাম দেওয়া হয় কলাবতী। দেশে শাড়ির বাজারে নতুন যোগ হয় কলাগাছের সুতার শাড়ি। সে সময় মূলত বান্দরবানের আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে কলাগাছ থেকে সুতা তৈরি করে বিভিন্ন হস্তজাত শিল্পের পাশাপাশি শাড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের আমন্ত্রণে প্রথম শাড়ি বুনন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মাত্র ৯টি কলাবতী শাড়ি তৈরি করেছেন তিনি। একটি শাড়ি তৈরিতে ১৫ থেকে ২০ দিন এবং ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়।
রাধাবতী দেবী জানান, এ পর্যন্ত সরকার বা ব্যক্তি উদ্যোগে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির কোনো প্রশিক্ষণ বা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এই শিল্পকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ও বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার সহায়তা প্রয়োজন। এই শিল্পী আরও বলেন, যে কলাগাছ থেকে সুতা বের হয় এই কলাগাছ সিলেট অঞ্চলে নেই। বান্দরবানের পাহাড় থেকে কলাগাছ সংগ্রহ করে সুতা বের করা হয়। আমি এখন বিছানার চাদর তৈরি করি। এসব চাদর দেশে ও দেশের বাইরে বিক্রি করা হয়। তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ওই বছর সেপ্টেম্বরে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া গ্রামের ৩০ ত্রিপুরা নারীকে ২০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে কলাগাছ থেকে সংগ্রহ করা সুতা দিয়ে শাড়ি বুনন শেখানো হয়। এখানে আমরা ৪টি শাড়ি তৈরি করি। একই বছর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ৬০ দিনের প্রশিক্ষণে আরও ৫০ প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওখানে ৪টি শাড়ি তৈরি করা হয়। এরপর থেকে এ বিষয়ে আর কেউ খোঁজ করেনি।
বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. শামীম আলম বলেন, কলাগাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরির বিষয়ে আমরা ২ মাসের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। তবে প্রকল্পটি সাফল্য পায়নি, এজন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ থেকে সবকিছুতে অনেক বেশি ব্যয় হয়। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সূত্র জানায়, এই শাড়ি বাজারে আনার জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল। একটি শাড়ি তৈরি করতে অনেক টাকা খরচ হয়। এছাড়া শাড়ি আরামদায়ক ও মসৃণ নয়। তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক (এসিসিআর ও মার্কেটিং) রতন চন্দ্র সাহা বলেন, কলাগাছের সুতায় তৈরি শাড়ি এখনো বাজারে আনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। শাড়িটি বাজারে আনতে গবেষণার প্রয়োজন। একটি শাড়িতে কলাগাছের কতটুকু সুতা ব্যবহার হবে এবং অন্য সুতা কতটুকু লাগবে তা স্পষ্ট নয়। এছাড়া মসৃণ ও আরামদায়ক হতে হবে। এসব নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। শুধু বান্দরবান নয়, এসব শাড়ি অনেকেই বানানোর চেষ্টা করছেন। তাঁত বোর্ডের কাছে যদি এ বিষয়ে কেউ সহযোগিতা চাইলে তা করা হবে।
