Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

গাজীপুর সিটির সড়ক ধস নিয়ে তোলপাড়, তদন্তে যা পাওয়া গেল

Advertisement

Icon

গাজীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

গাজীপুর সিটির সড়ক ধস নিয়ে তোলপাড়, তদন্তে যা পাওয়া গেল

গাজীপুর সিটির সড়ক ধস

Advertisement

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের তুরাগ নদী তীরবর্তী ধনঞ্জয়খালী এলাকায় নির্মাণাধীন সড়কের একটি অংশ ধসে পড়ে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও বিভ্রান্তির মধ্যে অবশেষে স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

বহুল আলোচিত এ ঘটনায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আনিত দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে।

তদন্তে প্রকল্পের ‘Geotechnical Failure’ ও ‘Design Failure’-ই ধসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১-৫ নং জোনের অভ্যন্তরীণ রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় কাশিমপুর নামাবাজার থেকে ধনঞ্জয়খালী পর্যন্ত নদীর সমান্তরালে নির্মাণাধীন প্রায় ১ হাজার ১৫০ মিটার সড়কের একটি অংশ গত ফেব্রুয়ারিতে ধসে পড়ে।

ঘটনাটি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সরেজমিন পরিদর্শন করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম হারুনুর রশীদ ও নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম শামছুর রহমান মাহমুদকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত ৮ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি দীর্ঘ অনুসন্ধান, সরেজমিন পরিদর্শন, কারিগরি বিশ্লেষণ, প্রকল্প নথিপত্র যাচাই, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং স্থানীয়দের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে প্রতিবেদন দাখিল করে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- ধসের ঘটনাটি মূলত ভূ-প্রযুক্তিগত ও নকশাগত ত্রুটিজনিত। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নদীর বাঁক, নিচের নরম কাদামাটি, দীর্ঘদিনের ড্রেজিং, পানির ঘূর্ণায়ন, পাইলের মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং নদীতীরের জটিল ভূ-প্রকৃতি মিলেই এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

তদন্ত কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ধসে পড়া অংশে ‘classic limit state geotechnical failure’ ঘটেছে এবং এটি মূলত ‘Design Failure’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

কমিটি আরও উল্লেখ করে, রাস্তার ভরাট মাটি বা রিটেইনিং ওয়ালের গুণগত মানের ঘাটতির কারণে ধস হয়েছে- এমন সম্ভাবনা কম। বরং প্রয়োজনীয় ভূ-প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, নদীর হাইড্রোলজি, মাটি পরীক্ষা এবং ডিজাইন রিভিউ যথাযথভাবে না হওয়াই বড় কারণ।

এ ঘটনায় বহুল আলোচিত দুই প্রকৌশলীর বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম হারুনুর রশীদ প্রকল্পের তৃতীয় প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন অনেক পরে এবং তিনি পূর্ব অনুমোদিত ডিজাইন অনুসারেই কাজ বাস্তবায়ন করেন। অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম শামছুর রহমান মাহমুদ প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে এ দুর্ঘটনার দায় তার ওপর বর্তায় না বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, প্রকল্পটির মূল নকশা প্রস্তুত করেছিল একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পরবর্তীতে নদীর ভেতরে প্রায় ৫ মিটার স্থান পরিবর্তন করে কাজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এ পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রবাহ, মাটির ধরন, পাইলের সক্ষমতা ও নদীর হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি।

কমিটি মনে করে, এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হলে হয়তো এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তদন্ত কমিটি বলেছে- গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি। কারণ প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের মে মাসেই শেষ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে যেসব কাজ হয়েছে, তার কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি। ফলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বা আর্থিক অনিয়মের প্রশ্নও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

এদিকে পুরো ঘটনায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সোহেল হাসানের ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়। তবে নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিনিই প্রথমে শৃঙ্খলামূলক বিধি অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্তের আদেশ কার্যকর করেন এবং পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্বহালের অফিস আদেশ জারি করেন। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াই প্রশাসনিক বিধিবিধান ও তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে সম্পন্ন হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যবস্থার একটি বড় শিক্ষা। তদন্ত প্রতিবেদনে জাতীয় পর্যায়ে ভূ-প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও ডিজাইন কোড প্রণয়ন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক নির্মাণ পদ্ধতি এবং পেশাদার প্রকৌশলীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, একটি প্রকৌশলগত ও নকশাগত জটিল ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরুতে যেভাবে দুর্নীতির অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তদন্ত প্রতিবেদন তার অনেকটাই ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছে। তারা বলছেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যক্তিকে দায়ী না করে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি তদন্তের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সোহেল হাসান বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম হারুনুর রশীদ ও নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম শামছুর রহমান মাহমুদকে আবার কর্মস্থলে যোগদানের অফিস আদেশ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল পদে থেকে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

‘সিলেটে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে’ গভীর রাতে বাসায় ঢুকে প্রকৌশলীকে মারধর-হুমকি

‘সিলেটে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে’ গভীর রাতে বাসায় ঢুকে প্রকৌশলীকে মারধর-হুমকি

ফাঁড়িতে হামলা করে আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা, রামদায়ের কোপে ২ পুলিশ আহত

ফাঁড়িতে হামলা করে আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা, রামদায়ের কোপে ২ পুলিশ আহত

শিশুকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে বিপাকে, ওসিসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

শিশুকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে বিপাকে, ওসিসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

হত্যা মামলায় একই পরিবারের চারজনের যাবজ্জীবন

হত্যা মামলায় একই পরিবারের চারজনের যাবজ্জীবন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম